ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া নিয়ে আসন সমঝোতায় বিরোধ, ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচন ঘিরেও অসন্তোষ; লংমার্চে অংশ নিলেও বক্তব্য দেননি এনসিপির নেতারা ১১ দলীয় ঐক্যের সাত দফা দাবিতে ঢাকা থেকে খুলনা-কুষ্টিয়া অভিমুখী লংমার্চে অংশ নেননি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। কর্মসূচিতে দলটির তিন কেন্দ্রীয় নেতা অংশ নিলেও তাঁদের কেউ উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তব্য দেননি। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া নিয়ে আসন সমঝোতার বিরোধ এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন ঘিরে অসন্তোষের কারণে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির দূরত্ব বেড়েছে বলে জানিয়েছেন দুই দলের কয়েকজন নেতা। তাঁদের কারও কারও মতে, এই টানাপোড়েনের প্রভাব পড়েছে লংমার্চে এনসিপির অংশগ্রহণেও। তবে নাহিদ ইসলামের অনুপস্থিতির কারণ নিয়ে এনসিপির নেতাদের মধ্যে ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। দলের এক শীর্ষ নেতার দাবি, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তিনি লংমার্চে যাননি। অন্য এক নেতার মতে, জামায়াতের সঙ্গে সাম্প্রতিক মতবিরোধ ও অসন্তোষও তাঁর অনুপস্থিতির পেছনে ভূমিকা রেখেছে। এনসিপির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ নেতা জানান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী করার বিষয়ে দলীয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে। তাঁদের পক্ষে বিভিন্ন সভা-সমাবেশেও বক্তব্য দিচ্ছেন নাহিদ ইসলাম। এ কারণে এ মুহূর্তে সিটি নির্বাচন নিয়ে তাঁর ব্যস্ততা বেশি। তবে আরেক শীর্ষ নেতার ভাষ্য, বিষয়টি শুধু ব্যস্ততার নয়। সিটি নির্বাচনে আসন সমঝোতা নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে কয়েক দিন ধরেই মতবিরোধ চলছে। এর সঙ্গে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে জামায়াতের জোরালো অবস্থান না নেওয়ার বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। এসব কারণে দুই দলের মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে তাঁর দাবি। লংমার্চে খালি ছিল নাহিদের চেয়ার শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ৭টা থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের কর্মসূচি শুরু হয়। সকাল ৮টা ২০ মিনিটে ঢাকার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেট থেকে গাড়িবহর খুলনা-কুষ্টিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করে। উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। মঞ্চে তাঁর পরেই ছিলেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। এরপর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকসহ অন্য নেতারা অবস্থান নেন। জামায়াত আমিরের পাশে নাহিদ ইসলামের জন্য একটি চেয়ার রাখা হলেও তিনি সমাবেশে উপস্থিত হননি। তাঁর পরিবর্তে কর্মসূচিতে অংশ নেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ এবং সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব সারজিস আলম। তবে উদ্বোধনী সমাবেশে তাঁদের কেউ বক্তব্য দেননি। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, ঢাকার বাইরে বিভিন্ন পথসভায় তাঁদের বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল। এনসিপির নেতাকর্মীদের মধ্যে কর্মসূচি ঘিরে তুলনামূলক কম স্বতঃস্ফূর্ততা দেখা গেছে বলেও দলীয় সূত্রের দাবি। অবশ্য লংমার্চে নাহিদের অনুপস্থিতি নিয়ে এনসিপি বা জামায়াতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ঢাকার দুই সিটি নিয়ে বিরোধ ১১ দলীয় ঐক্যের জামায়াত ও এনসিপির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দুই দলের সম্পর্কে টানাপোড়েনের শুরু গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনায় এনসিপি কমপক্ষে তিনটি সিটি করপোরেশনে ছাড় চেয়েছিল। এর মধ্যে ঢাকার দুই সিটির অন্তত একটিতে প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে অনড় ছিল দলটি। তবে জামায়াত ঢাকার কোনো সিটিতেই শরিকদের ছাড় দিতে রাজি হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট নেতারা জানিয়েছেন। এর পরিবর্তে কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে এনসিপিকে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি এনসিপি। একপর্যায়ে দলটির নেতারা বৈঠক থেকে বেরিয়ে যান বলে সূত্রগুলোর দাবি। এরপর থেকেই দুই দলের মধ্যে সম্পর্কের শিথিলতা বাড়তে থাকে। সংশ্লিষ্ট নেতাদের ভাষ্য, গত এক মাসে জোটের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেননি নাহিদ ইসলাম। ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচন ঘিরেও অসন্তোষ দুই দলের দূরত্ব বাড়ার আরেকটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন। গত ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী পরাজিত হওয়ার পর অনিয়মের অভিযোগে দলটির জোরালো প্রতিবাদ না করাকে ভালোভাবে নেয়নি এনসিপি বলে দলীয় সূত্রের দাবি। এ ছাড়া বিএনপির বিজয়ী প্রার্থীর কাছ থেকে পরাজিত জামায়াত প্রার্থীর হাসিমুখে মিষ্টি খাওয়ার ঘটনাও এনসিপির কিছু নেতার মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে বলে জানা গেছে। এ নিয়ে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ঢাকার শাহবাগে এনসিপির গণবিক্ষোভ কর্মসূচিতে প্রতিবাদ জানান দলটির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। বিষয়টি নিয়ে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এনসিপির একাধিক নেতার মতে, সিটি নির্বাচনে আসন সমঝোতা এবং ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাচন—দুই বিষয় মিলিয়েই জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। তবে দল দুটির মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর সুযোগ এখনো রয়েছে বলেও মনে করেন তাঁরা। সব মিলিয়ে, ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচিতে এনসিপির অংশগ্রহণ অব্যাহত থাকলেও নেতৃত্বের উপস্থিতি, বক্তব্য এবং মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নাহিদ ইসলামের অনুপস্থিতি কেবল নির্বাচনী ব্যস্ততার কারণে, নাকি জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্বেরও প্রতিফলন—তা নিয়ে দুই দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না আসায় বিষয়টি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।