প্রকাশ :: ... | ... | ...

বিশ্বায়নের এযুগে সফলভাবে টিকে থাকতে প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা


সংযুক্ত ছবি

তথ্য প্রযুক্তির এযুগে এসেও দিন দিন আমাদের দেশ বিজ্ঞান চর্চায় পিছিয়ে যাচ্ছে। যেখানে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো বিজ্ঞানে বড় বড় সাফল্য অর্জন করে চলেছে সেখানে আমরা বিজ্ঞান চর্চায় এখনো উদাসীন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি,গবেষণা ও উন্নয়নে অপ্রতুল বাজেট,মানসম্মত শিক্ষকের অভাব ও মানহীন প্রকাশনার চাপ, বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা ও বিজ্ঞানমনস্কতার অভাব এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন উদ্ভাবনে অর্থ ব্যয় না করার কারনে আমরা বিজ্ঞানের রাজ্যে যথাযথভাবে প্রবেশই করতে পারছি না। এ না পারার কারণ এবং এ থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে ভাবার বুঝি কেই নেই। আমাদের দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকেই ভালো ফলাফল অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীদেরকে চাপ দেওয়া হয়,ফলে শিক্ষার্থীরা না বুঝেই বিজ্ঞানের কঠিন ও দুর্বোধ্য বিষয়গুলো মুখস্থ করে। এতে শিশুদের কৌতুহল এবং স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ঘটে না,যা বিজ্ঞান চর্চার মুল ভিত্তি। বেশির ভাগ স্কুল কলেজে মানসম্মত কোনো বিজ্ঞান গবেষণাগার নেই। যেগুলোতে আছে সেগুলোও জরাজীর্ণ এবং নিয়মিত ব্যবহার হয় না। যার দরুণ শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে বিজ্ঞান শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়াও জাতীয় বাজেটে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে খুবই সামান্য অর্থ বরাদ্দ থাকে,তাও আবার সেই অর্থ বিদেশ ভ্রমণে ব্যয় হয়ে যায়। মানসম্মত গবেষণার জন্য প্রয়োজন আধুনিক যন্ত্রপাতি ও কেমিক্যাল। যা পেতে গবেষকদের দীর্ঘমেয়াদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও চড়া শুল্কের মুখোমুখি হতে হয়। উন্নত দেশগুলোতে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান নতুন উদ্ভাবনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অর্থায়ন করে,যা আমাদের দেশে নাই বললেই চলে। আমাদের দেশে বিজ্ঞান গবেষণাকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিলে আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা পাওয়া কঠিন। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিসিএস, করপোরেট চাকরি বা ব্যবসায়িক শিক্ষার দিকে বেশি ঝুঁকছে। যে সকল মেধাবীরা বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা নেয়, তারাও সঠিক পরিবেশ ও মুল্যায়নের অভাবে বিদেশে পাড়ি জমায় এবং আর দেশে ফিরে আসে না। যার দরুণ দিন দিন আমরা বিজ্ঞান গবেষণায় পিছিয়ে পড়ছি। এতো গেলো বিজ্ঞান গবেষণার বিষয়। বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতায়ও আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। প্রযুক্তির এযুগে এসেও আমরা অন্ধবিশ্বাসে সবকিছু মেনে নেই। যার ফলে অন্যরা আমাদেরকে সহজেই ধোঁকা দিতে পারে। বর্তমান বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে চলতে গেলে বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা জ্ঞান থাকা জরুরি। বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা হলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কিত বিষয়গুলো বোঝার,মূল্যায়ন করার এবং সে বিষয়ে যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। অও এর যুগে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কথা বলতে গেলে বা কথা শুনতে গেলে কিংবা কারো কথার মর্ম বুঝতে হলে আপনার মধ্যে বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতার জ্ঞান থাকা জরুরি। শিক্ষ্গত যোগ্যতার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা প্রয়োজন। কারণ বিশ্বায়নের এযুগে মানবজাতি প্রতিনিয়ত নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বাঁচতে হচ্ছে, হঠাৎ নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে, প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দূর্যোগ মানুষের চিরাচরিত জীবন ব্যবস্থাকে দুর্বিষহ করে তুলছে। দিন দিন প্রকৃতি মানুষের প্রতি রোষ্ট হয়ে ডেকে আনছে ভয়ংকর প্রাকৃতিক দূর্যোগ। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে প্রতিনিয়ত জলবাযু পরিবর্তন হচ্ছে,এতে চাষাবাদের ওপরও মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। এসব মোকাবিলা করে পৃথিবীতে বাঁচতে চাই বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা সম্পন্ন জনগোষ্ঠী। যার মধ্যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি আছে সেই বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা অর্জন করতে পারে। একজন বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা সম্পন্ন মানুষ ভবিষ্যতে পৃথিবীতে বসবাসরত মানুষের চাহিদা ও পরিস্থিতি আচ করে সে লক্ষ্যে তার পরিকল্পনা সাজান। একজন বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা সম্পন্ন মানুষ তার পেশায় কখনোই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। সে ব্যবসায়ী হলে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর মানুষের চাহিদা নিরুপন করে নতুন নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে গ্রাহকের চাহিদা মতো পণ্য উৎপাদন করতে পারে। একজন শিক্ষক যদি বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা জ্ঞান সম্পন্ন হন তাহলে তার ছাত্র-ছাত্রীরাও ছোট বেলা থেকে বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা অর্জনের দিকে এক পা দুই পা করে শিখরে পৌঁছে। মনে রাখতে হবে বিজ্ঞান সাক্ষরতা, বিজ্ঞানমনস্কতা,বৈজ্ঞানিক কাণ্ডজ্ঞান ও বিজ্ঞান গবেষণা এক কথা নয়। বিজ্ঞানমনস্কতা হলো প্রকৃতিতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা, রোগশোক, প্রাকৃতিক দূর্যোগ, আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি বিজ্ঞানের দৃষ্টি দিয়ে দেখা,ভাবা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া। বিজ্ঞানমনস্ক হতে হলে বিজ্ঞানী হতে হবে,সবকিছু ছেড়ে গবেষণা নিয়ে পড়ে থাকতে হবে এমনটা নয়, যেকোনো পেশার সচেতন মানুষই বিজ্ঞানমনস্ক হতে পারেন। বৈজ্ঞানিক কাণ্ডজ্ঞান বিজ্ঞান সাক্ষরতার প্রথম ধাপ। বিষয়টি একটি উদাহরণের সাহায্যে বুঝার চেষ্টা করি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মোগড়া ইউনিয়নের বচিয়ারা গ্রামে ঝড়ে উপড়ে যাওয়া একটি গাছ প্রায় দেড় মাস পর পুনরায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং শুরু হয় কুসংস্কার। কেউ লাল কাপড় পরিয়ে সেজদা, কেউ অলৌকিক মনে করে পুজা দেওয়া, কেউ মোমবাতি জ্বালিয়ে আরাধনা,কেউ বা আবার গাছের শিকড় ছাল তাবিজে ভরে গলায় কিংবা কোমরে বাঁধা ইত্যাদি কুসংস্কারে মেতে উঠেছিল। আসলে সেখানে কী ঘটেছিল? ঝড়ে গাছটি পড়ার পর স্থানীয় জনগণ গাছের ডালপালা ও ওপরের অংশ কেটে নেয়। গাছটি যখন পড়েছিল,তখন তার সব শিকড় ছিঁড়ে যায়নি। মাটির নিচে থাকা প্রধান ও শক্তিশালী শিকড়গুলো তখনো মাটির সাথে শক্তভাবে যুক্ত থাকে এবং আগের চেয়ে বেশি শক্তিতে মাটি আটকে থাকে। এই শিকড়গুলো তখন একটি টানটান স্প্রিংয়ের ন্যায় কাজ করে। ওপরের ভারী ডালপালা কেটে নেওয়ার কারনে গাছটি আগের চেয়ে ওজনে হালকা হওয়ায় এবং প্রবল বিপরীতমুখী টানে গাছটির কাণ্ড পুনরায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এটুকু জ্ঞান থাকাই বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা। বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা সম্পন্ন একজন মানুষের মূল বৈশিষ্ট্য হলো তথ্য যাচাই না করে অন্ধভাবে কোনো কিছু বিশ্বাস না করে প্রমাণ ও যুক্তির ভিত্তিতে সবকিছু মূল্যায়ন করা। একজন বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা সম্পন্ন মানুষ- প্রশ্ন করার মানসিকতা,প্রমাণের ওপর নির্ভরতা, সমস্যার সমাধান খোঁজা,পক্ষপাতিত্ব ও ভুল তথ্য চিহ্নিতকরণ এবং বিজ্ঞানের ব্যবহারিক প্রয়োগের বৈশিষ্ট্য গুণ সম্পন্ন হয়। এছাড়াও তারা পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকেন। তাদের কৌতুহলী ও অনুসন্ধানী মন থাকে। তারা বরাবরই গবেষণা ও উন্নয়নে অবদান রাখতে চায় এবং পাশাপাশি সমাজে বিজ্ঞান ছড়িয়ে দিতে চায়। বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা সম্পন্ন জ্ঞান অর্জনের জন্য দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য বোঝা, প্রয়োগ করা এবং নিয়মিত চর্চা ও কৌতুহল ধরে রাখা প্রয়োজন। চারপাশের প্রাকৃতিক ঘটনা কেন ও কীভাবে ঘটে,তা নিয়ে মনে প্রশ্ন জাগানো এবং তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা। যে কোনো তথ্য বা বৈজ্ঞানিক দাবি শোনার পর তা অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে প্রমাণ ও যুক্তির ভিত্তিতে যাচাই করে দেখা। বিজ্ঞানভিত্তিক পডকাস্ট,প্রামাণ্যচিত্র,নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট এবং বিজ্ঞানের বই পড়ার মাধ্যমে জ্ঞানের পরিধি প্রসারিত করা। পরিবার,শিক্ষক ও সহপাঠীদের সাথে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে খোলামেলা গঠনমূলক আলোচনার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা অর্জিত হয়। লেখক : মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, সিনিয়র শিক্ষক, দুলালপুর সুরুজ মিয়া এন্ড খাতুন উচ্চ বিদ্যালয়, উপজেলা: ব্রাহ্মণপাড়া জেলা: কুমিল্লা।