প্রকাশ :: ... | ... | ...

এইচএসসিতে গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার, কারণ ও প্রতিকার


সংযুক্ত ছবি

২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ৫২.১২ শতাংশে নেমে এসেছে,যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এবছর দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষাবোর্ডের অধীনে মোট পরীক্ষার্থী ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ জন,এর মধ্যে পাস করেছে ৫ লাখ ৪১ হাজার ২৪৯ জন। গড় পাসের হার ৫১.৬২ শতাংশ এর মধ্যে ছাত্রী পাসের হার ৫৫.৪৫ শতাংশ এবং ছাত্র পাসের হার ৪৭.১৪ শতাংশ। অকৃতকার্য হয়েছে ৫ লাখ ৭ হাজার ২৮১ জন শিক্ষার্থী। অকৃতকার্যের হার ৪৮.৩৮ শতাংশ। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে তার দায় কার? জাতি হিসাবে আমরা কী করলাম? এত আর্থিক ক্ষতি, সময় অপচয, ছেলে-মেয়েদের মনোবল ভেঙে যাওয়া, এর দায় কি শুধু শিক্ষার্থীদের? জাতি হিসাবে আমাদেরও কিছুটা হলেও দায় আছে? আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। শিক্ষকসংকট, শিক্ষকদের স্বল্প বেতন-ভাতা, অপর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা, সময়োপযোগী শিক্ষানীতির অভাব, ভুল প্রশ্নপত্র প্রনয়ন ইত্যাদির দায় ছাত্ররা নিবে কেন? আমাদের দেশে যারা শিক্ষাব্যবস্থা পরিচারনা করেন তারাও এ দায় এড়াতে পারেন না। ফলাফল বিপর্যয় হয়ে কিছুদিন আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরগরম থাকি,তারপর যে লাউ সে কদ্।ু শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষত সারানো না গেলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অচিরেই আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। সবকিছুর উর্ধ্বে উঠে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে বৈশ্বিক নাগরিক করতে চাই শিক্ষার আধুনিকায়ন। শিক্ষকতা পেশার সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করে মেধাবীদেরকে এ কর্মে নিয়োজিত করতে পারলে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব। এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয়ের কারন নানাবিধ। এর মধ্যে কিছু অন্যতম কারণ তুলে ধরছি। ইংরেজি ও আইসিটিতে খারাপ ফল: ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে,যা সামগ্রিক পাসের হারে বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। শহরের কিছু প্রতিষ্ঠান ব্যতিত গ্রামের বেশির ভাগ কলেজেই দক্ষ ইংরেজি শিক্ষকের বড় অভাব। এবছরের ফলাফলে যে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে এর মধ্যে শুধু ইংরেজিতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। বেশিরভাগই মফস্বল অঞ্চলের শিক্ষার্থী। শিখন ঘাটতি ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট: শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের লেখাপড়ায় ঘাটতি এবং বিশেষ করে গ্রামের বেশিরভাগ কলেজে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। আর কলেজ পর্যায়ে যেনতেন শিক্ষক দিয়ে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়। শ্রেণিকার্যক্রমে অনুপস্থিতি ও কোচিংনির্ভরতা: বেশিরভাগ শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না হয়ে কোচিং সেন্টারের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে,ফলে প্রশ্নের ধরন বুঝতে তাদের সুবিধা হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা ও বস্তুনিষ্ঠ খাতা মূল্যায়ন: কোভিড মহামারীর পর থেকে শর্ট সিলেবাসে পরীক্ষা হওয়ায় এবং কোনো ধরনের বাড়তি বা অনুকম্পার নম্বর না দিয়ে সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠভাবে খাতা মূল্যায়ন। স্মর্টফোন ও প্রযুক্তির প্রতি আসক্তি: নিয়মিত পড়ার টেবিলে না বসে বন্ধু-বান্ধবের সাথে অযথা আড্ডা দেওয়া এবং মোবাইলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা। শিক্ষণ পদ্ধতি ও পরিবারের তদারকির অভাব: শিক্ষাদান পদ্ধতি, পারিবারিক নজরদারির অভাব এবং সামগ্রিক শিখন পরিবেশের ঘাটতি। শিক্ষা জীবনের গুরুত¦পূর্ণ এই পাবলিক পরীক্ষায় এতো অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করায় অভিভাবকরা হতাশ। প্রতিদিন নিজে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে সন্তানের লেখাপড়ার খরচ যোগায় সন্তানের মুখে হাসি দেখবে বলে।দিনশেষে সন্তানের এমন ফলাফলে অভিভাবকরা চোখে অন্ধকার দেখে। মোবাইল গেমসে আসক্তি বর্তমান যুগের একটি বৈশ্বিক সমস্যা, যা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আসক্তি শুধু সময়ের অপচয়ই ঘটায় না, বরং শিক্ষার্থীর মনোযোগ ও মানসিক সক্ষমতাকেও দুর্বল করে দেয়। গেমসের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগের কারণে পাঠ্যবইয়ের প্রতি একটি অনীহা তৈরি হয়। গেমিংয়ের নেশা শিক্ষার্থীদের ঘুম, মেজাজ ও খাদ্যের নিয়মিত রুটিনকে বিঘ্নিত করে। যা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং শেষ পর্যন্ত তাঁদের পড়াশোনার ফলাফলকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন চ্যাটিং, প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার শিক্ষার্থীদের একটি ভার্চ্যুয়াল জগতে আটকে রাখছে। যার ফলে শিক্ষার্থীদের মূল্যবান কর্মঘণ্টা অহেতুক নষ্ট হচ্ছে। রাত জেগে বিভিন্ন প্লাটফর্ম ব্যবহারের কারনে সকালবেলা স্কুলে এসে শ্রেণি কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না। এছাড়া অনলাইনে অবাধে বিচ্ছিন্ন তথ্যের প্রবাহ শিক্ষার্থীদের গভীর চিন্তা ও ধারাবাহিক জ্ঞান অর্জনের ক্ষমতাকে দুর্বল করে তোলে। ফলাফল খারাপ করার আরেকটি অন্যতম কারণ হলো ইংরেজি ও আইসিটি বিষয় না বুঝে মুখস্ত করা। উচ্চমাধ্যমিক স্তরের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ইংরেজির ভিত্তি একেবারেই নড়বড়ে।নিচের ক্লাসে ইংরেজির বেসিক না জানার কারনে উপরের ক্লাসে এসে আর কুলিয়ে উঠতে পারে না। বিদেশি ভাষা কঠিন ও জটিল বিষয় হিসেবে ধরে নেওয়া,নিয়মিত অনুশীলন না করা, বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক ছাড়া অন্য শিক্ষকে দিয়ে ক্লাস নেয়া ইত্যাদি কারণে ইংরেজিতে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে। এ কারনে মানবিক বিভাগের ফলাফল আরো বেশি খারাপ হয়েছে। শিক্ষার্থীরা নিয়ম না বুঝে ইংরেজির বিভিন্ন দিক মুখস্ত করে,ফলে পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন একটু বদলে দিলেই তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়। এছাড়াও প্রতিটি কলেজে শিক্ষকের স্বল্পতা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এনটিআসিএ কর্তৃক শিক্ষক নিয়োগ সুপারিশ বন্ধ থাকায় অনেক কলেজেই শিক্ষক ঘাটতি রয়েছে এতে পাঠদানে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। শিক্ষকদের সম্মানজনক বেতন-ভাতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য প্রায়ই তাঁদের আন্দোলনে মুখর হতে দেখা যায়। তাই কেবল একটি নয়, বরং সমস্যার সব দিকই এখন সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় কলেজগুলোতে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি। আমি মনেকরি শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় গুণগত শিক্ষার পাশাপাশি ফলাফলও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। লেখক : মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, সিনিয়র শিক্ষক, দুলালপুর সুরুজ মিয়া এন্ড খাতুন উচ্চ বিদ্যালয়, ব্রাহ্মণপাড়া, কুমিল্লা।