১৩ দফা থেকে ৯ দফা—সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিধিনিষেধের দাবি কমেছে, গুরুত্ব বেড়েছে বিচার, কওমি শিক্ষা ও রাষ্ট্রে আলেমদের অংশীদারত্বে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের দাবিনামায় চারটি দফা কমেছে। তবে পরিবর্তনটি শুধু সংখ্যার হিসাবে সীমাবদ্ধ নয়। ২০১৩ সালে সংগঠনটির আলোচিত ১৩ দফায় নারী-পুরুষের সামাজিক আচরণ, নারীনীতি, শিক্ষানীতি, ভাস্কর্য, গণমাধ্যমে ধর্মীয় সংস্কৃতির উপস্থাপন এবং শাহবাগ আন্দোলন ঘিরে যেসব দাবি ছিল, গত আগস্টে বিএনপি সরকারের কাছে দেওয়া নতুন ৯ দফায় সেগুলোর বড় অংশ নেই। অন্যদিকে ধর্মীয় অবমাননার শাস্তি, কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা ও ইসলাম ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক করার মতো পুরোনো দাবির পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে অতীতের রাজনৈতিক সহিংসতার বিচার, কওমি মাদ্রাসার ডিগ্রির কার্যকর স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে আলেমদের অংশগ্রহণের বিষয়। দাবিনামার এই পরিবর্তন হেফাজতের অগ্রাধিকারে একটি দৃশ্যমান রদবদল নির্দেশ করে। বিশেষ করে নারী ও সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দাবিগুলো বাদ পড়ায় সংগঠনটির অবস্থান আগের তুলনায় নমনীয় হয়েছে কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে। তবে দাবির তালিকায় কোনো বিষয় না থাকা মানেই সেই বিষয়ে সংগঠনটির আদর্শিক অবস্থান বদলে যাওয়া নয়। হেফাজত নেতারা নিজেরাও বলছেন, ইসলামের মূলনীতি থেকে সরে না গিয়ে সময়োপযোগী করার জন্য দাবিগুলো পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। গত ৯ আগস্ট চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরী মাদ্রাসায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় হেফাজতের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী তাঁর হাতে লিখিত ৯ দফা তুলে দেন। এর আগে মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ সাজেদুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি দাবিগুলো প্রণয়ন করে; পরে আমিরের অনুমোদনে তা চূড়ান্ত হয়। হেফাজতের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরোনো কিছু দাবি বাদ দেওয়া এবং নতুন কিছু বিষয় যুক্ত করার মধ্য দিয়ে তালিকাটি সময়োপযোগী করা হয়েছে। নারী ও সামাজিক আচরণ নিয়ে আগের দাবিগুলো নেই ২০১৩ সালের ১৩ দফার চতুর্থ দাবিতে ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার নামে ‘বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার’, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, মোমবাতি প্রজ্বালন এবং ‘বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ’ বন্ধের কথা বলা হয়েছিল। নতুন ৯ দফায় এসব বিষয়ের কোনোটি নেই। পুরোনো পঞ্চম দফায় ‘ইসলামবিরোধী নারীনীতি’ ও ‘ধর্মহীন শিক্ষানীতি’ বাতিলের দাবির পাশাপাশি প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ইসলাম ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক করার কথা ছিল। নতুন তালিকায় নারীনীতি ও শিক্ষানীতি বাতিলের দাবি বাদ গেছে। রাখা হয়েছে শুধু মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ইসলাম ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি। নারীর অধিকার ও সামাজিক আচরণ নিয়ে হেফাজতের আগের অবস্থানের প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৩ সালে সংগঠনটি নারীর সামাজিক চলাচল ও নারী-পুরুষের মেলামেশা নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলেছিল। নতুন তালিকায় সেসব বিধিনিষেধের উল্লেখ নেই। তবে এ থেকে নারীর অধিকার, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ কিংবা নারীনীতি সম্পর্কে হেফাজতের পূর্ণাঙ্গ অবস্থান বদলে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য দাবিনামায় নেই। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক বলেন, হেফাজত বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, এতে সংগঠনটির চিন্তার জায়গায়ও কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ১৩ দফাকে ৯ দফায় রূপান্তর করতে গিয়ে কিছু বিষয় বাদ দেওয়া হয়েছে, কিছু নতুন করে যুক্ত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ‘নারীর বিষয়ে ইসলাম সব সময় উদার। আমরা ইসলামের মূলনীতি ঠিক রেখে নারীর শালীনতায় বিশ্বাসী।’ ফলে এই পরিবর্তনকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই বলে তিনি মনে করেন। তবে সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরীর মতে, সরকারের সঙ্গে সংঘাত এড়ানোর কৌশল হিসেবেও হেফাজত কিছু দাবি বাদ দিয়ে থাকতে পারে। এটি তাঁর পর্যবেক্ষণ; দাবিনামা পরিবর্তনের পেছনে এমন রাজনৈতিক সমঝোতাই প্রধান কারণ, তা নিশ্চিত করার মতো স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই। সংবিধান ও ধর্মীয় অবমাননার দাবিতেও ভাষার পরিবর্তন ২০১৩ সালের প্রথম দফায় সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিলের দাবি ছিল। নতুন তালিকায় সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তনের দাবিটি নেই। পরিবর্তে বলা হয়েছে, কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন পাস করা যাবে না। হেফাজত নেতাদের বক্তব্য, বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সংবিধানে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাই দাবিটি নতুন তালিকায় রাখার প্রয়োজন হয়নি। তবে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং তা বাস্তবায়নে কার্যকর আইনগত বা সাংবিধানিক পদক্ষেপ এক বিষয় নয়। প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে দাবিটি বাদ দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের অগ্রগতি আলাদা করে বিবেচনা করতে হবে। ধর্মীয় অবমাননার বিরুদ্ধে আইনের দাবিতেও ভাষাগত পরিবর্তন এসেছে। ২০১৩ সালের দ্বিতীয় দফায় আল্লাহ, রাসুল (সা.), কোরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননার জন্য ‘সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান’ রেখে আইন করার কথা বলা হয়েছিল। নতুন তালিকায় মৃত্যুদণ্ড শব্দটি বাদ দিয়ে ‘সর্বোচ্চ শাস্তি’ নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে। পুরোনো তালিকায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা রোধের বিষয়টিও ছিল; নতুন দাবিতে মূলত ধর্মীয় অবমাননার প্রসঙ্গ রাখা হয়েছে। শাহবাগ আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদের ‘স্বঘোষিত নাস্তিক-মুরতাদ’ আখ্যা দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও নতুন তালিকায় নেই। একইভাবে ঢাকাকে ‘মূর্তির নগর’ বানানোর অভিযোগ তুলে রাস্তার মোড়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা; মসজিদ, ওয়াজ ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা; এবং রেডিও-টেলিভিশনসহ গণমাধ্যমে দাড়ি-টুপি ও ইসলামি সংস্কৃতি নিয়ে ব্যঙ্গ বন্ধের দাবিগুলো বাদ পড়েছে। ২০১৩ সালের দাবিনামায় ধর্মীয় বিধানের পাশাপাশি সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চা, গণমাধ্যমের উপস্থাপন এবং প্রকাশ্য স্থানে শিল্পকর্ম স্থাপনের মতো বিষয়েও নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবি ছিল। নতুন তালিকায় সেই বিস্তৃত সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিসর আর দেখা যায় না। বিচার ও রাজনৈতিক ঘটনাবলি সামনে এসেছে নতুন ৯ দফায় বিচারসংক্রান্ত দাবি উল্লেখযোগ্য জায়গা পেয়েছে। এতে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার, ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরবিরোধী আন্দোলন দমনে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িত ও নির্দেশদাতাদের বিচারের দাবি করা হয়েছে। শাপলা চত্বরের ঘটনাকে হেফাজত ‘গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এটি সংগঠনটির ব্যবহৃত ভাষা; ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র, হতাহতের সংখ্যা ও দায় নির্ধারণের প্রশ্নে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণভিত্তিক বিচার গুরুত্বপূর্ণ। শিরীন পারভীন হক বলেছেন, শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হওয়াকে তিনি স্বাগত জানান। তাঁর মতে, নাগরিকদের প্রকৃত সত্য জানার অধিকার রয়েছে। আগের দাবিনামায় হেফাজতের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার, হয়রানি বন্ধ এবং সংগঠনটির কর্মসূচি ঘিরে সংঘটিত ঘটনার বিচার গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নতুন তালিকায় বিচারসংক্রান্ত দাবি বিস্তৃত হয়ে তিনটি আলাদা সময়পর্বের রাজনৈতিক সহিংসতাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ফলে সংগঠনটির নিজস্ব নেতা-কর্মীদের মামলা ও হয়রানির প্রশ্নের পাশাপাশি অতীতের রাজনৈতিক সংঘাতের বিচারও দাবিনামার কেন্দ্রীয় অংশ হয়েছে। এ পরিবর্তনকে শুধু ধর্মীয় দাবি থেকে রাজনৈতিক দাবিতে সরে আসা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। বরং ধর্মীয় পরিচয় ও সংগঠনটির ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত ঘটনাগুলোর বিচারকে নতুন দাবিনামায় আরও সুস্পষ্টভাবে সামনে আনা হয়েছে। কওমি শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানের দাবি কওমি মাদ্রাসার বিষয়ে পুরোনো দাবিতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মামলা, হুমকি ও হয়রানি বন্ধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। নতুন তালিকায় এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিগ্রির স্বীকৃতি বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর দাবি। ২০১৮ সালে দাওরায়ে হাদিসের সনদকে ইসলামি শিক্ষা ও আরবি সাহিত্যে মাস্টার্সের সমমান দেওয়ার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হেফাজতের নতুন দাবিতে শুধু স্বীকৃতি থাকার বিষয়টি নয়, সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে এই ডিগ্রিকে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। এই পরিবর্তন দাবিনামাকে প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক সুযোগের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছে। কওমি শিক্ষার্থীদের জন্য স্বীকৃতির বাস্তব প্রয়োগ, চাকরিতে যোগ্যতার গ্রহণযোগ্যতা এবং উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকার—এসব বিষয় এখন সংগঠনটির দাবিতে আরও স্পষ্ট। নতুন তালিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে আলেম-ওলামাকে অংশীদার করার দাবি। আগের তালিকায় আলেমদের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানি বন্ধের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। এবার মামলা প্রত্যাহারের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে তাঁদের অংশগ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এতে আলেম সমাজের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার দাবির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখার আকাঙ্ক্ষাও যুক্ত হয়েছে। নতুন করে হিযবুত তওহিদ ও তাবলিগ জামাত কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করার দাবি ২০১৩ ও ২০২৬—দুই তালিকাতেই রয়েছে। তবে নতুন দাবিনামায় হিযবুত তওহিদকে নিষিদ্ধ করার দাবি যুক্ত হয়েছে। হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদীর বক্তব্য, সংগঠনটি ইসলামকে বিকৃত করছে এবং ‘ফিতনামূলক’ কর্মকাণ্ডে জড়িত। এগুলো হেফাজতের অভিযোগ; নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন, প্রমাণ এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া বিবেচ্য। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশি-বিদেশি মিশনারিদের ‘ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা’ বন্ধের দাবিও বহাল রয়েছে। তবে ২০১৩ সালের তালিকায় পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে এনজিও ও খ্রিষ্টান মিশনারিদের কার্যক্রম এবং ধর্মান্তরকরণের বিষয়টি বিস্তৃতভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। নতুন তালিকায় দাবিটি মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। তাবলিগ জামাত ইস্যুও নতুন তালিকায় স্পষ্টভাবে এসেছে। হেফাজত চায়, তাবলিগের কার্যক্রম ও টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হোক। পাশাপাশি ভারতের মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বাংলাদেশে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা এবং তাঁর অনুসারীদের টঙ্গী ময়দানে ইজতেমার অনুমতি না দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। এতে হেফাজতের ধর্মীয় ও সাংগঠনিক অগ্রাধিকারের একটি অভ্যন্তরীণ বিরোধও দাবিনামায় জায়গা পেয়েছে। আদর্শের পরিবর্তন, নাকি দাবির পুনর্বিন্যাস হেফাজতের দাবিনামায় পরিবর্তনকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ১২ দফা দাবি দিয়েছিল সংগঠনটি। সেই তালিকার পর বিএনপি সরকারের কাছে দেওয়া নতুন ৯ দফায় আবারও পরিবর্তন এসেছে। অর্থাৎ ২০১৩ সালের ১৩ দফা থেকে সরাসরি ৯ দফায় নামেনি সংগঠনটি; মাঝখানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী দাবির আরেকটি পর্যায় ছিল। সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করেন, বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক ও সরকারের সঙ্গে সংঘাত এড়ানোর হিসাব দাবিগুলো পুনর্বিন্যাসে ভূমিকা রাখতে পারে। হেফাজত নেতারা অবশ্য পরিবর্তনকে সময়োপযোগী করার প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। কোন কারণ কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিশ্চিত করতে আরও প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য প্রয়োজন। সব মিলিয়ে নতুন ৯ দফায় নারী-পুরুষের সামাজিক আচরণ, নারীনীতি, ভাস্কর্য ও গণমাধ্যমের সাংস্কৃতিক উপস্থাপন নিয়ে ২০১৩ সালের দাবিগুলোর বড় অংশ অনুপস্থিত। অন্যদিকে ধর্মীয় অবমাননার শাস্তি, কাদিয়ানিদের বিষয়ে অবস্থান, বাধ্যতামূলক ইসলাম ধর্মশিক্ষা এবং মিশনারি কার্যক্রম নিয়ে আপত্তির মতো মূল ধর্মীয় দাবিগুলো বহাল রয়েছে। বিচার, কওমি শিক্ষার বাস্তব স্বীকৃতি, আলেমদের রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহণ এবং তাবলিগ জামাতের ব্যবস্থাপনা নতুন তালিকায় অধিক স্পষ্টতা পেয়েছে। তাই এই পরিবর্তনকে আপাতত হেফাজতের দাবির ভাষা, পরিধি ও অগ্রাধিকারের পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখা যায়। নারীদের বিষয়ে সংগঠনটির অবস্থান বাস্তবে কতটা বদলেছে, তা নির্ধারণ করতে শুধু দাবিনামা নয়, নারীর অধিকার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অংশগ্রহণ নিয়ে ভবিষ্যৎ বক্তব্য এবং কর্মকাণ্ডও বিবেচনায় নিতে হবে।