বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন কাটিয়ে নতুন করে আস্থা ফিরিয়ে আনতে ভারতকেই উদ্যোগী হতে হবে বলে মনে করেন জ্যেষ্ঠ ভারতীয় সাংবাদিক পারুল চন্দ্রা। তাঁর মতে, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একটি গঠনমূলক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ডেকান হেরাল্ড-এ প্রকাশিত এক মতামতে এসব কথা লিখেছেন পারুল চন্দ্রা। তাঁর মতে, বাংলাদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের দূরত্ব ভারতের কৌশলগত স্বার্থের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। একইভাবে বাংলাদেশের জন্যও ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুই দেশের সম্পর্ক শুধু ভৌগোলিক নৈকট্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নিরাপত্তা, বাণিজ্য, যোগাযোগ, পানি ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সঙ্গেও তা সরাসরি যুক্ত। পারুল চন্দ্রার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুই দেশই নভেম্বরের শেষ দিকে দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে। এ অবস্থায় তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য প্রয়োজনীয় অনুকূল পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব নয়াদিল্লিকেই নিতে হবে। তাঁর মতে, ভারত তা করতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক ও আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থান—দুই ক্ষেত্রেই দিল্লিকে মূল্য দিতে হতে পারে। বিশ্লেষণে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। গত জুনে তারেক রহমানের চীন সফরের সময় দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চপর্যায়ে নেওয়ার বিষয়ে একাধিক সমঝোতা হয়। বেইজিং ও ঢাকা ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব’ আরও গভীর করার পাশাপাশি ‘নতুন যুগে চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের অংশীদারত্ব’ গড়ে তোলার কথা জানায়। পারুল চন্দ্রার মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পৃক্ততা বাড়ায় নয়াদিল্লির উদ্বেগও বাড়ছে। বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের উন্নয়নকেও ভারতের জন্য নতুন বাস্তবতা হিসেবে দেখেছেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকা-ইসলামাবাদ যোগাযোগ বাড়তে শুরু করে। বর্তমান সরকারও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার আগ্রহ দেখিয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে তারেক রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের বৈঠকের কথাও উল্লেখ করেছেন পারুল চন্দ্রা। তাঁর মতে, বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের এই ঘনিষ্ঠতা দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানকে কৌশলগতভাবে বিচ্ছিন্ন রাখার ভারতের দীর্ঘদিনের নীতিকে আরও জটিল করতে পারে। শেখ হাসিনার সরকারের সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির পার্থক্যও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। পারুল চন্দ্রার মতে, শেখ হাসিনা ভারতের ঘনিষ্ঠ অংশীদার থাকায় দুই দেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল। কিন্তু তাঁর সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির পাশাপাশি সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্যতা ও কৌশলগত ভারসাম্যের কথা বলছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকে অন্যতম জটিল বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন পারুল চন্দ্রা। তাঁর মতে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার দাবি এবং ভারত থেকে তাঁর বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কে চাপ তৈরি করছে। আগস্টে দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর ঢাকার তীব্র প্রতিক্রিয়ার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেছেন। এর ফলে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর ও মোদির সঙ্গে বৈঠকের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তাঁর বিশ্লেষণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশই কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি জুনে ঢাকায় পৌঁছান এবং পরে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সমমর্যাদা দেওয়া হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামকে নয়াদিল্লিতে পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগে ভারত গত ২২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক সম্মতি দিয়েছে। তিনি বর্তমান হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এই দুই নিয়োগকে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক পুনর্গঠনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় চালুর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে তারেক রহমানের ভারত সফর এবং মোদির সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাব্য আয়োজন নিয়ে দুই পক্ষের আলোচনার কথা এসেছে। ভারতে বাংলাদেশি অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যকেও সম্পর্কের আরেকটি স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন পারুল চন্দ্রা। বিশেষ করে বিজেপির নেতাদের বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশকারী’ নিয়ে কঠোর বক্তব্য বাংলাদেশে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে বলে তাঁর বিশ্লেষণ। ভবিষ্যতে সীমান্ত ও অভিবাসন ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে আরও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ প্রয়োজন বলেও তিনি মত দিয়েছেন। পানি ইস্যুকেও সম্পর্ক পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখেছেন এই ভারতীয় সাংবাদিক। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বরের দিকে শেষ হওয়ার কথা থাকায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে। বাংলাদেশের জন্য গঙ্গার পানির ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ—এমন অবস্থানের কথা উল্লেখ করে পারুল চন্দ্রা মনে করেন, পানি বণ্টনের মতো দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানের উদ্যোগ সম্পর্কের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে। এর আগে ২০২২ সালে *ডেকান হেরাল্ড*-এ প্রকাশিত তাঁর আরেকটি বিশ্লেষণেও তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তিকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বড় অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে পারুল চন্দ্রার বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো—বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু অতীতের রাজনৈতিক সমীকরণের ভিত্তিতে দেখলে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাঁর মতে, শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকার বাড়তে থাকা যোগাযোগ এবং বাংলাদেশের বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতিকে বিবেচনায় নিয়ে নয়াদিল্লিকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। তিনি মনে করেন, ভারত ও বাংলাদেশ—দুই দেশেরই নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। তবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হলে আস্থা পুনর্গঠন, উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সংলাপ এবং পানি, বাণিজ্য, সীমান্ত, নিরাপত্তা ও জনগণের যোগাযোগের মতো বিষয়গুলোতে বাস্তব অগ্রগতি জরুরি। তাঁর মতে, দুই দেশের সম্পর্ককে কোনো একটি রাজনৈতিক ইস্যুর মধ্যে আটকে না রেখে বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় স্বার্থের ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়াই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।