১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত নাটকীয় ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দিন। এদিন সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় পরিবর্তন আসে। সে সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী–র লেখা বই এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক (১৯৭১-১৯৮১)–এ আমরা ঘটনাবহুল ৭ নভেম্বরের বর্ণনা পাই। সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য অংশ পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এদিন মধ্যরাতের পর সেনানিবাসে শুরু হওয়া গোলাগুলি, বন্দিদশা থেকে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের মুক্তি, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার তৎপরতা এবং সেনাবাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। একই দিনে হত্যা করা হয় ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দারকে। সেই সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরী তাঁর বই ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক (১৯৭১-১৯৮১)’-এ ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তাঁর বর্ণনায় দেখা যায়, ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনীর ভেতরে যে অস্থিরতা ও নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয়েছিল, ৭ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানে তা আরও গভীর হয়। একপর্যায়ে সৈনিকদের একটি অংশের দাবিদাওয়া ও বিদ্রোহী তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করা সেনাবাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ৭ নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে আনার পর। দৈনিক বাংলা, ৮ নভেম্বর ১৯৭৫ মইনুল হোসেন চৌধুরীর বর্ণনা অনুযায়ী, ৭ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে তিনি দ্রুত সেনা সদর দপ্তরে ফিরে যান। সেখানে অধীনস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর ভাষ্য, ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে কার্যত কোনো সরকার ছিল না বললেই চলে। সেনাবাহিনীতেও নিয়মিত কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেনা সদর দপ্তরে অচলাবস্থা এবং সেনানিবাসজুড়ে অস্বাভাবিক ও থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছিল। কর্মকর্তারা কাজের পরিবর্তে বিভিন্ন স্থানে জটলা করে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। সেদিন অফিস থেকে সবাই চলে যাওয়ার পর তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সহকারী সুবেদার আলিমুদ্দিন একটি বাংলা প্রচারপত্র দেখান। আলিমুদ্দিন তাঁকে জানান, সেনানিবাসে প্রচুর পরিমাণে প্রচারপত্রটি বিলি করা হয়েছে। ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’র নামে ছাপানো ওই প্রচারপত্রে সেনাবাহিনীর প্রচলিত কাঠামো ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য ছিল। এতে দাবি করা হয়, সেনাবাহিনীতে কোনো অফিসার থাকবে না। কারণ, কর্মকর্তারা নিজেদের ক্ষমতা ও স্বার্থসিদ্ধির জন্য সৈনিকদের ব্যবহার করেন। এ ছাড়া অফিসারদের জন্য প্রচলিত ‘ব্যাটম্যান’ প্রথা বন্ধের দাবিও তোলা হয়। লেখকের কাছে খবর ছিল, অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকেরা এসব প্রচারপত্র বিলি করছিলেন। মধ্যরাতে গোলাগুলি, জিয়ার মুক্তি বিকেলে বাসায় ফিরে শারীরিক দুর্বলতা ও ক্লান্তির কারণে আর বাইরে যাননি মইনুল হোসেন চৌধুরী। মধ্যরাতের পর হঠাৎ চারদিকে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পান। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথমে বর্তমান বিমানবন্দর সড়কের পাশে অবস্থিত অর্ডন্যান্স ডিপো থেকে গুলির শব্দ আসে। এরপর গ্যারিসন মসজিদের পাশে অবস্থিত সিগন্যাল ইউনিট থেকেও গোলাগুলি শুরু হয়। তিনি ইউনিফর্ম পরে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে রাতের অন্ধকারে গোলাগুলির মধ্যে বের না হওয়ার অনুরোধ জানান। এরই মধ্যে তাঁর বাসার টেলিফোন বেজে ওঠে। কয়েক দিন ধরে বিচ্ছিন্ন থাকা ফোনটি সিগন্যাল সেন্টার থেকে করা হয়েছিল। সেখান থেকে তাঁকে জানানো হয়, ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে পাল্টা অভ্যুত্থান শুরু হয়েছে। কর্নেল তাহের ছবি: সংগৃহীত কিছুক্ষণ পর বাসার বারান্দা থেকে তিনি দেখতে পান, কালো, খাকি ও বেসামরিক পোশাক পরা প্রায় শখানেক লোক গুলি ছুড়তে ছুড়তে ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়ে জেনারেল জিয়ার বাড়ির দিকে যাচ্ছে। তাঁদের একটি দল জিয়ার বাড়িতে প্রবেশ করে তাঁকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে পাশের দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারি ইউনিটে নিয়ে যায়। তখন জিয়াউর রহমানের পরনে ছিল সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা। এরপর চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমিনুল হক টেলিফোনে মইনুল হোসেন চৌধুরীকে একই খবর জানান। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর আমিনুল হককে তাঁর ইউনিটের অধিনায়কের পদ থেকে সরিয়ে সেনা সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছিল। তবে রাতের পরিস্থিতি সম্পর্কে তখনো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাচ্ছিল না। কোথায় কী ঘটছে, তা জানারও তেমন কোনো উপায় ছিল না। জিয়াকে রেডিও স্টেশনে নিতে চেয়েছিলেন তাহের মইনুল হোসেন চৌধুরীর বর্ণনায়, রাতের ঘটনার পর ভোরের দিকে কয়েকজন লোক তাঁর বাসায় এসে তাঁকে দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারি ইউনিটে যাওয়ার খবর দেন। তাঁরা জানান, জেনারেল জিয়া তাঁকে সেখানে যেতে বলেছেন। পরে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের লেফটেন্যান্ট মুনীর বেসামরিক পোশাকে তাঁর বাসায় যান। তিনি পরিস্থিতির বিস্তারিত জানিয়ে দ্রুত সেখানে যাওয়ার অনুরোধ করেন। এ সময় ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত আলীকেও সেখানে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তিনি যশোর থেকে ঢাকায় এসে জেনারেল খালেদ মোশাররফের আহ্বান করা একটি সভায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। মইনুল হোসেন চৌধুরী পরে জানতে পারেন, মীর শওকত যে ভিআইপি কক্ষে অবস্থান করছিলেন, সেখানেও সৈনিকেরা গুলি চালায়। তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে তৎকালীন মেজর জেনারেল এইচ এম এরশাদের বাসায় আশ্রয় নেন। পরে মেজর মহিউদ্দীন তাঁকে সেখান থেকে নিয়ে আসেন। লাঠিতে ভর দিয়ে হেঁটে মইনুল হোসেন চৌধুরী দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারি ইউনিটে পৌঁছান। তাঁর বাসা থেকে ইউনিটটির দূরত্ব ছিল প্রায় দুই শ গজ। সেখানে গিয়ে একটি ছোট কক্ষে জিয়াউর রহমানকে বসে থাকতে দেখেন। উপস্থিত ছিলেন কর্নেল আমিনুল হক, ইউনিটটির সুবেদার মেজর আনিস এবং কয়েকজন কর্মকর্তা। কিছুক্ষণ পর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহের দুই-তিনজন সঙ্গীকে নিয়ে একটি বেসামরিক জিপে সেখানে আসেন। তাহের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে জিয়াউর রহমানের অধীনে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। পরে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং যুদ্ধে আহত হন। স্বাধীনতার পর কিছুদিন সেনাবাহিনীতে থাকার পর অবসর নিয়ে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থায় চাকরি করছিলেন। সেখানে পৌঁছেই তাহের জিয়াউর রহমানকে রেডিও স্টেশনে যাওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু মইনুল হোসেন চৌধুরী ও উপস্থিত অন্য কর্মকর্তারা জিয়াকে সেখানে যেতে নিষেধ করেন। এ নিয়ে তাহেরের সঙ্গে কর্নেল আমিনুল হকের তর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে আমিনুল হক তাহেরকে বলেন, ‘আপনারা (জাসদ) তো ভারতের বি টিম।’ এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তাহের সেখান থেকে চলে যান। পরে রেডিওতে প্রচারের জন্য জিয়াউর রহমানের একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রেকর্ড করে পাঠানো হয়। লেখকের বর্ণনায়, তখন সেখানে ইউনিফর্মের পরিবর্তে বেসামরিক পোশাকে কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের অনেককে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার লোকজন বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে এসেছিল। সেনা কর্মকর্তাদের সংকটকালীন সময়ে ইউনিফর্ম পরে থাকার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন মইনুল হোসেন চৌধুরী। তাঁর মতে, সামরিক অভ্যুত্থান ও বিশৃঙ্খলার সময় বেসামরিক পোশাকে থাকার কারণে কর্মকর্তাদের পরিচয় ও অবস্থান নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ৭ নভেম্বরের ঘটনায় নিহত সেনা কর্মকর্তাদের অধিকাংশই বেসামরিক পোশাকে ছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। এ প্রসঙ্গে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের সময় তাঁর সামরিক সচিবের পোশাকের বিষয়টিও বইয়ে তুলে ধরেছেন। খালেদ মোশাররফ, হুদা ও হায়দারকে হত্যা ৭ নভেম্বর সকালে সেনাবাহিনীর ভেতরে আরও একটি ভয়াবহ খবর ছড়িয়ে পড়ে। মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দারকে শেরেবাংলা নগরের ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে হত্যা করা হয়েছে বলে খবর আসে। মইনুল হোসেন চৌধুরীর বর্ণনা অনুযায়ী, ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর খালেদ মোশাররফ, হুদা ও হায়দার বঙ্গভবনে অবস্থান করছিলেন। ৭ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থান শুরু হয়েছে জানতে পেরে তাঁরা সেখান থেকে বেরিয়ে যান। পথে তাঁরা পোশাক পরিবর্তন করে বেসামরিক পোশাকে ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে পৌঁছান। রেজিমেন্টটি আগে রংপুরে কর্নেল হুদার অধীনে ছিল। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর খালেদ মোশাররফ ইউনিটটিকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন। লেখকের বর্ণনায়, ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে পৌঁছানোর পরই তাঁদের হত্যার খবর পাওয়া যায়। তবে বইয়ের এই অংশে হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ নেই; তিনি সেনা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে খবরটি জানতে পেরেছিলেন বলে বর্ণনা থেকে বোঝা যায়। ফলে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল, সময় ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে তাঁর বিবরণকে সে সময় পাওয়া তথ্য ও পরবর্তী জানা ঘটনার আলোকে পড়তে হবে। এদিকে ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ঢাকা ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিলের অবস্থান নিয়েও অনিশ্চয়তা ছিল। পরে খবর আসে, বঙ্গভবনের দেয়াল টপকানোর সময় তিনি পায়ে আঘাত পান এবং ঢাকার বাইরে আত্মগোপন করেন। মইনুল হোসেন চৌধুরী তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে ঢাকায় এনে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরই মধ্যে শহরের বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার খবর আসে। ফলে সেনাবাহিনীর ভেতরে নিরাপত্তাহীনতা ও বিশৃঙ্খলা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। সৈনিকদের অভ্যুত্থান ও সেনাবাহিনীর ভেতরের বিভাজন ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে সেনাবাহিনীর সব ইউনিট সমানভাবে অংশ নেয়নি বলে উল্লেখ করেছেন মইনুল হোসেন চৌধুরী। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, আর্টিলারি, ল্যান্সার, আর্মার, সিগন্যাল, অর্ডন্যান্স ও সাপ্লাই কোরের বেশির ভাগ সৈনিক অভ্যুত্থানে জড়িত ছিল। অন্যদিকে ঢাকায় অবস্থানরত পদাতিক বাহিনীর সৈন্যরা এতে উল্লেখযোগ্যভাবে অংশ নেয়নি, আবার প্রতিরোধও করেনি। এর পেছনে ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতাকে কারণ হিসেবে দেখেছেন লেখক। তাঁর মতে, ওই অভ্যুত্থানে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল শাফায়াত জামিল ঢাকা ব্রিগেডের পদাতিক সৈন্যদের ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু সৈনিকদের মধ্যে সেই অভ্যুত্থানের প্রতি সমর্থন ছিল না। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আদেশের কারণে তারা অংশ নিতে বাধ্য হয়েছিল বলে তাঁর ধারণা। ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে সৈনিকদের দাবিদাওয়া শুধু সামরিক বাহিনীর প্রচলিত শৃঙ্খলা বা সুযোগ-সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। অফিসারদের কর্তৃত্ব ও পদমর্যাদাভিত্তিক কাঠামোর বিরুদ্ধেও স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল। সৈনিকদের মুখে শোনা যাচ্ছিল, ‘সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই, অফিসারের রক্ত চাই’ এবং ‘সিপাহি জনতা ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই’। এ ধরনের স্লোগান ও প্রচারপত্রের ভাষা সেনাবাহিনীর প্রচলিত কমান্ড কাঠামোর জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। কর্মকর্তাদের প্রতি সৈনিকদের ক্ষোভ, নেতৃত্বের সংকট এবং বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে সমন্বয়হীনতা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছিল। সৈনিকদের নিয়ন্ত্রণে আনার দায়িত্ব পান মইনুল দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারি ইউনিট থেকে জিয়াউর রহমান, মইনুল হোসেন চৌধুরী ও ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত আলী সেনা সদর দপ্তরে যান। সেখানে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হয়, অভ্যুত্থানকারী সৈনিকদের উদ্দেশে সেনাপ্রধান বক্তব্য দেবেন। তবে তার আগে তাঁদের নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। মইনুল হোসেন চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ঢাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন, ঢাকা ব্রিগেডের কমান্ডার ছিলেন এবং তখন সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। এসব বিবেচনায় সৈনিকদের সংগঠিত ও শান্ত করার দায়িত্ব তাঁর ওপর দেওয়া হয়। তবে দায়িত্বটি পালন করা সহজ হবে না—এমন আশঙ্কা তাঁর মধ্যেও ছিল। কারণ, সৈনিকেরা নানা দাবি তুলতে পারে এবং তাঁদের বোঝানো কঠিন হতে পারে বলে তিনি মনে করছিলেন। তিনি দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারি ইউনিট, আর্মি মিলিটারি পুলিশ ইউনিট এবং সেনা সদর দপ্তরের সুবেদার মেজরদের মাধ্যমে বিভিন্ন ইউনিটের জেসিও, এনসিও ও সৈনিক প্রতিনিধিদের সেনা মিলনায়তনে উপস্থিত হওয়ার খবর পাঠান। বর্তমান গ্যারিসন সিনেমা হল তখন সেনা মিলনায়তন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেখানে যাওয়ার সময় মিলিটারি পুলিশ ইউনিটের ক্যাপ্টেন মোসাদ্দেক তাঁর সঙ্গে ছিলেন। মিলনায়তনে গিয়ে তিনি দেখতে পান, কয়েকজন সৈনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি তাঁদের অস্ত্র বাইরে রেখে আসার নির্দেশ দেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সৈনিকেরা তাঁর নির্দেশ মানেন কি না, সেটি যাচাই করতেই তিনি এ নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁকে সেখানে পাঠানোর উদ্দেশ্য ছিল সৈনিকদের মনোভাব বোঝা এবং তাঁদের শান্ত করা, যাতে পরে জিয়াউর রহমান এসে বক্তব্য দিতে পারেন। সৈনিকেরা অস্ত্র ও গোলাবারুদ বাইরে রেখে এলে তিনি তাঁদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। এ সময় বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার পক্ষ থেকে বিভিন্ন দাবিদাওয়া তুলে ধরা হয়। মইনুল হোসেন চৌধুরী তাঁদের জানান, সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা, নিয়মকানুন ও কাঠামো এক মুহূর্তে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। উচ্ছৃঙ্খলতার কারণে দেশ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বলেও তিনি তাঁদের সতর্ক করেন। আলোচনা শেষে তিনি সৈনিকদের জানান, কিছুক্ষণের মধ্যেই সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান তাঁদের উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন। সেনাবাহিনীর বাইরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা মইনুল হোসেন চৌধুরীর বর্ণনায়, ৭ নভেম্বরের অস্থিরতা শুধু সেনাবাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বেসামরিক প্রশাসনের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কিছু কর্মচারীও নিজেদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তাঁদের সঙ্গে কিছু কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকের যোগাযোগ হয়েছিল। সৈনিকদের একটি অংশ সেনানিবাসের বাইরে গিয়েও তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে সেনানিবাসের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর বাইরে থাকা সৈনিকদের মধ্যেও উচ্ছৃঙ্খলতা কমে যায় বলে তাঁর দাবি। লেখক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, সেদিন ঢাকা সেনানিবাসের সৈনিকদের নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনজুড়ে নেতৃত্বহীন বিশৃঙ্খলা এবং সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারত। তাঁর ভাষায়, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারত, যা এক ধরনের ‘নেতৃত্বহীন ভয়াবহ উচ্ছৃঙ্খল শ্রেণি-সংগ্রাম’-এর রূপ নিত। জিয়ার বক্তব্য ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা সেনা মিলনায়তনে মইনুল হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে সৈনিকদের আলোচনা শেষ হওয়ার পর জিয়াউর রহমান সেখানে উপস্থিত হন। তখনো পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়নি। তিনি সৈনিকদের দাবিদাওয়া শুনে তাঁদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে একপর্যায়ে নিজের কোমরের আর্মি বেল্ট খুলে মাটিতে ছুড়ে দেন। এরপর বলেন, এত দাবিদাওয়া থাকলে তিনি আর সেনাপ্রধান থাকতে চান না। লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, জিয়ার এ বক্তব্যের পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। বক্তব্য শেষ করে তাঁরা সেনা সদর দপ্তরে ফিরে যান। পরে সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকার বাইরে থেকে পদাতিক সৈন্য এনে সেনানিবাসের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে এবং উচ্ছৃঙ্খল সৈনিকদের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যশোর থেকে কিছু পদাতিক সৈন্য এনে ঢাকা সেনানিবাসের বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা হয়। এর মাধ্যমে সেনানিবাসের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা পুনর্গঠনের চেষ্টা চলে। অভ্যুত্থানের পরপরই রেডিওতে জিয়াউর রহমানের রেকর্ড করা বক্তব্য প্রচার করা হয়েছিল। পরে তিনি কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেন। মইনুল হোসেন চৌধুরীর মূল্যায়নে, সৈনিকদের দাবিদাওয়া মোকাবিলা, সেনানিবাসে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ছিল সেদিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিচারণে ৭ নভেম্বরের ঘটনা কেবল একটি সামরিক অভ্যুত্থান বা ক্ষমতার পালাবদলের বিবরণ নয়; বরং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভাজন, সৈনিকদের ক্ষোভ, কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন, নেতৃত্বের সংকট এবং রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক টানাপোড়েনেরও চিত্র। জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পর তাঁর সামনে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা সামাল দিতে একদিকে যেমন সামরিক কর্মকর্তাদের উদ্যোগ নিতে হয়, অন্যদিকে সৈনিকদের দাবিদাওয়া ও বিদ্রোহী তৎপরতাও মোকাবিলা করতে হয়। তবে বইটির বিবরণ মূলত লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতি, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং সে সময় পাওয়া বিভিন্ন খবরের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে খালেদ মোশাররফ, হুদা ও হায়দারের হত্যাকাণ্ড এবং অভ্যুত্থানের বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা বুঝতে অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, সামরিক নথি ও ঐতিহাসিক গবেষণার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। সূত্র: মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরী, ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক (১৯৭১-১৯৮১)’।