সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স সীমা ৩৫ বছর করার দাবিতে আন্দোলন হলেও অন্তর্বর্তী সরকার তা ৩২ বছর করেছিল। ফাইল ছবি
বিরোধী দল আলোচনা চাইলেও দুই বিলই কণ্ঠভোটে পাস; বিরোধী দল ‘হ্যাঁ’ ভোট না দেওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেন চিফ হুইপ। সরকারি চাকরিতে প্রবেসের বয়সসীমা এবং সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা দুটি অধ্যাদেশকে বিল আকারে পাস করেছে জাতীয় সংসদ। রোববার সংসদে ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ এবং ‘সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যানসিয়াল করপোরেশনসহ স্ব-শাসিত সংস্থাসমূহে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ বিল, ২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিল দুটি নিয়ে সংসদে কোনো আলোচনা হয়নি। বিরোধী দলের সদস্যরাও কণ্ঠভোটে পক্ষে বা বিপক্ষে অংশ নেননি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দুটি বিল পাসে মোট সময় লাগে আট মিনিট। পাস হওয়া এক বিলে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন শাস্তিমূলক বিধান যুক্ত করা হয়েছে। অন্য বিলে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর বহাল রাখা হয়েছে। তবে যেসব পদে আগে থেকেই ৩২ বছরের বেশি বয়সসীমা নির্ধারিত আছে, সেগুলো বহাল থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু পাসের সুপারিশ করেছিল সংসদীয় বিশেষ কমিটি। সেই ধারাবাহিকতায় এ দুটি বিল সংসদে তোলা হয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেলে বিল দুটি আইনে পরিণত হবে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য কী বদল এল জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী সংসদে ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ তোলেন। পরে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলে ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইনে একটি নতুন ধারা (৩৭ক) যুক্ত করে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বৈধ আদেশ অমান্য করলে, আইনসংগত কারণ ছাড়া সরকারের কোনো আদেশ, পরিপত্র ও নির্দেশ অমান্য করলে, তার বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করলে বা এসব কাজে অন্য কোনো সরকারি কর্মচারীকে প্ররোচিত করলে তা শাস্তিযোগ্য হবে। একই সঙ্গে ছুটি বা যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া অন্যান্য কর্মচারীদের সঙ্গে সমবেতভাবে নিজ কর্ম থেকে অনুপস্থিত থাকা বা বিরত থাকা এবং কোনো সরকারি কর্মচারীকে কর্মে উপস্থিত হতে বা কর্তব্য সম্পাদনে বাধাগ্রস্ত করাকেও ‘সরকারি কর্মে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য করা হবে। এসব অসদাচরণের জন্য তিন ধরনের দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সেগুলো হলো নিম্নপদ বা নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমন, বাধ্যতামূলক অবসর এবং চাকরি থেকে বরখাস্ত। বিল অনুযায়ী, অভিযোগ গঠনের পর সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিস দিতে হবে। কারণ দর্শানো ও শুনানির পর অভিযোগের ভিত্তি পাওয়া গেলে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। তদন্ত কমিটির সদস্যদের অভিযুক্ত ব্যক্তির চেয়ে পদে জ্যেষ্ঠ হতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি নারী হলে কমিটিতে অন্তত একজন নারী সদস্য রাখতে হবে। কমিটিকে ১৪ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে হবে। যুক্তিসংগত কারণে এ সময় একবারের জন্য সর্বোচ্চ সাত কার্যদিবস বাড়ানো যাবে। নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ না হলে নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। আর যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া তদন্ত প্রতিবেদন দিতে ব্যর্থ হলে তা কমিটির সদস্যদের অদক্ষতা হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সরকারি কর্মচারী বাতায়ন ও ডোসিয়ারে তা লিপিবদ্ধ থাকবে। কোনো কর্মচারীকে দণ্ড দেওয়া হলে তিনি ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে আপিল করতে পারবেন। রাষ্ট্রপতির আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা না গেলেও ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তার কাছে রিভিউ চাওয়া যাবে। বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়, সরকারি কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, আনুগত্য প্রতিষ্ঠা, বিশৃঙ্খলা প্রতিহতকরণ এবং দ্রুত আইনগত কার্যক্রম গ্রহণের ব্যবস্থার জন্য এ সংশোধন আনা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এই অধ্যাদেশ জারির পর সচিবালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় দিনভর বিক্ষোভ করেছিলেন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মচারীরা। পরে গত বছরের ২৩ জুলাই দ্বিতীয় সংশোধনী অধ্যাদেশ জারি করা হয়। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা নির্ধারণের দ্বিতীয় বিলটিও সংসদে তোলেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। পরে সেটিও কণ্ঠভোটে পাস হয়। আইনে বলা হয়, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের সব ক্যাডারে এবং বিসিএসের বাইরে সব সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা হবে ৩২ বছর। এ ছাড়া স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যানসিয়াল করপোরেশনসহ স্ব-শাসিত সংস্থাগুলোর যেসব পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ৩০ বছর বা ‘অনূর্ধ্ব ৩২ বছর’ উল্লেখ আছে, সেসব ক্ষেত্রে তা ৩২ বছর হিসেবে গণ্য হবে। তবে বিলের উপধারায় বলা হয়েছে, যেসব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যানসিয়াল করপোরেশনসহ স্ব-শাসিত সংস্থার কোনো পদে সরাসরি নিয়োগের বয়সসীমা আগে থেকেই ৩২ বছরের বেশি নির্ধারিত আছে, সেসব ক্ষেত্রে সেই বয়সসীমা অপরিবর্তিত ও বহাল থাকবে। প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিয়োগবিধি বা প্রবিধানও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়, চাকরিপ্রার্থীদের প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির দাবি এবং বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে ২০২৪ সালের অধ্যাদেশে সরকারি চাকরিতে সরাসরি নিয়োগের বয়সসীমা দুই বছর বাড়িয়ে ৩২ বছর করা হয়। কিন্তু বিদ্যমান কিছু নিয়োগবিধিতে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৩, ৩৫, ৪০ ও ৪৫ বছর নির্ধারিত থাকায় জটিলতা তৈরি হয়। এ কারণে পরে সংশোধনী আনা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন বিসিএসে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর রেখে সার্কুলার জারি করে নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু রেখেছে, তাই অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করা আবশ্যক। সম্পূরক কার্যসূচি নিয়ে আপত্তি, তবু ভোটে পাস সংসদে সম্পূরক কার্যসূচির মাধ্যমে বিল দুটি উত্থাপনের বিষয়টি সদস্যদের জানানো হলে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, সম্পূরক কার্যসূচিতে কিছু বিল আনা হয়েছে। ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে বিশেষ কমিটি রিপোর্ট দিয়েছে। কিছু অধ্যাদেশ ‘ল্যাপস’ করা হয়েছে। এগুলো গুরুত্ব এবং জুলাই চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারা বিষয়টি নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে চান। জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান প্রথমে বলেন, বিল দুটি ১৩৩টি অধ্যাদেশের অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে পরে তিনি বক্তব্য সংশোধন করে বলেন, এ দুটি বিল ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, যেসব অধ্যাদেশ ‘ল্যাপস’ করার কথা বলা হয়েছে, প্রত্যেকটি বিষয় সংসদে উত্থাপন করা হোক। তারা সেটাতে আলোচনায় অংশ নিতে চান। আইনমন্ত্রী বলেন, “প্রত্যেক অধ্যাদেশ সংসদে তোলা হবে। সেখানে আলোচনার সুযোগ থাকবে। আজ যে দুটি বিল আনা হয়েছে সে দুটির বিষয়ে বিশেষ কমিটি নিঃশর্তভাবে পাস করার বিষয়ে সর্বসম্মত হয়েছিল।” পরে বিল দুটি অনুমোদনের জন্য তোলা হলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদকে জানান, বিলের ওপর দফাওয়ারি কোনো সংশোধনী প্রস্তাব নেই। তিনি বিলের ধারাগুলো সরাসরি ভোটে দেন। কণ্ঠভোটে সেগুলো পাস হয়। বিল দুটি নিয়ে সংসদে কোনো আলোচনা হয়নি। ‘হ্যাঁ’ ভোট না দেওয়ায় বিস্ময় বিল দুটি পাসের পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে বিরোধী দলের ‘হ্যাঁ’ ভোট না দেওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “চাকরিতে বয়স বাড়ানো এবং আমার চাকরি আরেকজনে নিয়ে যায় কেন–এ বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন হল এবং ওই আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হল। বাংলাদেশে একটি নতুন সূর্য উদিত হল। আমাদের নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ তৈরি হল যাদের দিয়ে, আজকে এই সংসদে সেই বিলটা পাস করার সময় বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দ কেন ‘হ্যাঁ’ বললেন না বুঝতে পারলাম না। তাদের ‘হ্যাঁ’ বলা উচিত ছিল। অবশ্য তারা ‘না’ বলেননি।”