বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং দলটির সকল অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে ২০২৫ সালের ১২ মে জারি করা সরকারি প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। রিটে ওই প্রজ্ঞাপন জারি কেন আইনগত কর্তৃত্ব-বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারির আবেদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে রুল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় প্রজ্ঞাপনটির কার্যকারিতা স্থগিত চাওয়া হয়েছে। মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরের বাসিন্দা মো. আল আমিন রিটটি করেছেন। তাঁর পক্ষে আইনজীবী হিসেবে রয়েছেন ইউনূস আলী। সোমবার রিটটি বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের কার্যতালিকায় ৬০ নম্বর ক্রমিকে ছিল। তবে কার্যতালিকার ওই ক্রম পর্যন্ত আদালতের কার্যক্রম না পৌঁছানোয় সোমবার রিটটির শুনানি হয়নি। সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মুহাম্মদ আজমী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রিটের কারণে এখন প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাহী আদেশে একটি রাজনৈতিক দলের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে সরকারের আইনগত ক্ষমতার পরিধি কতটা এবং ২০২৫ সালের ১২ মে জারি করা প্রজ্ঞাপনটি সংশ্লিষ্ট আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। তবে রিট দায়ের হওয়া বা রুল জারি হওয়া মানেই প্রজ্ঞাপন অবৈধ হয়ে যাওয়া নয়। আদালতের শুনানি ও পরবর্তী আদেশের ওপর বিষয়টির আইনি পরিণতি নির্ভর করবে। ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এসব সংগঠনের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে। প্রজ্ঞাপনে আওয়ামী লীগ ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর প্রকাশনা, গণমাধ্যম, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, মিছিল, সভা-সমাবেশ, সম্মেলন আয়োজনসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়। অর্থাৎ সিদ্ধান্তটি শুধু দলীয় সভা বা মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; প্রচার ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও এর ব্যাপ্তি রাখা হয়েছিল। এই প্রজ্ঞাপনের আইনগত বৈধতাই এবার আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। রিটে আবেদনকারী বলেছেন, ১২ মে ২০২৫-এর প্রজ্ঞাপন কেন আইনগত কর্তৃত্ব-বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়ে রুল চাওয়া হয়েছে। রুল জারি হলে সেটি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় প্রজ্ঞাপনের কার্যক্রম স্থগিত রাখার আবেদনও করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় সরকার বলেছিল, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারপ্রক্রিয়া চলমান থাকায় এবং জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে দলটির কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্তের ফলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে। তবে ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ’ এবং ‘দল নিষিদ্ধ’—দুটি বিষয়কে একই হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সরকারের বর্তমান অবস্থান অনুযায়ী আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ রয়েছে; দল হিসেবে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ হবে কি না, সেটি বিচারপ্রক্রিয়ার ফল এবং আদালতের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত। চলতি বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নিষিদ্ধ হবে কি না, তা আদালতে নির্ধারিত হবে। এর ফলে নতুন রিটটির গুরুত্ব শুধু একটি প্রজ্ঞাপনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি নির্বাহী বিভাগের একটি সিদ্ধান্তের ওপর বিচার বিভাগের পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। আদালত যদি রিটটি শুনানির জন্য গ্রহণ করে রুল দেন এবং পরে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত শুনানি হয়, তাহলে রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের কার্যক্রম সীমিত করার ক্ষেত্রে সরকারের ক্ষমতা এবং সেই ক্ষমতা প্রয়োগের আইনগত ভিত্তি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা আসতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা অবশ্য আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। খান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রোকসানা খন্দকার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার প্রসঙ্গে বলেছিলেন, কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা কোনো সমাধান নয়। তাঁর মতে, একটি বড় রাজনৈতিক দলের সামাজিক ও রাজনৈতিক উপস্থিতি শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে শেষ করা যায় না। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ গত জুনে বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বর্তমানে বড় ধরনের গোলযোগ সৃষ্টি করার মতো সাংগঠনিক শক্তি নেই। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা বা উসকানি দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এই দুই বিশ্লেষণের মধ্যে একটি জায়গায় মিল রয়েছে—আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিষয়টি কেবল আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, দলীয় রাজনীতি এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী পরিবেশও জড়িত। সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, বিচারপ্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকবে। জুনে জাহেদ উর রহমান জানিয়েছিলেন, জুলাই-আগস্টের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলমান থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড মাঠপর্যায়ে নিষিদ্ধ থাকবে। একই সময়ে তিনি বলেন, দলটি অন্য কোনো নাম ব্যবহার করেও রাজনৈতিক কর্মসূচি চালাতে পারবে না। এদিকে ১২ মে ২০২৫-এর প্রজ্ঞাপনের পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। নতুন রিটে ওই নিষেধাজ্ঞার আইনগত ভিত্তিই সরাসরি আদালতের সামনে তোলা হয়েছে। তবে সোমবার রিটটির শুনানি না হওয়ায় এখনো এ বিষয়ে আদালতের কোনো আদেশ হয়নি। ফলে প্রজ্ঞাপনের কার্যকারিতাতেও আপাতত কোনো পরিবর্তন আসেনি। রিটের পরবর্তী শুনানিতে আবেদনকারীর আইনজীবী প্রজ্ঞাপনটি কেন আইনগত কর্তৃত্ব-বহির্ভূত, সে বিষয়ে যুক্তি তুলে ধরবেন। রাষ্ট্রপক্ষকে তখন প্রজ্ঞাপন জারির আইনগত ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে হবে। আদালত রুল জারি করলে বিষয়টি আরও বিস্তৃতভাবে বিচারিক পর্যালোচনার মধ্যে আসবে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন তাই নজর থাকবে হাইকোর্টের পরবর্তী কার্যক্রমের দিকে। আদালত প্রজ্ঞাপনের কার্যকারিতা স্থগিত করবেন কি না, রুল জারি করবেন কি না এবং শেষ পর্যন্ত প্রজ্ঞাপনটির বৈধতা নিয়ে কী সিদ্ধান্ত দেন—তার ওপর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকার বর্তমান ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ আইনি অবস্থান অনেকটাই নির্ভর করবে।