৭৭ শাখার ৫১টিতে আগের আমির বহাল, ১০ জেলায় এক দশকের বেশি একই নেতৃত্ব; ১১ জনের নামের আগে ‘অধ্যাপক’, পাঁচজনের সঙ্গে ‘অধ্যক্ষ’ পদবি, এমপিওভুক্ত কলেজে পূর্ণ অধ্যাপক পদ নেই, দাখিল মাদ্রাসার প্রধানের নামের সঙ্গেও ‘অধ্যক্ষ’। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জেলা ও মহানগর পর্যায়ের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে পুরোনোদের আধিপত্যই বেশি। ২০২৭-২৮ মেয়াদের জন্য ঘোষিত ৭৭টি সাংগঠনিক শাখার মধ্যে ৫১টিতেই আগের আমিররা বহাল রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ১০ জেলার আমির এক দশক বা তার বেশি সময় ধরে একই দায়িত্ব পালন করছেন। ঝালকাঠিতে একজন ২০০৪ সাল থেকে টানা ২২ বছর আমিরের দায়িত্বে রয়েছেন। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জেলায় দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের পরিবর্তে নতুন মুখও এসেছে। নতুন নেতৃত্বের তালিকা ঘিরে আরেকটি প্রশ্ন উঠেছে আমিরদের পেশাগত পরিচয় ও পদবি নিয়ে। তালিকায় ১১ জনের নামের আগে ‘অধ্যাপক’ এবং পাঁচজনের নামের সঙ্গে ‘অধ্যক্ষ’ লেখা হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধ্যাপক পরিচয় দেওয়া ১১ জনের মধ্যে আটজন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহকারী অধ্যাপক, দুজন প্রভাষক। অপর একজনের শিক্ষকতা ও পদবি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে অধ্যক্ষ পরিচয় দেওয়া একজনের প্রতিষ্ঠান দাখিল স্তর পর্যন্ত পাঠদান করে, যেখানে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের পদবি সাধারণত সুপার বা সুপারিনটেনডেন্ট। নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও পদবি ব্যবহারের এ দুই বিষয় জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো, নেতৃত্ব নির্বাচনের চর্চা এবং প্রকাশিত তালিকায় পেশাগত পরিচয় উপস্থাপনের ধরন নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। গত বুধবার (৪ নভেম্বর) জামায়াতের ২০২৭-২৮ মেয়াদের জেলা ও মহানগর আমিরদের নাম ঘোষণা করা হয়। দলের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংগঠনের রুকনদের (সদস্য) গোপন ভোটে তাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন। রাজধানীর মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে নির্বাচিতদের নাম ঘোষণা করেন জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। ৯ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মা’ছুমের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন এ প্রক্রিয়া পরিচালনা করে। প্রতিটি শাখার জন্য আলাদা প্রিসাইডিং কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছিল। পুরোনো নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৭৭টি ঘোষিত শাখার ৫১টিতে আগের আমিররাই নতুন মেয়াদে দায়িত্ব পেয়েছেন। প্রথম আলোর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ৪৯টি শাখার নেতৃত্বের বিস্তারিত হিসাব পাওয়া গেছে। তাতে দেখা যায়, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, ঝালকাঠি, ময়মনসিংহ, শেরপুর, মেহেরপুর, টাঙ্গাইল, রাঙামাটি ও বান্দরবানে আমিররা অন্তত ১০ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন মেয়াদেও তাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে একই পদে থাকার ক্ষেত্রে ঝালকাঠির হাফিজুর রহমান সবচেয়ে এগিয়ে। ২০০৪ সাল থেকে তিনি জেলা আমিরের দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ায় তাঁর নেতৃত্বের সময়কাল দাঁড়িয়েছে ২২ বছর। রাঙামাটির মোহাম্মদ আবদুল আলীম ও বান্দরবানের এস এম আবদুছ ছালাম আজাদ ১৬ বছর ধরে দায়িত্ব পালনের পর আবার নির্বাচিত হয়েছেন। সিরাজগঞ্জের মো. শাহিনুর আলম একই পদে ১৪ বছর দায়িত্ব পালনের পর নতুন মেয়াদেও দায়িত্ব পেয়েছেন। এ ছাড়া নাটোর, বরিশাল মহানগর, বরগুনা, নড়াইল, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ এবং মানিকগঞ্জের আমিররা পঞ্চম মেয়াদে নির্বাচিত হয়েছেন। অর্থাৎ কয়েকটি শাখায় নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা এক দশকের সীমা ছাড়িয়ে আরও দীর্ঘ হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে আলোচনা থাকলেও নতুন নির্বাচনে অধিকাংশ শাখায় পুরোনো আমিরদের ওপরই আস্থা রেখেছেন রুকনরা। এর আগে একই ব্যক্তিদের বছরের পর বছর জেলা নেতৃত্বে থাকার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন মেয়াদে কিছু পরিবর্তন এলেও বড় অংশে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। কয়েকটি জেলায় নেতৃত্বে পরিবর্তন দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন আমিরের জায়গায় এবার নতুন মুখ এসেছে। খাগড়াছড়িতে প্রায় ২৮ বছর জেলা আমিরের দায়িত্ব পালন করা সৈয়দ মো. আবদুল মোমেনের পরিবর্তে নির্বাচিত হয়েছেন মিনহাজুর রহমান। তিনি আগে জেলা শাখার সেক্রেটারি ছিলেন। এ ছাড়া জয়পুরহাটে গোলাম কিবরিয়া, খুলনায় কবিরুল ইসলাম, বরিশালে মাহফুজুর রহমান, রাজবাড়ীতে হাসমত আলী এবং লক্ষ্মীপুরে এ আর হাফিজুল্লাহ নতুন আমির হয়েছেন। এসব জেলায় আগের আমিরদের কেউ কেউ ১৭ থেকে ২৩ বছর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। মহানগর শাখাগুলোর মধ্যে বগুড়ায় আবদুল মালেক, রাজশাহীতে মো. জাহাঙ্গীর, ময়মনসিংহে আসাদুজ্জামান সোহেল এবং গাজীপুরে খায়রুল হাসান নতুন আমির হয়েছেন। জেলা পর্যায়ে ঠাকুরগাঁওয়ে মোহাম্মদ আলমগীর, দিনাজপুরে এনামুল হক, রংপুরে এনামুল হক, পাবনায় নজরুল ইসলাম, নওগাঁয় মাহফুজুর রহমান, ঝিনাইদহে আবদুল আউয়াল, মাগুরায় সাঈদ আহমাদ, পিরোজপুরে আ. রব, কিশোরগঞ্জে আজিজুল হক, গাজীপুরে সেফাউল হক, নরসিংদীতে ইব্রাহিম ভূঁইয়া, ফরিদপুরে ইমতিয়াজ উদ্দিন আহমদ এবং সুনামগঞ্জে শামসুদ্দিন নতুন আমির হয়েছেন। লক্ষ্মীপুরের নতুন আমির এ আর হাফিজুল্লাহ আগে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনী প্রচারে ‘দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেন, জান্নাত অবধারিত’ মন্তব্য করে তিনি আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। নারায়ণগঞ্জে মাসুদুর রহমান চলতি বছরের শুরুতে ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব পান। এবার তিনি নির্বাচিত আমির হয়েছেন। অন্যদিকে কুড়িগ্রামের মো. আজিজুর রহমান ১৯৯৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর জেলা আমির ছিলেন। গত বছরের ডিসেম্বরে আবার দায়িত্ব পাওয়ার পর নতুন মেয়াদেও তাঁকে নির্বাচিত করেছেন রুকনরা। তবে কুমিল্লা মহানগর ও জামালপুর জেলা শাখার আমিরের নাম ঘোষণার সময় জানানো হয়নি। কুমিল্লা মহানগর কার্যালয় চত্বরে গত ১৪ অক্টোবর ককটেল বিস্ফোরণ ও ভাঙচুরের ঘটনার দুই দিন পর দলটি মহানগর কমিটি ভেঙে দেয় এবং দীর্ঘদিনের আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদকে অব্যাহতি দেয়। এ কারণে সেখানে নতুন কমিটির ভোট গ্রহণ হয়নি। জামালপুরে ভোট হলেও কিছু পর্যালোচনার জন্য ফল প্রকাশ স্থগিত রাখা হয়েছে। অধ্যাপক পরিচয়, বাস্তবে সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক নতুন আমিরদের তালিকায় ১১ জনের নামের আগে অধ্যাপক পদবি ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন—পঞ্চগড়ের মো. ইকবাল হোসাইন, কুড়িগ্রামের আজিজুর রহমান সরকার, পাবনার নজরুল ইসলাম, রাজশাহীর আব্দুল খালেক, যশোরের মো. গোলাম রছুল, মাগুরার সাঈদ আহমাদ, খুলনা মহানগরীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, সাতক্ষীরার শহীদ ইসলাম, গোপালগঞ্জের রেজাউল করিম, কুমিল্লা উত্তরের মো. আব্দুল মতিন এবং রাঙামাটির মোহাম্মদ আব্দুল আলীম। তাঁদের পেশাগত পরিচয় যাচাইয়ে দেখা গেছে, আটজন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বা করছেন। পঞ্চগড়ের মো. ইকবাল হোসাইন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ডিগ্রি ইনস্টিটিউটের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। যশোরের গোলাম রছুল হামিদপুর আল হেরা কলেজের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। খুলনা মহানগরীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান খুলনা সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসার বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং রাঙামাটির মোহাম্মদ আব্দুল আলীম আল আমিন ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। গোপালগঞ্জের রেজাউল করিম কাশিয়ানী উপজেলার রাজপাট ডিগ্রি কলেজের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। কুমিল্লা উত্তরের মো. আব্দুল মতিন ব্রাহ্মণপাড়ার সাহেবাবাদ ডিগ্রি কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শেষে অবসরে গেছেন। রাজশাহীর আব্দুল খালেক গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা আদর্শ ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক। সাতক্ষীরার শহীদুল ইসলাম সাতক্ষীরা সিটি কলেজের সাবেক সহকারী অধ্যাপক। কুড়িগ্রামের আজিজুর রহমান সরকার ভুরুঙ্গামারী ডিগ্রি কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এবং হিসাববিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন। তবে দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি প্রভাষক পদে থেকেই অবসরে গেছেন। পাবনার নজরুল ইসলামও ২০২০ সাল পর্যন্ত জয়পুরহাটের তালিমুল ইসলাম একাডেমি অ্যান্ড কলেজে প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) শিক্ষক তথ্য পোর্টালে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি প্রথমে সাচিবিক বিদ্যা এবং পরে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক ছিলেন। ২০২০ সালের পর ওই পোর্টালে তাঁর নাম পাওয়া যায়নি। মাগুরার সাঈদ আহমাদের শিক্ষকতা বা পেশাগত পদবি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর নামের আগে অধ্যাপক পদবি ব্যবহারের ভিত্তিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও অধ্যাপক পদবি ব্যবহার করেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনি একসময় খুলনা ইসলামিয়া কলেজে দুই বছর প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন; সহকারী অধ্যাপক হননি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমপিও নীতিমালা ও জনবল কাঠামো অনুযায়ী, বেসরকারি ডিগ্রি ও অনার্স কলেজে প্রভাষক এবং সহকারী অধ্যাপক পদ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপক পদ সাধারণত নেই। ফলে কোনো শিক্ষক প্রভাষক বা সহকারী অধ্যাপক পদে কর্মরত থাকলে দাপ্তরিক পরিচয়ে তাঁকে অধ্যাপক বলার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। দীর্ঘ শিক্ষকতা, অভিজ্ঞতা কিংবা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করলেই নিয়োগকাঠামোর পদবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হয় না। তবে সামাজিকভাবে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করা ব্যক্তিদের অধ্যাপক বলে সম্বোধনের প্রচলন রয়েছে। এই সামাজিক সম্বোধন এবং প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকাঠামো অনুযায়ী স্বীকৃত পদবি এক নয়। একজন জেলা আমির সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত এমন একটি কলেজের অধ্যক্ষ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এমপিওভুক্ত কলেজে সর্বোচ্চ পদ সহকারী অধ্যাপক। সেখানে সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদ নেই। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কেউ অধ্যক্ষ বা উপাধ্যক্ষ হতে পারেন, কিন্তু সেটি অধ্যাপক পদে পদোন্নতির সমতুল্য নয়। তাঁর মতে, প্রভাষক বা সহকারী অধ্যাপক হয়েও অধ্যাপক পদবি ব্যবহার করা সমীচীন নয়। অধ্যক্ষ পদবি নিয়েও প্রশ্ন নতুন আমিরদের তালিকায় পাঁচজনের নামের সঙ্গে অধ্যক্ষ পদবি রয়েছে। তাঁরা হলেন—নীলফামারীর মাওলানা আব্দুস সাত্তার, কুষ্টিয়ার খন্দকার এ কে এম আলি মহসিন, খুলনার মাওলানা কবিরুল ইসলাম, বরিশাল মহানগরীর জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর এবং কক্সবাজারের মাওলানা নূর আহমদ আনোয়ারী। নীলফামারীর আব্দুস সাত্তার ডিমলা কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। খুলনার কবিরুল ইসলাম আটলিয়া সিদ্দিকিয়া আলিম মাদ্রাসা এবং কক্সবাজারের নূর আহমদ আনোয়ারী হ্নীলা শাহ মজিদিয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। তবে বরিশাল মহানগর জামায়াতের আমির জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের প্রতিষ্ঠান আল-ফারূক আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষাক্রম কিন্ডারগার্টেন থেকে দাখিল দশম শ্রেণি পর্যন্ত। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮০ সালে আল-ফারূক সোসাইটির উদ্যোগে ‘আল ফারূক একাডেমি’ নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। গত বছর এর নাম পরিবর্তন করে ‘আল ফারূক আলিয়া মাদ্রাসা’ রাখা হয়। দাখিল স্তরের মাদ্রাসায় প্রতিষ্ঠানপ্রধানের পদ সাধারণত সুপার বা সুপারিনটেনডেন্ট। ফলে প্রতিষ্ঠানটির প্রধানের ক্ষেত্রে অধ্যক্ষ পদবি ব্যবহারের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের আমির খন্দকার এ কে এম আলি মহসিনের নামের সঙ্গে অধ্যক্ষ পদবি থাকলেও তিনি কোন প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। আমিরদের ব্যাখ্যা ও দলের অবস্থান পদবি ব্যবহারের বিষয়ে রাজশাহী জেলা জামায়াতের আমির ও মাটিকাটা আদর্শ ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক আব্দুল খালেক বলেন, তিনি নিজের পরিচয়ে সহকারী অধ্যাপক লেখেন, অধ্যাপক লেখেন না। অন্যরা তাঁকে অধ্যাপক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। দীর্ঘদিন ধরে প্রচারণা ও মুখে মুখে এ পরিচিতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে তাঁর দাবি। এমপিওভুক্ত কলেজে অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপক পদ নেই—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রচলিতভাবে এ ধরনের পদবি ব্যবহার হয়ে আসছে। তবে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার মতো আইনগত প্রক্রিয়ায় পদবি ব্যবহারের বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচনা করতে হয়। কুড়িগ্রাম জেলা জামায়াতের আমির আজিজুর রহমান সরকারও বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে অধ্যাপক পদবি ব্যবহার করেন না; অন্যরাই তাঁর নামের সঙ্গে এটি যুক্ত করেন। তাঁর ভাষ্য, ভুরুঙ্গামারী ডিগ্রি কলেজে প্রায় ৩৩ বছর চাকরি করেছেন এবং ভাইস প্রিন্সিপালের দায়িত্বও পালন করেছেন। ২০১৬ সালে কলেজটি সরকারি হওয়ার পর চাকরির কাঠামো বদলে যাওয়ায় তিনি সহকারী অধ্যাপক হতে পারেননি; প্রভাষক পদ থেকেই অবসরে যেতে হয়েছে। একই সময়ে তাঁর সরাসরি শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ অধ্যাপক ও কলেজের অধ্যক্ষ হয়েছেন বলেও জানান তিনি। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার পর কেউ অধ্যাপক বলে পরিচয় দিলে সেটিকে বড় অপরাধ হিসেবে দেখেন না তিনি। জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সরকারিভাবে অধ্যাপক হওয়ার নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া রয়েছে। তবে প্রচলিত অর্থে যাঁরা অধ্যাপনা বা শিক্ষকতা করেন, তাঁদের নামের আগে অধ্যাপক লেখা হয়। তাঁর ভাষ্য, এটি ভুয়া পদবি ব্যবহার নয়; অধ্যাপনা বলতে শিক্ষকতাকেও বোঝায়। দাখিল মাদ্রাসার প্রধানের নামের সঙ্গে অধ্যক্ষ পদবি ব্যবহারের বিষয়ে জুবায়ের বলেন, কলেজের বাইরেও মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রিন্সিপাল পদবি ব্যবহার করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠানে রয়েছেন। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকাঠামোয় স্বীকৃত পদবি, সামাজিকভাবে প্রচলিত সম্বোধন এবং রাজনৈতিক দলের প্রকাশিত তালিকায় ব্যবহৃত পরিচয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। জামায়াতের তালিকায় এসব পদবি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোন মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে যশোর জেলা আমির ও সংসদ সদস্য গোলাম রছুলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর ব্যবহৃত নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। গোপালগঞ্জ জেলা আমির রেজাউল করিম ফোন ধরেননি। বারবার নির্বাচিত হওয়ার বিষয়ে দলের ব্যাখ্যা জামায়াতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, জেলা ও মহানগর আমিরের মেয়াদ দুই বছর। রুকনদের গোপন ব্যালটে তাঁরা নির্বাচিত হন। একই ব্যক্তি বারবার নির্বাচিত হওয়ার বিষয়ে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম প্রথম আলোকে বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী রুকনরা দায়িত্বশীল নির্বাচনে ভোট দেন। ইসলামি সংগঠন হিসেবে জামায়াতের নেতৃত্বের কিছু স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এক বা দুই বছর দায়িত্ব পালন করে অনেকে সংগঠনের কার্যক্রম পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেন না। সে কারণে কেউ কেউ একাধিকবার নির্বাচিত হন। রুকনরা ভোট দিয়েই তাঁদের নির্বাচিত করেন। দলটির এই ব্যাখ্যায় নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাকে সদস্যদের ভোটের সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে ৭৭টি শাখার ৫১টিতে আগের আমিরদের বহাল থাকা এবং কয়েকটি জেলায় দুই দশকের বেশি সময় একই ব্যক্তির দায়িত্ব পালনের তথ্য দলটির স্থানীয় নেতৃত্বে পরিবর্তনের গতি নিয়ে প্রশ্নও সামনে এনেছে। অন্যদিকে নতুন তালিকায় পেশাগত পদবি ব্যবহারের বিতর্ক দেখিয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি নেতাদের শিক্ষাগত ও পেশাগত পরিচয় উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও স্বীকৃত দাপ্তরিক পদবি ও প্রচলিত সামাজিক সম্বোধনের পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি। তথ্যসূত্র : প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস