প্রকাশ :: ... | ... | ...

বঙ্গভবনে কে যাচ্ছেন, আলোচনায় কারা


সংযুক্ত ছবি

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির সিদ্ধান্তই মূল নিয়ামক, ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন—সংবিধানের বিধান; সংস্কারের আগে নাকি পরে, তা নিয়েও জল্পনা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের রাজনীতিতে এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে বঙ্গভবন। বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে কে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে ক্ষমতাসীন বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা, স্পিকার, সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের নামও আলোচনায় এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো নামই আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা হবে। এরপর সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কেউ কেউ মনে করছেন, জাতীয় সংসদের পরবর্তী অধিবেশনের আগে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা কম। আবার দলের কোনো কোনো নেতা ইঙ্গিত দিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যসহ সম্ভাব্য সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে পারে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, এর সঙ্গে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়টিও জড়িয়ে পড়েছে। আপাতত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে স্পিকার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর সংবিধানের বিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহণ করেছেন। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তিনিই রাষ্ট্রপ্রধানের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবেন। এটি বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর আগে ২০০২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করার পর তৎকালীন স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এবারও একই ধরনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। তবে ৯০ দিন অপেক্ষা করতেই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এর আগেও যেকোনো সময় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সরাসরি জনগণের ভোটে নয়, জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। তবে কোনো রাজনৈতিক দল কাউকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করলেই তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাষ্ট্রপতি হয়ে যাবেন না। তাকে আইন অনুযায়ী প্রার্থী হতে হবে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হতে হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। সংবিধানের ১১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন এ দায়িত্ব পালন করে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনি কর্তা হিসেবে নির্বাচন পরিচালনা করেন। নির্বাচন কমিশন সংসদ সদস্যদের হালনাগাদ ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও প্রকাশ করবে। এরপর স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। তফসিলে মনোনয়নপত্র জমা, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং ভোট গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হবে। যদি একজন বৈধ প্রার্থী থাকেন, তাহলে ভোট ছাড়াই তাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। আর একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গোপন নয়; এটি প্রকাশ্য পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়। প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি করে ভোট থাকে। আলোচনায় যাদের নাম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের আলোচনায় কয়েকজনের নাম এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন— স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, যিনি বর্তমানে রাষ্ট্রপতির কার্যভার পালন করছেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, যিনি একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান ও আব্দুল মঈন খান এবং বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরীর নামও আলোচনায় এসেছে। এর বাইরে অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নামও সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনায় রয়েছে বলে দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। তবে এসব নামের কোনোটিই বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। দলের একাধিক নেতা স্পষ্ট করে বলেছেন, গণমাধ্যমে যেসব নাম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তার অনেকটাই অনুমাননির্ভর। বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে আনুষ্ঠানিক আলোচনা এবং দলীয় সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিশ্চিতভাবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। আলোচনায় বেশি হাফিজ উদ্দিন ও মির্জা ফখরুল সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম তুলনামূলকভাবে বেশি আলোচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের একজন নেতা। তবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়ে কোনো নাম জানেন না বলে জানিয়েছেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার ইতোমধ্যে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন। এরপর দলের সিদ্ধান্ত হবে এবং নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ বিষয়টি এখনো দলীয় সিদ্ধান্তের পর্যায়ে পৌঁছেনি। সরকার কাউকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচনা করছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবেও তিনি কোনো নির্দিষ্ট নামের কথা জানাননি। একইভাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুও সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতির বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য জানেন না বলে জানিয়েছেন। সেপ্টেম্বরে নির্বাচন, নাকি সাংবিধানিক সংস্কারের পর? নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কবে হবে—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির একজন নেতা মনে করছেন, জাতীয় সংসদের পরবর্তী অধিবেশনের আগে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা কম। জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন ১৫ জুলাই শেষ হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদের একটি অধিবেশন শেষ হওয়ার পর পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের মধ্যে ৬০ দিনের বেশি বিরতি থাকতে পারে না। ফলে আগামী সেপ্টেম্বরে সংসদের পরবর্তী অধিবেশন বসার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে বিএনপির ওই নেতা জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরে সংসদে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী নিয়ে আলোচনা হতে পারে। ইতোমধ্যে সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নে যে কমিটি গঠনের প্রস্তাব এসেছে, সেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্ভাব্য সংশোধনী সামনে আসতে পারে। সম্ভাব্য সংশোধনীতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনার প্রস্তাব থাকতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিএনপির পক্ষ থেকেও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদগুলোর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রস্তাব রয়েছে বলে দাবি করেছেন ওই নেতা। এ কারণে তার ধারণা, সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার আগে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নাও হতে পারে। তবে এটি বিএনপির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেপ্টেম্বরেই হবে, নাকি তার আগেই হবে, অথবা সাংবিধানিক সংস্কারের পর হবে—এ মুহূর্তে কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নাম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের গুঞ্জন শুরু হওয়ার পর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির নামও আলোচনায় আসে। প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে সম্ভাব্য নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা তখন জানান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই। এ ছাড়া সরকারের সঙ্গে যুক্ত এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকা একজন নেতা জানিয়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের নামও রাষ্ট্রপতি পদের জন্য আলোচনায় রয়েছে। তবে ওই শিক্ষকের নাম প্রকাশ করা হয়নি। একজন মন্ত্রীও বলেছেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে কে আসছেন, সে বিষয়ে তার কোনো ধারণা নেই। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি পদে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, নাকি নিরপেক্ষ কেউ? নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—রাষ্ট্রপতি পদে কি এবারও সরাসরি রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট কাউকে বেছে নেওয়া হবে, নাকি তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হবে? বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। তবে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় নির্বাহী ক্ষমতা মূলত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে থাকে। রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ দায়িত্ব সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে সরকার পরিবর্তনের সময়, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ, সংসদ ভেঙে দেওয়া, অধ্যাদেশ জারি এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির পদটি গুরুত্বপূর্ণ। তাই নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে কে দায়িত্ব নিচ্ছেন, সেটি শুধু একটি পদ পূরণের বিষয় নয়; বরং রাজনৈতিক ভারসাম্য, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামোর জন্যও তা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগে নতুন সমীকরণ ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও তিনি রাষ্ট্রপতির পদে বহাল ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তার পদত্যাগের দাবি উঠলেও সাংবিধানিক সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখিয়ে বিএনপি তখন তাকে অপসারণের বিরোধিতা করেছিল। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়জুড়েই তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন। এরপর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ নতুন সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা তার কাছেই শপথ নেন। তবে শেষ পর্যন্ত শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান মো. সাহাবুদ্দিন। তার পদত্যাগের পর এখন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ২০০২ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের পর স্পিকারের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। ২০০২ সালের ২১ জুন বিএনপি সরকারের সময় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করেন। বিএনপির সংসদীয় দলের অনাস্থার মুখে তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। এরপর তৎকালীন স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তিনি ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির কার্যভার পালন করেন। পরে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এবারও রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহণ করেছেন। তবে এবার পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভিন্ন। কারণ বর্তমান সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে দলটি যাকে রাষ্ট্রপতি পদে সমর্থন করবে, সংসদে তার নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত কোথায়? সবকিছু মিলিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাকে বেছে নেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সাংবিধানিক সংস্কারের আগে হবে, নাকি পরে। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রপতি পদে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত কোনো ব্যক্তিকে বেছে নেওয়া হবে, নাকি তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান, আব্দুল মঈন খান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে এসব নামের কোনোটিই চূড়ান্ত নয়। সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতেই হবে। তবে তার আগেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। ফলে এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— বঙ্গভবনের পরবর্তী বাসিন্দা কে হচ্ছেন? এর উত্তর নির্ভর করছে বিএনপির দলীয় সিদ্ধান্ত, সম্ভাব্য সাংবিধানিক সংস্কার এবং নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিলের ওপর। আর এই সিদ্ধান্তই আগামী দিনের বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো ও রাজনৈতিক ভারসাম্যে নতুন কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় কি না, সেটিও এখন গভীর আগ্রহের বিষয়।