মির্জা ফখরুল, মঈন খান ও হাফিজ উদ্দিন আলোচনায়; শেষ মুহূর্তে চমক আসবে কি না, নজর সবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। তবে রোববার নির্বাচন কমিশন থেকে দুটি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছে দলটি। আর এতেই সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অধ্যাপক ড. আব্দুল মঈন খান ও মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের নাম আলোচনায় থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কোন দিকে যাচ্ছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে শেষ পর্যন্ত আলোচনায় থাকা কোনো একজনকে, নাকি একেবারে অপ্রত্যাশিত কাউকে বঙ্গভবনের জন্য বেছে নেয় বিএনপি—সেটিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের বড় প্রশ্ন। দলটির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, বিএনপির পক্ষে একটি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। অন্যটি সংগ্রহ করেন সরকারদলীয় চিফ হুইপ ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম মনি। তবে দুটি ফরম শেষ পর্যন্ত কার নামে জমা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। আর এখানেই তৈরি হয়েছে মূল রাজনৈতিক কৌতূহল। দুটি ফরম কি শুধুই নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ, নাকি এর আড়ালে রয়েছে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিকল্প রাখার কৌশল? আলোচনার কেন্দ্রে তিন নাম বিএনপির অভ্যন্তরীণ আলোচনা এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমীকরণে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সামনে এসেছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল মঈন খান এবং স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। গত জুলাইয়ের আলোচনায় মির্জা ফখরুল ও মঈন খানের পাশাপাশি খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও নজরুল ইসলাম খানের নামও এসেছে। মির্জা ফখরুল নিজেও একাধিকবার বলেছেন, রাষ্ট্রপতি পদে কে আসবেন, তা দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে। গত ২৫ জুলাই তিনি জানিয়েছিলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানা যাবে। অর্থাৎ প্রকাশ্য বক্তব্য অনুযায়ী, এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি। কেন আলোচনায় মির্জা ফখরুল? রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিতদের একটি। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘদিনের ভূমিকা, রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিতি এবং তুলনামূলক সংলাপমুখী ভাবমূর্তি—এসব কারণে তাকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিএনপির বাইরেও তাকে রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনার আলোচনা রয়েছে। তবে তাকে রাষ্ট্রপতি করা হলে বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ মির্জা ফখরুল একই সঙ্গে দলের মহাসচিব এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। তিনি বঙ্গভবনে গেলে দলের মহাসচিব পদে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রয়োজন হবে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সিদ্ধান্তটি শুধু বঙ্গভবনের জন্য একজন ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার বিষয় হবে না; এর সঙ্গে দলের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ কাঠামোর প্রশ্নও জড়িয়ে থাকবে। মঈন খান কেন আলোচনায়? অধ্যাপক ড. আব্দুল মঈন খানের নাম রাষ্ট্রপতি পদে নতুন করে আলোচনায় এলেও গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে তার নাম এর আগেও এসেছে। শিক্ষাগত ও পেশাগত অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজের সুযোগ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তিনি পরিকল্পনা, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিক পদে তার প্রোফাইলকে শক্তিশালী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্পিকার নির্বাচনের সময়ও মঈন খানের নাম আলোচনায় ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সিদ্ধান্তে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকার হন। সেই ঘটনাটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে বর্তমান আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ এর মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—আলোচনায় থাকা নামই যে শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মঈন খান রাষ্ট্রপতি হলে দীর্ঘ রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন নেতাকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসানোর সিদ্ধান্ত হিসেবে সেটিকে দেখা হবে। আর তাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে বেছে নেওয়া হলে সেটিও বিএনপির নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাবের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হবে। হাফিজ উদ্দিনকে ঘিরে ভিন্ন সমীকরণ মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের নামটি এই আলোচনায় কিছুটা আলাদা মাত্রা তৈরি করছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকার হিসেবে হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটির দায়িত্ব তিনি ইতোমধ্যেই পালন করছেন। এখন তাকে স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রপতি করা হলে সেটি হবে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি থেকে পূর্ণ রাষ্ট্রপতি হওয়ার এক ধরনের ধারাবাহিকতা। তবে একই সঙ্গে এটি হতে পারে বড় রাজনৈতিক চমক। কারণ স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং পরে স্থায়ী রাষ্ট্রপতি—এই ধারাবাহিকতা বিএনপির নেতৃত্ব বাছাই ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি বিশেষ বার্তাও বহন করতে পারে। দুটি ফরম কেন? রোববার দুটি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে বিএনপির সবচেয়ে দৃশ্যমান রাজনৈতিক পদক্ষেপ। তবে দুটি ফরম সংগ্রহ করা হয়েছে বলেই দুটি নির্দিষ্ট প্রার্থী চূড়ান্ত—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিকল্প খোলা রাখার কৌশলও এর পেছনে থাকতে পারে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। ১৬ আগস্ট শুরু হবে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট বিকেল ৫টা। আর ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। অর্থাৎ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বিএনপির হাতে এখনো কয়েক দিন সময় রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা, সম্ভাব্য প্রার্থীর সম্মতি এবং মনোনয়নপত্র জমার পর চূড়ান্ত প্রার্থিতা নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে তারেক রহমান? রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের সিদ্ধান্তই আনুষ্ঠানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাস্তব রাজনৈতিক সমীকরণে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে প্রত্যাশার বাইরে নাম আসার নজিরও রয়েছে। স্পিকার নির্বাচনের আগে মঈন খানের নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত হাফিজ উদ্দিন আহমদকে স্পিকার করা হয়। ফলে রাষ্ট্রপতি পদেও একই ধরনের কৌশল দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। মির্জা ফখরুল, মঈন খান কিংবা হাফিজ উদ্দিন—আলোচনায় থাকা এই তিন নামের বাইরে শেষ মুহূর্তে অন্য কাউকে সামনে আনা হবে কি না, সেটিও এখনো উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। বর্তমান সংসদে বিএনপির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে দলটি যাকে মনোনয়ন দেবে, তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। ফলে এবারের নির্বাচন কার্যত বিএনপির প্রার্থী বাছাইয়ের ওপরই নির্ভর করছে। এ কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিএনপির জন্য শুধু একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এর সঙ্গে সরকারের ভবিষ্যৎ ক্ষমতার ভারসাম্য, দলের নেতৃত্ব কাঠামো এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক দর্শনের প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে। মির্জা ফখরুলকে বঙ্গভবনে পাঠানো হলে বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্বে পরিবর্তন আসবে। মঈন খানকে বেছে নেওয়া হলে দলের একজন অভিজ্ঞ নীতিনির্ধারক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাবেন। আর হাফিজ উদ্দিন আহমদকে স্থায়ী রাষ্ট্রপতি করা হলে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার বর্তমান দায়িত্বের ধারাবাহিকতা তৈরি হবে। তবে এই তিন নামের বাইরে শেষ মুহূর্তে কোনো নতুন নাম সামনে এলে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চমক। আসল নামটি কোথায়? দুটি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে বিএনপির প্রস্তুতি এখন দৃশ্যমান। কিন্তু ফরম দুটির আড়ালে আসল নামটি এখনো অপ্রকাশিত। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর—অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে আলোচনার কেন্দ্রে। অধ্যাপক ড. আব্দুল মঈন খান—দীর্ঘ রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার কারণে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচিত। আর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদকে স্থায়ীভাবে বঙ্গভবনে রাখার সিদ্ধান্ত এলে সেটি হবে বড় ধরনের রাজনৈতিক চমক। তবে শেষ পর্যন্ত কে যাচ্ছেন বঙ্গভবনে, তার উত্তর মিলবে মনোনয়নপত্র জমা ও যাচাই-বাছাইয়ের পরই। দেশবাসীর চোখ এখন ১৩ আগস্টের দিকে। সেদিন মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে—রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে, নাকি বিএনপির মনোনীত একজন প্রার্থীই শেষ পর্যন্ত বঙ্গভবনের পরবর্তী বাসিন্দা হতে যাচ্ছেন।