প্রকাশ :: ... | ... | ...

পশ্চিমবঙ্গে ‘মাংসের রাজনীতি’: সংকটে মুসলমানের ঈদ, বিপাকে হিন্দু খামারিরাও


সংযুক্ত ছবি

গো-মাংস ভক্ষণরত শুভেন্দু অধিকারীর ভিডিওর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি গো-ভক্ত শুভেন্দু অধিকারীর ছবিও ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন মাধ্যমে।

পশ্চিমবঙ্গে এখন ‘মাংসের রাজনীতি’ তুঙ্গে। কোরবানির ঈদের মুখে ১৯৫০ সালের পুরনো আইন কঠোরভাবে বলবৎ করার পেছনের রহস্যটা কী? ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ভাঙড় এলাকার সুখবাজার হাটে একজোড়া বলদ বিক্রি করার চেষ্টা করছেন আপন মৃধা নামের একজন ক্ষুদ্র খামারি। ছবি: শোয়াইব দানিয়াল/স্ক্রল ডট ইন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রকাশ্যে গরু জবাই করা যাবে কি না, সংখ্যালঘু মুসলমানরা আসন্ন কোরবানির ঈদে পশু কোরবানি দিতে পারবে কি না—এই তর্ক যখন তুঙ্গে, তখন সদ্য নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পুরনো কাণ্ড বলে একটা ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে একজনকে বলতে দেখা যাচ্ছে, “শুভেন্দু আমার সামনে কোরবানির দিনে এক বাটি না, দুই বাটি না, তিন বাটি গরুর মাংস খেয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে পশ্চিম মেদিনীপুরে শাহাবুদ্দিনের বাড়িতে। আবার রাতে খাবে বলে টিফিন ক্যারিয়ারে করে মাংস বয়ে নিয়ে গেছে।” ‘জার্নালজি’ নামের একটি গ্রুপে পোস্ট করা এই ভিডিওটি ইতিমধ্যে ৩ লাখ ৭৩ হাজার বার দেখা হয়েছে, রিয়্যাকশন পড়েছে ১০ হাজারের বেশি। যেহেতু এই ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি, ধরে নিলাম, এটি বানানো। সংখ্যালঘু মুসলিমের ভোট যাদের প্রধান ভরসা, এবারের নির্বাচনে সেই তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবি হলেও শুভেন্দু অধিকারী একদা ওই দলটিরও অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি ছিলেন, তাই সংশয় তো কিছুটা রয়েই যায়। তবে হাল-আমলে অতি রামভক্ত শুভেন্দু অধিকারী গরুর মাংস খান কি না, হিন্দু ধর্মের অনুসারী হয়ে গরুর মাংস খাওয়া অপরাধ কি না, আবার প্রকাশ্যে না খেয়ে গোপনে মাংস খাওয়া যাবে কি না—এই লেখার উপজীব্য সেসব নয়। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ কী খাবেন আর কী খাবেন না, সে বিষয়ে কাউকে তিনি জবাবদিহি করতে যেমন বাধ্য নন, তেমনি তার খাদ্যাভ্যাস নিয়ে প্রশ্ন তোলাও অনুচিত! কিন্তু সমস্যাটা তৈরি হয়েছে তখনই, যখন মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন হওয়ার পর তিনি প্রকাশ্যে গবাদি পশুর মাংস কাটা ও বিক্রিতে ১৯৫০ সালের ‘পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন’ অনুযায়ী বেশ কিছু নিয়মকানুন নতুন করে বলবৎ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এর আগেও অবশ্য এই আইন বলবৎ ছিল, কিন্তু আগে সেভাবে মানা হয়নি। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে রাজ্য সরকার সেই আইন বাস্তবায়নের জন্য দৃশ্যত যুদ্ধে নেমে পড়েছে। আইনে কী আছে? ৭৬ বছর পুরনো এই আইন অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তার অনুমোদন ছাড়া গবাদি পশু হত্যা করা যাবে না। ১৪ বছরের নিচে বয়স এমন গবাদি পশুকে বলি (জবাই) দেওয়া নিষেধ। পশুর মাংস কাটার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা পশ্চিমবঙ্গের প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তাদের লিখিত অনুমতি নিতে হবে এবং আইন অনুযায়ী, ‘পশু’ বলতে ষাঁড়, বলদ, গরু, বাছুর ও মোষকে বুঝাবে। জারি করা প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, পৌরসভার চেয়ারম্যান ও পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি প্রথমে প্রাণীটিকে দেখে নির্ধারণ করবেন বয়স ১৪ বছরের বেশি কি না। যদি তা না হয়, কিন্তু পশুটি বিকলাঙ্গ হয় বা সন্তান প্রজননে অক্ষম হয়, সেক্ষেত্রেও কর্মকর্তা জবাইয়ের সার্টিফিকেট দিতে পারবেন। এছাড়াও পশুর মাংস ঢেকে বিক্রি করা, বাসি মাংস বেশিক্ষণ পরে বিক্রি না করা প্রভৃতি বিষয়েও নির্দেশিকা জারি করেছে সরকার। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠেছে যে,মুসলমানদের কোরবানির ঈদের আগেই কেন এই আইন নতুন করে সামনে এল? দুই বছর বয়স হলেই যেখানে মুসলমানদের কোরবানির জন্য পশু জবাই করা যায়, সেখানে ১৪ বছরের বিধিনিষেধ তারা মানতে বাধ্য কিনা! তবে তারচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো, এসব আইন-কানুনের মারপ্যাঁচে ফেলে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কি কার্যত গরু জবাইকে নিষিদ্ধ করছে? ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকে রাজ্যজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গান, সিনেমা, আর্ট থেকে ধর্মীয় সহাবস্থান–ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রগতিশীল রাজ্য হিসেবে পরিচিত। এই রাজ্যে গরুর মাংস বিক্রি থেকে খাওয়ার ওপর এতদিন কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। যে কোনো রেস্তোরাঁয় যেমন গরুর মাংস পাওয়া যেত, তেমনি বাজারেও ছিল সহজলভ্য। নিউমার্কেটের আশেপাশের দোকানগুলোতে, এমনকি রাস্তার পাশের ফুটপাতেও মাংসের কাবাব খুব জনপ্রিয় একটি খাবার। মাংস উৎপাদনের তুলনায় চাহিদা কম হওয়ায় দামও ছিল কম। এখন এই প্রজ্ঞাপনের কারণে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মূলত বিজেপি অধ্যুষিত অন্যান্য প্রদেশের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ ধরে নিয়েছে যে, এখন আর পশ্চিমবঙ্গে গরু জবাই থেকে বিক্রি—কিছুই করা যাবে না। গরু মাংস খাওয়ার মিথ্যে অজুহাত পিটিয়ে মুসলিম হত্যার ঘটনা তো সাংবাধিনিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতেই ঘটেছে। মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে এবার পশ্চিমবঙ্গেও পরিস্থিতি জটিল রূপ ধারণ করছে। এক সপ্তাহের মাথায় ঈদ উদযাপন হওয়ার কথা থাকলেও, অনেক জায়গায় এখনো গরুর হাট বসেনি। ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও দেখে বোঝা যায়, গরুর হাট বসিয়ে বা গরু জবাই করে কেউ ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। বরং বিজেপির কাছ থেকে কী নির্দেশনা আসে, তার জন্য অপেক্ষা করাটাকেই নিরাপদ মনে করছেন অনেকে। ফলে ধর্ম তো বটেই পশ্চিমবঙ্গের খামারিরা বিরাট অর্থনৈতিক ক্ষতির সামনে পড়েছে। মূলত বিপদে পড়েছেন হিন্দু খামারিরা পশ্চিমবঙ্গে ব্যবসার উদ্দেশ্যে গরু পালনকারী খামারিদের বড় অংশই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। মুসলমানরা গরু জবাই করে, গরুর মাংস খায় এবং গরুর হাট বসানো থেকে শুরু করে বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকেন বটে, কিন্তু অধিকাংশ গরুর খামারের মালিক হিন্দুরাই। হিন্দু পরিবারের লোকজন গরু লালন-পালন করেন, দীর্ঘদিন গরুর দুধ বিক্রি করেন এবং সেই অর্থে তাদের সংসার চলে। বয়স হলে বা দুধ দেওয়া বন্ধ করলে সেই গরু বিক্রি করাই তাদের অর্থনৈতিক চক্রের অংশ। গরুর বাজার নিয়ে এই ভ্যালু চেইন বুঝতে হলে ভারতের ডেয়ারি ও মাংস শিল্পের দিকে তাকাতে হবে। পশু থেকে দুধ উৎপাদনে ভারত এখন সারা পৃথিবীতে এককভাবে শীর্ষে। গত বছর ২৪৭ মিলিয়ন টন দুধ উৎপাদন করেছে ভারত, যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান ১২তম। শুধু পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ সরাসরি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত, যাদের পরিবারের অন্তত ১০ লাখ মানুষের জীবিকা এই পেশার ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদিত দুধের ৪৩ শতাংশ আসে মহিষ থেকে। শুধু দুধ নয়, মাংস উৎপাদনেও ভারত পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ দেশ। গত অর্থবছরে শুধু মাংস রপ্তানি করে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে ভারত। ভারতে মহিষের মাংস রপ্তানির অন্যতম বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান অ্যালানা গ্রুপ। গত বছরও তারা বিজেপির তহবিলে ৩০ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে। এই প্রশ্নটিই তুলেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র। তিনি লিখেছেন, “গরুর মাংস বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বা মাংস বিক্রি করা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৩০ কোটি টাকা অনুদান নেওয়া যদি অন্যায় না হয়, তাহলে গরিব মানুষের পেটে লাথি মেরে আপনারা কী প্রমাণ করতে চাইছেন?” সর্বনাশ খবর অনুযায়ী, মহুয়া মৈত্র ও আরও কয়েকজনের পক্ষ থেকে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেছেন, তাদের দাবি, এই কঠোর নিয়ম কোরবানির ধর্মীয় রীতিনীতিতে হস্তক্ষেপ করার পাশাপাশি গবাদিপশু পালন ও বিক্রির ওপর নির্ভরশীল আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষকে বড় ধাক্কা দেবে। অবশ্য বিজেপিও বসে নেই। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের অভিযোগে তৃণমূলের এই এমপির বিরুদ্ধে নদীয়া জেলার করিমপুর থানায় তারা অভিযোগ দায়ের করেছে। মহুয়ার উত্থাপিত দাবির মধ্যেই সত্যটা লুকিয়ে আছে। বিজেপি কি জানত না যে, পশ্চিমবঙ্গে গরুর কারবার বন্ধ হলে ক্ষতিটা মূলত ওখানকার হিন্দুদের? তাহলে এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে তারা কেন নিল? এ নিয়ে বিস্তারিত ভিডিও প্রতিবেদন করেছে আনন্দবাজার পত্রিকা। সেখানে সোনালী ঘোষ নামের এক খামারি বলছেন, জমি-জায়গা, সোনা বন্ধক রেখে ঋণ নিয়ে তারা গরুর ব্যবসা করেন। কোরবানির মৌসুমে গরু বিক্রি না হলে ঋণ শোধ করবেন কীভাবে? খাবেন কী? তিনি আরও দাবি করেছেন, গরুর খাদ্য কিনতেও এখন তাদের সমস্যা হচ্ছে। যেসব গরু তিনি বিক্রি করেছিলেন, সেই ক্রেতারাই এখন টাকা ফেরত চাইছেন। আরেক খামারি সরস্বতী ঘোষের কণ্ঠ আরও করুণ—“অন্তত এ বছরটা সরকার আমাদের ছেড়ে দিক। আগামী বছর থেকে আমরা না হয় আর খামার করব না। তা না হলে সরকার ঋণ মওকুফ করুক।” এসবের পেছনে কি মুসলমান ভোটার? ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এসবের পেছনে আছে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান এবং সদ্য শেষ হওয়া বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজ্যে হিন্দু-মুসলমান বিভাজন তীব্রভাবে সামনে এসেছে। বিজেপি অভিযোগ করে এসেছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস ভোটে জেতার জন্য বিগত বছরগুলোতে মুসলমানদের তোষণ করে এসেছে, দিয়েছে অন্যায্য সুবিধা। এই দাবিকে কাজ লাগিয়ে এবারের নির্বাচনে অনেক আসনে হিন্দু ভোটাররা সংঘবদ্ধ হয়ে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। এমনকি জেতার পরেও শুভেন্দু অধিকারী বারবার বলছেন যে, মুসলমানরা তাকে ভোট দেয়নি। যদিও ভোটের চিত্র পুরোপুরি সে কথা বলে না। রাজ্যের ৭৪টি মুসলিম-প্রধান আসনের মধ্যে ১৮টিতে এবার বিজেপি বড় জয় পেয়েছে। এসব আসনে ৪০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ভোটার মুসলিম। ২০২১ সালে মাত্র ২টি আসন পাওয়া বিজেপির এবার ১৮টি আসন পাওয়া—হিন্দু-মুসলিম সরল বিভাজনের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সবকিছু মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে এখন ‘মাংসের বিতর্ক’ তুঙ্গে। বহুদিনের পুরনো একটি আইনকে নতুন করে কঠোরভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ; আর এর মাঝখানে পড়ে খামারি, পাইকার, কসাই, হাট-ব্যবসায়ী ও ভোক্তার মত সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হওয়ার জোগাড়। ফলে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুশীলন নিয়ে যেমন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তেমনি হিন্দু খামারিদের জীবিকাও হুমকির মুখে পড়েছে। গরু শুধু ধর্মীয় প্রতীকের বিষয় নয়; এটি একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক চক্রের অংশ—দুধ, চামড়া, মাংস, পরিবহন, বাজার—সব মিলিয়ে বহু মানুষের জীবিকা এর সঙ্গে যুক্ত। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ধর্ম, রাজনীতি ও অর্থনীতি—এই তিনের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গ এখন এক সংবেদনশীল মুহূর্ত পার করছে। আইন, জীবিকা এবং সামাজিক সহাবস্থানের প্রশ্নে এই রাজ্য কোনদিকে যায়, সেদিকে দৃষ্টি সবার।