প্রকাশ :: ... | ... | ...

এনসিপি নেতৃত্বের সঙ্গে সামান্তার বিরোধ আগে থেকেই, পদত্যাগে নানা প্রতিক্রিয়া


সংযুক্ত ছবি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে সামান্তা শারমিনের পদত্যাগে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে তাঁর দল ছাড়ার সিদ্ধান্তকে আকস্মিক ঘটনা হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। কারণ, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠন নিয়ে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সামান্তার মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল প্রায় এক বছর আগেই। একপর্যায়ে তিনি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদ থেকেও সরে দাঁড়ান। এরপর থেকে দলীয় কার্যক্রমে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণেরা প্রথমে জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠন করলে এর মুখপাত্র হিসেবে সামনে আসেন সামান্তা শারমিন। বিভিন্ন কর্মসূচি, জনসংযোগ ও টেলিভিশনের টক শোতে তিনি সংগঠনটির প্রতিনিধিত্ব করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তরুণদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও দেশ নিয়ে ভাবনা তুলে ধরে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। পরে এনসিপি আত্মপ্রকাশ করলে দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের একজন হিসেবেও আলোচনায় ছিলেন সামান্তা। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটের উদ্যোগ নিলে এর বিরোধিতা করেন তিনি। ওই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এর আগে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে ২০ জনের বেশি নেতা পদত্যাগ করেন। সর্বশেষ তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হলেন সামান্তা শারমিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার সাবেক শিক্ষার্থী সামান্তা বৃহস্পতিবার দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান। এতে জামায়াতের সঙ্গে জোট, নারীদের প্রতি দলের দৃষ্টিভঙ্গি, নেতৃত্ব নির্বাচনের পদ্ধতি এবং এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান হারিয়ে ফেলার বিষয়গুলোকে পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। জামায়াত ইস্যুতে দূরত্বের শুরু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির সঙ্গে যুক্ত বেশ কয়েকজন নারী সংগঠক ও নেত্রী জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান। তাঁদের মধ্যে সামান্তা শারমিন ছাড়াও ছিলেন উমামা ফাতেমা, নুসরাত তাবাসসুম, নাজিফা জান্নাত ও চিকিৎসক তাসনিম জারা। নির্বাচন সামনে রেখে এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যের আলোচনা শুরু করলে প্রথম দিকেই দল ছাড়েন তাসনিম জারা। পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঢাকার একটি আসনে নির্বাচন করে পরাজিত হন তিনি। জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিরোধিতা করে পরবর্তী সময়ে দল ছাড়েন তাজনূভা জাবীন ও সৈয়দা নীলিমা দোলাসহ আরও কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। সামান্তা তখন দল ছাড়েননি। তবে এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্যপদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। এনসিপি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বিভিন্ন সময়ে তাঁকে পর্ষদে ফিরে আসার আহ্বান জানালেও তিনি রাজি হননি। তাঁর অবস্থান ছিল, এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোট না ছাড়লে তিনি রাজনৈতিক পর্ষদে ফিরবেন না। পরে তাঁর জায়গায় অন্য একজন নারী নেত্রীকে পর্ষদে যুক্ত করা হয়। এরপর থেকে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম ও কর্মসূচিতে সামান্তার অংশগ্রহণ কমে যায়। সর্বশেষ গত ২৩ অক্টোবর এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের সময় তাঁর পদেও পরিবর্তন আসে। আগের কমিটিতে তিনি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক থাকলেও নতুন কমিটিতে তাঁকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। এই পরিবর্তনের দুই সপ্তাহের মধ্যে দল ছাড়লেন তিনি। পদত্যাগপত্রে চার কারণ নাহিদ ইসলামকে পাঠানো পদত্যাগপত্রে সামান্তা শারমিন চারটি কারণ তুলে ধরেছেন। তাঁর অভিযোগ, এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান বা ‘লাইন’ স্পষ্ট না থাকায় দলটি জামায়াতের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দলটি এখন বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতের জন্য প্রতিক্রিয়ামূলক ও সহায়ক ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করেন তিনি। বড় রাজনৈতিক দলের ‘লেজুড়’ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত এনসিপির নিজস্ব রাজনীতি এবং অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক ধারার সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে অভিযোগ করেছেন সামান্তা। তাঁর অভিযোগ, নারীদের রাজনৈতিকভাবে পেছনে ঠেলে দেওয়ার ক্ষেত্রে এনসিপির ভূমিকা নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জামায়াত ও অতি ডানপন্থী শক্তিগুলোর রক্ষণশীল অবস্থানের অনুসারী ও সহযোগী হয়ে উঠছে দলটি। কাউন্সিল এড়িয়ে কমিটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন তিনি। তাঁর মতে, এভাবে কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে দলের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পদত্যাগপত্রে সামান্তা লিখেছেন, এসব বিষয়ে বারবার পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানোর পরও এনসিপি তার গতিপথ পরিবর্তনে আগ্রহ দেখায়নি। এ কারণেই তিনি দল থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অভিযোগের জবাবে যা বলছে এনসিপি সামান্তার পদত্যাগে বিস্মিত নন এনসিপির নেতারা। তাঁদের বক্তব্য, জামায়াতের সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্তের পর থেকেই তিনি দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। ফলে পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের সেই নিষ্ক্রিয়তাই আনুষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। সামান্তার অভিযোগের কিছু অংশ ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিনির্ভর এবং কিছু বক্তব্য তথ্যগতভাবে সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার। তাঁর ভাষ্য, সামান্তা ব্যক্তিগত পর্যায়ে দলের অনেকের সঙ্গে কথা বললেও দলীয় ফোরামে অভিযোগগুলো নিয়ে তাঁকে উল্লেখযোগ্যভাবে আলোচনা করতে দেখা যায়নি। সারোয়ার তুষার প্রথম আলোকে বলেন, সাম্প্রতিক কমিটি পুনর্গঠনের আগে সামান্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কমিটিতে থাকতে অনাগ্রহ দেখাননি। তবে প্রত্যাশিত পদ নিয়ে কিছু বলেননি। তিনি বলেন, তাঁরা চাননি সামান্তা দল ছেড়ে যান। দলের আহ্বায়কও বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন অবস্থানের কারণে কেউ যেন দলে অস্বস্তি বা চাপ অনুভব না করেন, সে কথা বলেছেন। এনসিপিতে বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ রয়েছেন উল্লেখ করে সারোয়ার তুষার বলেন, সামান্তা চাইলে জামায়াতবিরোধী ব্লকের নেতৃত্ব দিতে পারতেন। তাঁর দলত্যাগে এনসিপির বিশেষ লাভ বা ক্ষতি দেখছেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সারোয়ারের ভাষায়, সামান্তা অনেক দিন ধরেই নিষ্ক্রিয় ছিলেন; পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সেই নিষ্ক্রিয়তাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন। ফেসবুকে পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া সামান্তার পদত্যাগের পর এনসিপির কয়েকজন নেত্রী ফেসবুকে ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট দিয়েছেন। তাঁদের কেউ সরাসরি তাঁর নাম উল্লেখ না করলেও পোস্টের বক্তব্যে সামান্তাকে ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে। এনসিপির দপ্তর সম্পাদক সাদিয়া ফারজানা তাঁর পোস্টে লিখেছেন, শুধু গণমাধ্যমে পরিচিত মুখ বা বিপুল অনুসারী থাকা নারীরাই নারীসমাজের প্রতিনিধিত্বের দাবিদার নন। তাঁর অভিযোগ, দলের অন্য নারীদের রাজনৈতিকভাবে সামনে আসা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই কয়েকজনের ভূমিকা ছিল। দলের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে পরিচিতি অর্জনের পর দল ছেড়ে যাওয়ার সমালোচনাও করেন তিনি। এনসিপির স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মনজিলা ঝুমাও ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, এনসিপি অনেককে রাজনৈতিক পরিচিতি ও সুযোগ দিয়েছে। অথচ তাঁদের কেউ কেউ দলকে ব্যবহার করে পরে দলটির বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে, এনসিপির বাইরের কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তি সামান্তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম অলটারনেটিভসের সংগঠক মাহফুজ আলম এবং চিকিৎসক তাসনিম জারা। শুক্রবার সকালে দেওয়া এক ফেসবুক পোস্টে মাহফুজ আলম বলেন, ছয় সদস্যের বৈষম্যবিরোধী লিয়াজোঁ কমিটি থেকে চার শতাধিক সদস্যের জাতীয় নাগরিক কমিটিতে উত্তরণ ও বিস্তারে যাঁদের মুখ্য অবদান ছিল, তাঁদের নিয়ে অপপ্রচার ও নোংরামি একটি বাজে নজির। দল গঠনের শুরু থেকেই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সামান্তা শারমিনকে নিয়েও একই ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করেন মাহফুজ। জোটের কারণে দল ছেড়ে যাওয়া ব্যক্তিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁরা দিনরাত পরিশ্রম করেছেন বলেই দলটি একটি কাঠামো পেয়েছিল। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ সম্ভব না হলে রাজনৈতিক সহাবস্থান ও ভালো চর্চার স্বার্থে নীরব থাকার পরামর্শও দেন তিনি। তাসনিম জারা বৃহস্পতিবার রাতে দেওয়া এক ফেসবুক পোস্টে সামান্তার প্রশংসা করেন। তিনি লেখেন, রাজনীতিতে কথা বলতে আসা মানুষের অভাব নেই, কিন্তু অন্যের কথা শুনতে আসা মানুষের সংখ্যা কম। সামান্তাকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জারা বলেন, তিনি মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, তাঁদের জীবন বুঝতে চেষ্টা করেন এবং পাশে দাঁড়াতে চান। তাসনিম জারা আরও লেখেন, সামান্তার রাজনৈতিক পথচলা এখনো অনেক বাকি। এমন মানুষের জন্য দেশের রাজনীতিতে আরও বড় পরিসর তৈরি হওয়া প্রয়োজন। এদিকে, সামান্তার অভিযোগকে সমর্থন করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম। তাঁর দাবি, সামান্তার অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয়েছে এবং এনসিপি জামায়াতের ‘বি-টিম’ হিসেবে কাজ করছে। সামান্তার পদত্যাগে এনসিপির ভেতরে ও বাইরে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা কেবল একজন নেত্রীর দলত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। জামায়াতের সঙ্গে জোট, নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, দলের আদর্শিক অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে এনসিপির ভেতরে আগে থেকে থাকা মতপার্থক্যও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।