বিএনপির বিরোধিতা করতে গিয়ে জামায়াত-শিবিরের কাছে যাওয়ার খেসারত সেকুলার সমাজকে দিতে হবে বলে মন্তব্য সাবেক উপদেষ্টার দেশের সুশীল সমাজের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর একাংশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। তাঁর মতে, ক্ষমতার রাজনীতি ও সংস্কারের নামে বিএনপির বিরোধিতা করতে গিয়ে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জামায়াত-শিবিরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এর খেসারত তাদের দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার রাতে ‘জুলাই-পরবর্তী রাজনীতির আজব দশা’ শিরোনামে নিজের ফেসবুক পোস্টে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন মাহফুজ আলম। তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই সেকুলার সিভিল সোসাইটির বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জামায়াত-শিবিরের প্রতি আনুগত্য দেখানোর প্রবণতা লক্ষ করেছেন তিনি। ফেসবুক পোস্টে মাহফুজ লেখেন, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা এবং সংস্কারের নামে বিএনপির বিরোধিতা করতে গিয়ে সেকুলার সমাজের একটি অংশ জামায়াত-শিবিরের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করেছে। তাঁর ভাষায়, অনেকে এখন সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না। ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচার ও ব্যক্তিগত আক্রমণের প্রসঙ্গ টেনে মাহফুজ বলেন, এসব তৎপরতার চাপে অনেকে ডানপন্থা থেকে উগ্র ডানপন্থার দিকে চলে গেছেন। তাঁর ভাষায়, ডিজিটাল ‘মব’ মূলত পরিকল্পিত প্রচার ও চরিত্রহননের একটি প্রক্রিয়া, যা এড়িয়ে চলা কঠিন। দেশের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরে তিনি লেখেন, ‘দেশ (উগ্র) ডানপন্থার ট্রেনে উঠে গেছে।’ তাঁর মতে, বিভিন্ন ধারার নরম ও কট্টর ডানপন্থি শক্তির সম্মিলিত তৎপরতা এ প্রবণতাকে আরও জোরালো করছে। মাহফুজের বক্তব্য, বিএনপির বিরোধিতা করতে গিয়ে জামায়াত-শিবিরের কাছে যাওয়ার খেসারত সেকুলার সমাজকে দিতে হবে। একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী আলেম সমাজের একাংশও জামায়াতকে রাজনৈতিক সুবিধা দিতে গিয়ে পরিণামে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর দাবি, রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে জামায়াত, আর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে অন্য দুই পক্ষকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। তবে ফেসবুক পোস্টে মাহফুজ যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করেছেন, তাঁদের নাম উল্লেখ করেননি। তাঁর অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর মন্তব্যকে রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে তিনজন উপদেষ্টা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত হন। মাহফুজ আলম প্রথমে উপদেষ্টা পদমর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগের দিন, ১০ ডিসেম্বর তিনি উপদেষ্টার পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন। নির্বাচনে তাঁর অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে প্রার্থী হিসেবে দেখা যায়নি। সংসদ নির্বাচনের পর মার্চে ‘অল্টারনেটিভস’ নামের একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আবারও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন মাহফুজ। তরুণদের রাজনীতিতে ইতিবাচক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত এ প্ল্যাটফর্মে তাঁর সঙ্গে রয়েছেন এনসিপির সাবেক নেত্রী তাজনূভা জাবীন। সাম্প্রতিক পোস্টে মাহফুজের বক্তব্যে জুলাই-পরবর্তী রাজনীতিতে দলগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক, সুশীল সমাজের ভূমিকা এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব নিয়ে তাঁর উদ্বেগ উঠে এসেছে। তবে দেশের রাজনীতি সামগ্রিকভাবে ‘উগ্র ডানপন্থার’ দিকে এগোচ্ছে কি না, তা নির্ধারণে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি দলগুলোর কর্মসূচি, জনসমর্থন, নীতিগত অবস্থান ও বাস্তব রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বিবেচনা করা প্রয়োজন।