প্রকাশ :: ... | ... | ...

লোকসভায় প্রতিবেদন : ভারতে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মসূচির সুযোগ দেওয়া হয়নি


সংযুক্ত ছবি

ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশটির ভূখণ্ড ব্যবহার করে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে ভারত সরকার। একই সঙ্গে তাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পাঠানো অনুরোধটি দেশটির প্রচলিত আইন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও প্রতিষ্ঠিত আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পর্যালোচনা করছে বলেও জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় উপস্থাপিত পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত সরকারি প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। মানবিক কারণে আশ্রয়, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নয় লোকসভায় উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকে দেশটির দীর্ঘদিনের মানবিক নীতি ও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। গুরুতর সংকট, রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা জীবনঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়ার যে মানবিক অবস্থান ভারত অতীতে বিভিন্ন সময় নিয়েছে, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও সেই নীতিই অনুসরণ করা হয়েছে। তবে ভারত সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটিতে থেকে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনা, রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া কিংবা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি কাউকেই দেওয়া হয় না এবং শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। প্রত্যর্পণ আবেদন আইনি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠানো হয়েছে, সেটিও প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে। ভারত সরকার জানিয়েছে, আবেদনটি বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন, বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি, আদালতের বিষয় এবং আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংসদীয় কমিটির পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছে ভারতের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, যার চেয়ারম্যান কংগ্রেস নেতা শশী থারুর। 'ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ' শীর্ষক কমিটির নবম প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে সর্বশেষ প্রতিবেদনে। কমিটি জানিয়েছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতের দেওয়া রায়ের পর প্রত্যর্পণ আবেদনটি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টির অগ্রগতি সম্পর্কে সরকারকে নিয়মিত সংসদীয় কমিটিকে অবহিত রাখার সুপারিশও করা হয়েছে। মানবিক নীতি অব্যাহত রাখার সুপারিশ সংসদীয় কমিটি কেন্দ্রীয় সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে, ভবিষ্যতেও যেন মানবিক ও নীতিগত অবস্থান বজায় রাখা হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন, কূটনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে এ ধরনের সংবেদনশীল পরিস্থিতি মোকাবিলারও সুপারিশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রেক্ষাপট ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। সীমান্ত, বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ ইস্যু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়। এরপর ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার পরিবর্তনের পরও শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার প্রশ্নটি দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম আলোচিত ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে। আইনি ও কূটনৈতিক গুরুত্ব কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সংসদীয় নথিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে প্রথমবারের মতো এত স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যর্পণ আবেদনকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করে আইনি প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করায় বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং আইন ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির আওতায় বিবেচিত হচ্ছে—এমন ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রত্যর্পণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে দুই দেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামো, আদালতের অবস্থান, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা এবং সামগ্রিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতায় শেখ হাসিনার অবস্থান, তার প্রত্যর্পণ এবং এ বিষয়ে ভারতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত—দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া