প্রকাশ :: ... | ... | ...

শিক্ষাঙ্গন হঠাৎ অশান্ত, নেপথ্যে কী?


সংযুক্ত ছবি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর ক্যাম্পাসে নতুন করে আধিপত্যের লড়াই; সংঘর্ষে জড়াচ্ছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির, উদ্বেগ শিক্ষাবিদদের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদযাপনের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে একের পর এক সংঘর্ষের ঘটনায় শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি তোলারাম কলেজ, ঢাকা কলেজ, আলিয়া মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে বহু শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। পর্যবেক্ষক, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা বলছেন, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক প্রভাব, সংগঠনগত আধিপত্য এবং ছাত্রসংসদভিত্তিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রতিযোগিতার বহিঃপ্রকাশ। গত কয়েক দিনে সংঘর্ষের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোথাও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ, কোথাও সেমিনারে প্রবেশ, কোথাও বক্তব্য দেওয়া, কোথাও আলোকচিত্র প্রদর্শনী, আবার কোথাও হলের আসন বা বহিরাগতদের অংশগ্রহণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। তবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত বিষয়টি ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মুখোমুখি সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদুল্লাহ হলে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই সংগঠনের মধ্যে হাতাহাতির পর বিক্ষোভ হয়। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শন নিয়ে সংঘর্ষ বাধে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনের সেমিনারে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে হাসপাতাল পর্যন্ত। একই ধারাবাহিকতায় ঢাকা কলেজ, আলিয়া মাদ্রাসা, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি তোলারাম কলেজেও উত্তেজনা এবং সহিংসতার ঘটনা ঘটে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ শিক্ষাঙ্গনে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ছাত্রসংসদ নির্বাচনে সংগঠনটির উল্লেখযোগ্য সাফল্য সেই অবস্থান আরও দৃঢ় করে। অন্যদিকে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর ছাত্রদলও বিভিন্ন ক্যাম্পাসে নিজেদের সাংগঠনিক উপস্থিতি ও প্রভাব বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। এই বাস্তবতায় দুই সংগঠনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীম উদ্দিন খান মনে করেন, এই সংঘাতের পেছনে কেবল ছাত্ররাজনীতি নয়, জাতীয় রাজনীতিরও প্রভাব রয়েছে। তার ভাষায়, “চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মালিকানা নিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একধরনের সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে। তার প্রভাব ছাত্র রাজনীতিতে পড়েছে।” তিনি আরও বলেন, ছাত্রলীগের দীর্ঘদিনের আধিপত্যের অবসানের পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটি ঘিরেই নতুন শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদের পর্যবেক্ষণও একই ধরনের। তিনি বলেন, বিভিন্ন ছাত্রসংসদের মেয়াদ শেষের পথে এবং সামনে নতুন নেতৃত্ব গঠনের প্রক্রিয়া রয়েছে। এই বাস্তবতায় উভয় সংগঠন নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। তার মতে, একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থেকে সংঘাত বাড়ছে এবং এটি শিক্ষাঙ্গনের জন্য অশনিসংকেত। ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল পরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, ছাত্রসংসদ নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের সমর্থন পাওয়ায় ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে হামলা করে তাদের প্রভাব কমানোর চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসিরের অভিযোগ, ছাত্রশিবিরই সংঘাতের সূচনা করছে এবং ক্যাম্পাসে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে হামলার পথ বেছে নিচ্ছে। তার দাবি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিকল্পিতভাবে ছাত্রদলের কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এদিকে বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতারা মনে করছেন, এই সংঘর্ষে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ইউনিয়ন ও বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর নেতারা অভিযোগ করেছেন, শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়ার পরিবর্তে ক্যাম্পাসে এখন ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার রাজনীতি চলছে। প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকার অভাবও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে তাদের অভিযোগ। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কোথাও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, কোথাও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের কাজ চলছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় কোনো ঘটনায় উল্লেখযোগ্য আইনি অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি। শিক্ষাবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি দেশের উচ্চশিক্ষা ও ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যতের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। যদি ক্যাম্পাসে মতপার্থক্য বারবার সহিংসতায় রূপ নেয়, তাহলে শিক্ষা, গবেষণা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, ছাত্রলীগ-পরবর্তী সময়ে শিক্ষাঙ্গনে যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেখানে আধিপত্যের প্রতিযোগিতা নতুন রূপ নিয়েছে। সংগঠন বদলেছে, কিন্তু সংঘাতের সংস্কৃতি পুরোপুরি বদলায়নি—এমন ধারণা সমাজের বিভিন্ন স্তরে তৈরি হচ্ছে। মতবিরোধ গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ হলেও তা যদি নিয়মিত সংঘর্ষ, হামলা ও পাল্টা হামলায় পরিণত হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষাব্যবস্থার। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ এবং আইনের সমান প্রয়োগ ছাড়া এই অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে আরও বাড়তে পারে। শিক্ষাঙ্গনকে রাজনৈতিক সহিংসতার ক্ষেত্র নয়, বরং মুক্তবুদ্ধি, বিতর্ক ও জ্ঞানচর্চার নিরাপদ পরিবেশ হিসেবে গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।