প্রকাশ :: ... | ... | ...

আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত : বিএনপি-জামায়াতের পারস্পরিক সন্দেহ কেন


সংযুক্ত ছবি

জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিরোধের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ; রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল, নাকি সত্যিই কোনো যোগাযোগ—প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই প্রকাশ্য হচ্ছে। জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে দুই দলের বিরোধের মধ্যেই সামনে এসেছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের কথিত আঁতাতের অভিযোগ। বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে এবং এ কাজে জামায়াতের একটি অংশ সহযোগিতা করছে। জামায়াত এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে উল্টো বিএনপির বিরুদ্ধেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ তুলছে। একসময় আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে একসঙ্গে থাকা দুই দলের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান নতুন রাজনৈতিক প্রশ্ন তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। তবে সংবিধান ও জুলাই সনদ নিয়ে বিরোধ, সংসদের ভেতরে-বাইরে আন্দোলন এবং ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের আশঙ্কা—সব মিলিয়ে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের পেছনে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বিষয়টি সামনে এসেছে। গোয়েন্দা তথ্যের দাবি, পাল্টা অভিযোগ সম্প্রতি রাজশাহীর এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অভিযোগ করেন, দেশের কয়েকটি শিল্পকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ তৈরির পেছনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অর্থায়ন রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ করে একটি পক্ষ এবং দেশের ভেতরে আরেকটি রাজনৈতিক দল অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। তিনি এ বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য থাকার কথাও উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর বিএনপির অন্য নেতারাও জামায়াতকে ইঙ্গিত করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ তোলেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীর দাবি, জামায়াতের বর্তমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করে দেওয়ার বিষয়ে জামায়াতের নেতাদের অতীতের কিছু বক্তব্য জনমনে সন্দেহ তৈরি করেছে। তাঁর ভাষ্য, জামায়াত গোপনে অন্য পক্ষের সঙ্গে মিলে সরকারকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ ধরনের তৎপরতা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তবে বিএনপির এসব বক্তব্য অভিযোগ ও গোয়েন্দা তথ্যের দাবির ওপর ভিত্তি করে দেওয়া। আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে সমন্বিত কোনো রাজনৈতিক তৎপরতার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ্যে না আসায় অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছেন। তাঁর যুক্তি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, দলীয় কার্যালয় বন্ধ রাখা হয়েছে এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাতের অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে দাবি করেন তিনি। উল্টো বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ তুলে আযাদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ পেলেও জামায়াতকে বিভিন্ন বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। তাঁর দাবি, বিএনপি নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করেছিল। তবে এ দাবির পক্ষেও তিনি প্রকাশ্যে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তুলে ধরেননি। বিরোধের কেন্দ্রে জুলাই সনদ ও সংবিধান বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েন বুঝতে হলে জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে তাদের অবস্থান দেখতে হবে। জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোট জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের পক্ষে। অন্যদিকে বিএনপি সনদের বিভিন্ন প্রস্তাবে নিজেদের আপত্তি ও নোট অব ডিসেন্টের বিষয়টি বিবেচনায় রাখার অবস্থান নিয়েছে। সংবিধান পরিবর্তনের পদ্ধতি ও সংস্কারের পরিধি নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। জামায়াত সংবিধানে ব্যাপক কাঠামোগত পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিএনপি বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে প্রয়োজনীয় সংশোধনের ওপর জোর দিচ্ছে। এই মতপার্থক্য শুধু সংস্কারের বিষয়বস্তুতে সীমাবদ্ধ নয়; কোন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হবে এবং তার আইনি ভিত্তি কী হবে, সেটিও বিরোধের অংশ। সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়ে বিরোধী দলগুলোর আপত্তি এবং সংসদীয় প্রক্রিয়া বর্জনের ফলে রাজনৈতিক সমঝোতার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিএনপি চায়, আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের নিষ্পত্তি হোক। অন্যদিকে জামায়াত ও তাদের মিত্ররা দাবি বাস্তবায়নে রাজপথে কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিএনপির আশঙ্কা, রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ এগোলে সরকারের সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আবার বিরোধী দলগুলোর অনড় অবস্থানও রাজনৈতিক অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত করতে পারে। জামায়াতকে চাপে রাখার কৌশল এখানেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে কথিত আঁতাতের অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংবিধান ও জুলাই সনদ নিয়ে দুই দলের বিরোধ যখন তীব্র, তখন জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ তোলা দলটির রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের আশঙ্কাকে সামনে এনে বিএনপি নিজেদের সমর্থকদের কাছে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনকে সন্দেহজনক হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পেতে পারে। তবে বিএনপি নেতারা বলছেন, এটি জামায়াতের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নয়; বরং তাঁদের কাছে এ বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। রিজভীর বক্তব্য অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিরোধী দলগুলো এমন অবস্থানে যাচ্ছে, যাতে রাজনৈতিক বিভাজন বাড়তে পারে এবং ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে জামায়াতের বক্তব্য, সরকার জুলাই সনদ ও গণভোটের প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ সামনে আনছে। হামিদুর রহমান আযাদের দাবি, সরকার দেশ পরিচালনায় ব্যর্থতা আড়াল করতে রাজনৈতিক বিভ্রান্তি তৈরি করছে। অর্থাৎ একই ঘটনাকে দুই দল ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে। বিএনপির কাছে বিরোধী দলের আন্দোলন ও সম্ভাব্য গোপন যোগাযোগ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের বিষয়; জামায়াতের কাছে আঁতাতের অভিযোগ তাদের সংস্কার দাবিকে দুর্বল করার রাজনৈতিক প্রচেষ্টা। কোন ব্যাখ্যা বাস্তবতার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নির্ধারণের জন্য অভিযোগের বাইরে যাচাইযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। আওয়ামী লীগ কী বলছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। শেখ হাসিনাসহ দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকে দেশের বাইরে রয়েছেন; বিভিন্ন মামলায় দলের নেতাদের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রমও চলছে। বিএনপি ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাসিম বলেন, আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমঝোতা করে কাজ করছে না। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য নেই বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, আওয়ামী লীগ জনগণের সঙ্গে থেকে জনগণের জন্য কাজ করে। আওয়ামী লীগও বিএনপি বা জামায়াতের সঙ্গে কোনো সমঝোতার কথা স্বীকার করেনি। ফলে তিন পক্ষের বক্তব্যে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ থাকলেও জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের গোপন সমঝোতা কিংবা এ বিষয়ে কোনো বৈঠকের দাবির পক্ষে প্রকাশ্যে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌসের মতে, বিএনপি ও জামায়াত পরস্পরের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ তুলে কার্যত ক্ষমতাচ্যুত দলটিকেই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ, কার সঙ্গে আওয়ামী লীগের যোগাযোগ রয়েছে, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে নিশ্চিত হওয়া কঠিন। তবে এ ধরনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গঠনমূলক আলোচনার পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি ও জামায়াত একসময় দীর্ঘদিন জোটবদ্ধভাবে রাজনীতি করেছে। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনে জামায়াতের সমর্থন পেয়েছিল; ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকারের অংশও ছিল জামায়াত। পরে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনেও দুই দলকে একসঙ্গে দেখা গেছে। বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানে বিএনপি সরকারে এবং জামায়াত বিরোধী দলে থাকায় তাদের স্বার্থ ও কৌশলের পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগকে শুধু দুই দলের পারস্পরিক অবিশ্বাস হিসেবে দেখলে রাজনৈতিক বিরোধের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কারের পদ্ধতি, সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ ক্ষমতার ভারসাম্য। তবে অভিযোগের রাজনৈতিক তাৎপর্য থাকলেও প্রমাণ ছাড়া কোনো দলকে গোপন সমঝোতার জন্য দায়ী করা যায় না। শেষ পর্যন্ত এই বিতর্কের নিষ্পত্তি হবে রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে যাচাইযোগ্য তথ্য, স্বচ্ছতা এবং সংবিধান ও সংস্কার নিয়ে কার্যকর সংলাপের মধ্য দিয়ে।