সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী রতনের দাবি, ১৯৭২ সালের পর দলীয় কর্মসূচিতে স্লোগানটি দেওয়া হয়নি; সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্সের বক্তব্য, মুক্তিযুদ্ধের পরও বিভিন্ন সম্মিলিত আন্দোলনে স্লোগানটি দিয়েছেন বামপন্থীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতাদের মধ্যে মতভেদ প্রকাশ্যে এসেছে। দলটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী রতনের বক্তব্য, ১৯৭২ সালের পর থেকে সিপিবি কোনো দলীয় কর্মসূচি বা সমাবেশে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেয়নি। তবে দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্সের বক্তব্য, মুক্তিযুদ্ধের পরও বিভিন্ন সম্মিলিত আন্দোলনে স্লোগানটি দেওয়া হয়েছে। এমনকি ১৯৭৩ সালে সিপিবির দ্বিতীয় কংগ্রেসের উদ্বোধনী অধিবেশনেও স্লোগানটি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি তাঁর। সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর পল্টনে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয় মুক্তি ভবনে হামলার ঘটনার পর এ বিতর্ক সামনে আসে। সুনামগঞ্জে নারী বাউল শিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে ধানমন্ডিতে আয়োজিত মানববন্ধনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সূত্রপাত হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। পরে ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলকে পুলিশ আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর তাঁর সমর্থকদের আনন্দমিছিল চলাকালে হামলার অভিযোগ ওঠে। সিপিবির নেতারা দাবি করেন, হামলাকারীরা তাঁদের কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে নেতাকর্মীদের অবরুদ্ধ করে রাখেন। সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রতন নিজের ফেসবুক পেজে লিখেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় কমিউনিস্ট পার্টি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছে। তবে ১৯৭২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দলটি কোনো কর্মসূচি বা সমাবেশে স্লোগানটি দেয়নি। সোমবার রাতে মুক্তি ভবনে হামলার প্রতিবাদে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘জয় বাংলা’ মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। আওয়ামী লীগ এই স্লোগান ব্যবহার করে অন্যায় করে থাকলেও তার অর্থ এই নয় যে, স্লোগানটি পরিত্যাগ করতে হবে। স্লোগানটি দেওয়া হয়ে থাকলেও তা সিপিবির কার্যালয়ে হামলার অজুহাত হতে পারে না। মানববন্ধন থেকে হামলার অভিযোগ সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কে ‘প্রতিবাদী শিল্পী জনতার’ ব্যানারে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। সুনামগঞ্জে নারী বাউল শিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়া এবং দেশজুড়ে সাংস্কৃতিক আয়োজনের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানাতে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়। এতে সিপিবি, ছাত্র ইউনিয়ন ও উদীচীর নেতাকর্মীদের পাশাপাশি শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা অংশ নেন। কর্মসূচিতে পুলিশি বাধার অভিযোগ ওঠে। অভিনেত্রী সুমনা সোমার ভাষ্য, মানববন্ধনের সময় পুলিশের একজন সদস্য ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে নিষেধ করেন। এর প্রতিবাদ জানালে ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলকে আটক করা হয়। সুমনা সোমা বলেন, দেশজুড়ে বাউলদের ওপর হামলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদ জানাতেই তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান বাঙালির অস্তিত্ব ও স্বাধীনতাসংগ্রামের অর্জনের সঙ্গে যুক্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁরা এই স্লোগান দেবেন এবং কেউ তাঁদের থামাতে পারবে না। দীপক শীলকে ছেড়ে দেওয়ার পর রাতে ছাত্র ও যুব ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা পল্টনে আনন্দমিছিল বের করেন। বামপন্থী সংগঠনগুলোর নেতাদের অভিযোগ, মিছিল চলাকালে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাঁদের ওপর চড়াও হন। একপর্যায়ে পুরানা পল্টনের মুক্তি ভবনে সিপিবির কার্যালয়ে হামলা চালানো হয় এবং সেখানে থাকা নেতাকর্মীদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। সোমবার রাত ১০টার দিকে সংঘটিত এ হামলার জন্য বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের দায়ী করেছে সিপিবি। তবে বিএনপির নেতাকর্মীরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল ইসলাম বলেন, দীপক শীলকে আটক করে পরে ছেড়ে দেওয়ার পর তাঁর সমর্থকেরা উল্লাস করতে করতে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন। এ অভিযোগে ক্ষুব্ধ হয়ে কিছু ব্যক্তি হামলা চালান বলে তিনি জানান। সিপিবির পক্ষ থেকে হামলাকারীদের কেউ কেউ বিএনপির নেতাকর্মী বলে অভিযোগ করা হয়েছে; তবে বিএনপির নেতাকর্মীরা তা অস্বীকার করেছেন। ঘটনা তদন্তাধীন এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ দুই পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নিয়েছে বলে জানান ওসি। সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দনের দাবি, হামলাকারীরা অভিযোগ করেছেন, সিপিবির নেতাকর্মীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছেন। কিন্তু সিপিবির কার্যালয় থেকে এ ধরনের কোনো স্লোগান দেওয়া হয়নি। ১৯৭৩ সালের কংগ্রেসে কী হয়েছিল ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিয়ে সিপিবির ভেতরের মতভেদের কেন্দ্রে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দলটির রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সম্মিলিত আন্দোলনে স্লোগানটির ব্যবহার। দলটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্সের বক্তব্য, মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘জয় বাংলা’র পাশাপাশি ‘জয় সমাজতন্ত্র’, ‘জয় সর্বহারা’ এবং ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগানও দেওয়া হতো। স্বাধীনতার পরও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী শক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সম্মিলিত কর্মসূচিতে বামপন্থীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছেন। প্রিন্সের দাবি, ১৯৭৩ সালের ৪ থেকে ৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সিপিবির দ্বিতীয় কংগ্রেসের উদ্বোধনী অধিবেশনে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম, যিনি বারীণ দত্ত নামেও পরিচিত, বক্তব্যের শেষে ‘বিশ্ব কমিউনিস্ট ঐক্য জিন্দাবাদ’, ‘গণ ঐক্যজোট জিন্দাবাদ’ ও ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন। প্রিন্স বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘জয় বাংলা’ ছিল সর্বজনীন স্লোগান। তবে কমিউনিস্ট পার্টির নিজস্ব মূল স্লোগান ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন, জাহানারা ইমামের গণআদালত এবং গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনেও বামপন্থীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধভাবে সক্রিয় ছিলেন বলে জানান তিনি। অন্যদিকে নিজের বক্তব্যে অনড় রয়েছেন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী রতন। তাঁর ভাষ্য, ১৯৬৯ সাল থেকেই ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সে সময় ছাত্র ইউনিয়ন এই স্লোগান না দিয়ে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ ও ‘জয় সমাজতন্ত্র’ স্লোগান দিত। রতন বলেন, ১৯৭২ সালের পর সিপিবি দলীয়ভাবে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেয়নি। ১৯৭৩ সালের দ্বিতীয় কংগ্রেসে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম স্লোগানটি দিয়েছিলেন বলে তিনি শুনেছেন। তবে তাঁর জানা মতে, এরপর সিপিবির নিজস্ব কোনো কর্মসূচিতে স্লোগানটি দেওয়া হয়নি। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এরশাদবিরোধী আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে রতন বলেন, মুজিববাদী ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নসহ বাম সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মসূচিতেও ছাত্র ইউনিয়ন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেয়নি। তবে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সর্বজনীন আন্দোলনে স্লোগানটি ব্যবহারের কথা তিনি স্বীকার করেন। এভাবে সিপিবির দুই নেতার বক্তব্যে একটি পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। রতন মূলত দলটির নিজস্ব কর্মসূচিতে স্লোগান ব্যবহারের নজির নিয়ে কথা বলছেন। অন্যদিকে প্রিন্স দলীয় কর্মসূচির পাশাপাশি সম্মিলিত আন্দোলন ও ১৯৭৩ সালের দ্বিতীয় কংগ্রেসের ঘটনাও সামনে আনছেন। ফলে বিতর্কটি শুধু ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের ঐতিহাসিক ব্যবহার নিয়ে নয়; সিপিবির দলীয় পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে স্লোগানটির ভূমিকা নিয়েও।