রাকসুর মেয়াদ শেষের পথে, সামনে এলো তিন চিঠি; শিবির বলছে, বহিষ্কারের তথ্য প্রকাশ করা তাদের নীতি নয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাউদ্দিন আম্মারকে ইসলামী ছাত্রশিবির থেকে বহিষ্কারের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর ক্যাম্পাসের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রায় এক বছর আগে বহিষ্কার করা হলেও এতদিন বিষয়টি প্রকাশ্যে না আনা এবং রাকসুর বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার এক মাসের মতো আগে তা সামনে আসার সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা। ছাত্রশিবির অবশ্য বলছে, সংগঠন থেকে কাউকে বহিষ্কার করা হলে সাধারণত তা প্রকাশ্যে জানানো হয় না। সংগঠনের এক সাবেক নেতা ভুলবশত বহিষ্কারের চিঠি প্রকাশ করেছেন। এ ঘটনায় তাঁর কাছে জবাব চাওয়া হয়েছে। বুধবার প্রকাশ্যে আসা তিনটি চিঠিতে আম্মারের শিবির-সংশ্লিষ্টতা ও বহিষ্কারের বিষয়টি সামনে আসে। চিঠিগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তাঁকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর আগে একই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি তাঁর ‘সাথি’ পদ স্থগিত করে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। চিঠিতে আম্মারের বিরুদ্ধে নৈতিক পদস্খলন, নারীদের সঙ্গে অবাধ বিচরণ, অর্থের বিনিময়ে পদ বাণিজ্য, মৌলিক ইবাদত পালনে উদাসীনতা এবং অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেনসহ কয়েকটি অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। এসব অভিযোগের যথাযথ জবাব দিতে ব্যর্থ হওয়ার কথা উল্লেখ করে পরে তাঁর ‘সাথি’ পদ বাতিল এবং সংগঠন থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। চলতি বছরের ৩১ জুলাই শিবিরের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মুজাহিদ ফয়সালের সই করা আরেকটি চিঠিতেও আম্মারের বহিষ্কারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। ওই চিঠিতে সংগঠনের নেতাকর্মীদের তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। আম্মারের কর্মকাণ্ড এবং ‘ক্ষেত্রবিশেষে ফৌজদারি অপরাধে জড়িত হওয়ার’ কারণে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সালাহউদ্দিন আম্মার। শিবিরকে অভিযোগের প্রমাণ দেওয়ার চ্যালেঞ্জও জানিয়েছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি শিবিরের ‘সাথি’ ছিলেন কি না, তা সরাসরি স্পষ্ট না করে বলেছেন, ডানপন্থী সংস্কৃতিচর্চার কারণে তাঁকে শিবিরের মানদণ্ডে ফেলা হতে পারে। তিনি শিবিরের একটি অফিসিয়াল গানে অভিনয় এবং কলরবের সঙ্গে কাজ করার কথাও উল্লেখ করেছেন। নির্বাচনের সময় কেন বিষয়টি সামনে আসেনি আম্মারের শিবির-সংশ্লিষ্টতার আলোচনা অবশ্য ক্যাম্পাসে নতুন নয়। তবে রাকসু নির্বাচনের আগে ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে তাঁকে নিজেদের সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়নি। ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর রাকসু নির্বাচনে ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ নামে একটি প্যানেল ঘোষণা করেছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কয়েকজন সমন্বয়ক। ওই প্যানেলকে শিবিরের ‘ডামি’ বা ‘ছায়া প্যানেল’ বলা হচ্ছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তখন সালাহউদ্দিন আম্মার তা নাকচ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শিবির আলাদা প্যানেল দিয়েছে এবং তাঁরা আলাদা প্যানেল দিয়েছেন; ফলে ওই প্যানেলকে শিবিরের ডামি বা ছায়া দল বলার সুযোগ নেই। ওই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ছিলেন মেহেদী সজীব। পরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক হন। এ বিষয়টিও নির্বাচনের সময় শিবিরের সঙ্গে ওই প্যানেলের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। তবে ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারি মেহেদী হাসান বলছেন, নির্বাচনের সময় মেহেদী সজীব সংগঠনের দায়িত্বশীল ছিলেন না। পরে শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি দায়িত্বশীল হন। মেহেদী হাসানের ভাষ্য, ‘আম্মার যদি আমাদের জনশক্তি হতেন বা ডামি প্যানেলের অংশ হতেন, তাহলে রাকসু নির্বাচনের এক মাসেরও বেশি আগে তাঁকে বহিষ্কার করা হতো না। আমাদের কোনো ডামি প্যানেল ছিল না। আমাদের ‘এ’ টিম, ‘বি’ টিম কোনোটিই ছিল না। বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রার্থী নিয়ে একটি ইনক্লুসিভ প্যানেল করার চেষ্টা করেছি।’ বহিষ্কারের তথ্য এখন কেন আম্মারকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বহিষ্কার করা হলেও ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এসে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার সময় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যে রাকসু নির্বাচিত কমিটির মেয়াদও শেষের দিকে। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা মনে করছেন, আম্মারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ঘিরে বিতর্ক এবং তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠার প্রেক্ষাপটে শিবিরের এই অবস্থান সামনে এসেছে। তবে এটি শিবিরের কোনো রাজনৈতিক কৌশলের অংশ—এমন দাবির স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শাকিলুর রহমান সোহাগের দাবি, আম্মারকে শিবির থেকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হলেও তিনি সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘শিবিরের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে, তার মানে এই নয় যে আম্মার শিবির করেন না। এটি তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ। শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁকে নিরপেক্ষ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা হচ্ছে।’ ছাত্র অধিকার পরিষদের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেহেদী মারুফও বহিষ্কারের বিষয়টিকে ‘লোক দেখানো’ বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, শিবিরের সঙ্গে আম্মারের সম্পর্কের বিষয়টি আগে থেকেই ক্যাম্পাসে আলোচিত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ কায়সার আহমেদ বলেন, ‘শিবিরের একটি এক্সটেন্ডেড ভার্সন হলো আম্মার।’ তাঁর দাবি, সংগঠন হিসেবে শিবির যেসব কর্মকাণ্ডের দায় নিতে চাইত না, সেগুলো আম্মারকে দিয়ে করানো হয়েছে। রাকসুর বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় বহিষ্কারের বিষয়টি সামনে আসায় তিনি এটিকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গেও যুক্ত করে দেখছেন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, আম্মারকে ঘিরে শিবিরের সাম্প্রতিক অবস্থান তাদের আগের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আম্মারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক যেসব অভিযোগ সালাউদ্দিন আম্মারকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত জুনে বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ দেখার সময় এক হল সংসদ নেতাকে লাঞ্ছিত ও হেনস্তার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া বিতর্কিত মন্তব্য, হুমকি, শিক্ষার্থী মারধর এবং ডিনদের পদত্যাগে বাধ্য করার মতো অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। এসব অভিযোগের সবগুলোর বিষয়ে একই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। গত ২৮ জুলাই প্রেমের প্রস্তাবসংক্রান্ত এক ছাত্রীর অভিযোগের জেরে তিন শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, আম্মারসহ রাকসু ও শাখা ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা প্রথমে প্রক্টর দপ্তরে এবং পরে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে ওই শিক্ষার্থীদের মারধর করেন। সেখানে রড, বাঁশ ও বেল্ট ব্যবহারের অভিযোগও ওঠে। ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে রাকসুর ভিপি ও শিবির নেতা মোস্তাকুর রহমান জাহিদের বিরুদ্ধে। ওই সংবাদ সম্মেলনে তাঁর পাশে ছিলেন আম্মার। সবশেষ ২০ সেপ্টেম্বর রাজশাহী রেলস্টেশনে এক শিক্ষার্থীকে মারধরের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনায়ও আম্মারের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে ক্যাম্পাসে বিতর্ক আরও বাড়ে। শিবিরের ব্যাখ্যা এক বছর আগে বহিষ্কারের তথ্য এখন প্রকাশ্যে আসার কারণ জানতে চাইলে ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারি মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমাদের সংগঠনে কাউকে বহিষ্কার করা হলে সেটি পাবলিক করা হয় না। এটি আমাদের নীতিবিরুদ্ধ। আমাদের সাবেক এক ভাই ভুলবশত এটি করেছে। আমরা ইতোমধ্যেই তাঁর কাছে এর জবাব চেয়েছি।’ আম্মারকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, অভিযোগ পাওয়ার পর তাঁকে জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও তিনি তা করেননি। এ কারণে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আম্মারের রাকসুর কর্মকাণ্ডে শিবিরের সমর্থন ছিল—এমন দাবিও নাকচ করেন মেহেদী হাসান। তিনি বলেন, আম্মার রাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধি হওয়ায় সংসদে শিবিরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর সমন্বয় ছিল; সেটিকে সংগঠনের সমর্থন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ‘গুপ্ত রাজনীতি’ নিয়ে উমামার অভিযোগ আম্মারের শিবির-সংশ্লিষ্টতার তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা। তিনি জুলাই আন্দোলনের পর বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের ভূমিকা এবং শিবিরের রাজনৈতিক কর্মকৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এক ফেসবুক পোস্টে উমামা অভিযোগ করেন, জুলাই আন্দোলনের সময় বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনকে বাদ দিয়ে শিবির ও ছাত্রশক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ক কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। একই পোস্টে তিনি সালাউদ্দিন আম্মারকে ‘উড়ে এসে নেতা’ হওয়া ব্যক্তিদের অন্যতম বলেও মন্তব্য করেন। তবে উমামার এসব বক্তব্য তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও অভিযোগ; এগুলোর স্বাধীন যাচাই করা হয়নি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আম্মারের শিবির-সংশ্লিষ্টতা, এক বছর আগে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত এবং সেই তথ্য প্রকাশ্যে আসার সময়—এই তিনটি বিষয় এখন একই সঙ্গে আলোচনায়। ছাত্রশিবিরের বক্তব্য অনুযায়ী, বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত আগেই কার্যকর হয়েছিল এবং তা প্রকাশ না করার কারণ সংগঠনের অভ্যন্তরীণ নীতি। অন্যদিকে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন সময়ের এই ব্যবধানকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখছে। ফলে বিষয়টির তাৎপর্য নির্ভর করছে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের পর আম্মারের সঙ্গে শিবিরের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বাস্তবে কী ধরনের ছিল, তার ওপর।