প্রকাশ :: ... | ... | ...

কী ইঙ্গিত দিচ্ছে সরকার


সংযুক্ত ছবি

উপরে বাঁ থেকে- আবদুল মঈন খান, সাচিং প্রু জেরী, আন্দালিভ রহমান পার্থ, রশিদুজ্জামান মিল্লাত, হুমায়ুন কবির ও মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথ নেওয়ার পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নতুন মুখ এসেছে। এর পাশাপাশি চারজন নতুন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রীকে মন্ত্রিসভায় যুক্ত করা হয়েছে। বাদ পড়েছেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন; তাঁকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরে বিএনপি যে সরকার গঠন করেছিল, সেখানে অধিকাংশ মন্ত্রীই ছিলেন নতুন মুখ। ফলে ছয় মাসের কাজের অভিজ্ঞতা, মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যক্রম এবং রাজনৈতিক সমীকরণ বিবেচনায় নিয়ে এই রদবদলকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখছেন সাবেক আমলা ও বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। তবে ছয় মাসের মধ্যেই এমন পরিবর্তনকে কিছুটা বিস্ময়কর বলছেন অন্যরা। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর সরকার গঠন করে বিএনপি। ওই দিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়াও ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। পরে মন্ত্রিসভায় কয়েক দফা পরিবর্তন আসে। মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকারের দায়িত্ব নেওয়ায় তাঁর জায়গায় মন্ত্রিসভায় আসেন আহমেদ আযম খান। গত ১ জুন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করেন। আর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মন্ত্রিসভা ছাড়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পদটি শূন্য হয়। সর্বশেষ রদবদলের পর তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় মন্ত্রীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ জনে। প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন ২৪ জন। প্রধানমন্ত্রীর ১০ জন উপদেষ্টার মধ্যে পাঁচজন মন্ত্রী এবং পাঁচজন প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন। সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার মন্ত্রিসভার এই পরিবর্তনকে ‘খুঁটি পাল্টানোর’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, সরকার গঠনের সময় প্রধানমন্ত্রীকে অনেকটাই শূন্য থেকে শুরু করতে হয়েছিল। মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্যও ছিলেন নতুন। ছয় মাস কাজ করার পর প্রধানমন্ত্রী কোথায় পরিবর্তন প্রয়োজন, তা বুঝে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছেন। দীর্ঘ বিরতির পর কোনো দল ক্ষমতায় এলে এমন পরিবর্তন স্বাভাবিক বলেও মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা মারা গেছেন কিংবা বয়সের কারণে আগের মতো সক্রিয় নেই। ফলে নতুন প্রজন্ম ও অভিজ্ঞ নেতাদের সমন্বয় করে সরকার পরিচালনা করা প্রয়োজন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন ছয় মাসের মধ্যে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনকে কিছুটা বিস্ময়কর মনে করছেন। তাঁর মতে, সরকার ও বিএনপি দল হিসেবে ধীরে ধীরে কাছাকাছি চলে আসছে। ফলে দল ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির বিষয়গুলোও রদবদলের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, ‘এখন বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ থেকে অন্তর্ভুক্তিগুলো করা হচ্ছে।’ তাঁর মতে, নতুন মন্ত্রীদের মধ্যে যেমন তরুণেরা আছেন, তেমনি অভিজ্ঞ নেতারাও আছেন। এর মাধ্যমে দল ও সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা এবং সমন্বয়ের চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি নানা ধরনের রাজনৈতিক চাপও কাজ করতে পারে। সর্বশেষ রদবদলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ এবং বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হয়েছেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছেড়ে দেওয়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন আবদুল মঈন খান। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থাকা এই নেতা বিএনপি সরকারের আগের মেয়াদেও মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন আন্দালিভ রহমান পার্থ। তিনি বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোলা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এই মন্ত্রণালয়ের আগের মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন সাচিং প্রু জেরী। গত ১ জুন দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করার পর থেকে মন্ত্রণালয়টির মন্ত্রীর পদটি শূন্য ছিল। বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে পদোন্নতি দিয়ে মন্ত্রী করা হয়েছে। আর ওই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতাকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে শামীম কায়সার লিংকনকে। আর প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরকে একই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানে আগে থেকেই প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। এক মন্ত্রণালয়ে দুজন প্রতিমন্ত্রী থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেছেন, এতে কোনো সমস্যা নেই। সাবেক সচিব আবদুল আউয়াল মজুমদারও মনে করেন, কোন মন্ত্রণালয়ে কতজন প্রতিমন্ত্রী থাকবেন, সেটি প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। মন্ত্রিসভার এই পরিবর্তনের পেছনে মন্ত্রীদের কাজের মূল্যায়ন বড় ভূমিকা রেখেছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। সাবেক সচিব আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকার গঠনের পর থেকেই মন্ত্রীদের ‘পারফরম্যান্স’ বিবেচনার কথা বলে আসছিলেন। ছয় মাসের কাজ দেখে কোথায় পরিবর্তন প্রয়োজন, সেটি বিবেচনা করেই এই পুনর্গঠন করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান অবশ্য মনে করেন, পরিবর্তনের কারণ সামনে এলে তা অন্য মন্ত্রীদের জন্যও একটি বার্তা তৈরি করবে। কোনো মন্ত্রীর নেতিবাচক পারফরম্যান্সের কারণে পরিবর্তন হলে অন্য মন্ত্রীরাও সতর্ক হবেন। তাঁর মতে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আবদুল মঈন খানকে দায়িত্ব দেওয়া যথার্থ সিদ্ধান্ত। তবে জোটসঙ্গী আন্দালিভ রহমান পার্থকে মন্ত্রিসভায় যুক্ত করার রাজনৈতিক বার্তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তিনি মনে করেন, পার্থ সরকারের পক্ষে জনমত তৈরি এবং বিভিন্ন বিষয়ে জোরালো বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারেন। জহির উদ্দিন স্বপনকে মন্ত্রী থেকে উপদেষ্টা করার পেছনে তাঁকে দলীয় কাজে আরও বেশি ব্যবহার করার পরিকল্পনা থাকতে পারে বলেও মনে করেন অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান। তাঁর ভাষায়, এই রদবদলের বড় উদ্দেশ্য সম্ভবত সরকারকে নতুন গতি দেওয়া। সামান্য কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকার ও দলের প্রয়োজন অনুযায়ী নেতাদের বিভিন্ন জায়গায় কাজে লাগানোর চেষ্টা হয়েছে। ফলে এই পুনর্গঠনের কারণে সরকারের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে—এমনটা তিনি মনে করেন না। সব মিলিয়ে ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভার এই পরিবর্তনকে শুধু কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদবদল হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের চলে যাওয়া, শূন্য মন্ত্রণালয়ে নতুন নেতৃত্ব, জোটসঙ্গীকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া এবং অভিজ্ঞ নেতাদের পুনরায় নির্বাহী দায়িত্বে আনার মধ্য দিয়ে সরকার একই সঙ্গে প্রশাসনিক গতি, রাজনৈতিক সমন্বয় এবং দলের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য—তিনটি বিষয় সামলানোর চেষ্টা করছে। আগামী কয়েক মাসে নতুন দায়িত্ব পাওয়া মন্ত্রীদের কার্যক্রমই শেষ পর্যন্ত এই রদবদলের প্রকৃত উদ্দেশ্য কতটা সফল হয়েছে, তার বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে।