বছরজুড়ে নানা দিবস আছে, দিবসের যেন অন্ত নেই। ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টালেই কোনো না কোনো আয়োজন, কোনো না কোনো স্লোগান। এই হাজারো দিবসের ভিড়ে ৮ মার্চের ‘বিশ্ব নারী দিবস’ এখন শহরের সীমানা পেরিয়ে গ্রামের মেঠোপথ অবধি পৌঁছে গেছে। কিন্তু এর আড়ালেই থেকে যায় আরও একটি বিশেষ দিন—‘বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস’। যে দিবসটির কথা আগে আমারও জানা ছিল না। হঠাৎ জানলাম, ১৫ অক্টোবর বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস। ২০০৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দিবসটি ঘোষিত হয়। কিন্তু ১৫ অক্টোবর যে বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস, সে কথা কজন গ্রামীণ নারী জানেন—সেটি একটি প্রশ্ন। আদৌ কেউ জানেন কি? না জানলেও ক্ষতি নেই, এখন থেকে জানবেন। গ্রামীণ নারীর প্রশ্নে এমনটাই মনে হয় যে, যিনি অন্ন মুখে তুলে দেন, তিনিই গ্রামীণ নারী—গ্রামীণ নারী দিবস সম্পর্কে বলতে গিয়ে এরকমটাই বলেছে ইউনেস্কো। কৃষি উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য দূরীকরণে গ্রামীণ নারীদের অসামান্য অবদান ও তাদের সংগ্রামকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। দিবসটি আজ আর কেবল কোনো আকস্মিক ভাবনা নয়। ১৯৯৫ সালে চীনের বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে প্রথম কণ্ঠ সোচ্চার হয়েছিল—গ্রামীণ নারীর অদৃশ্য শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ১৫ অক্টোবরকে ‘বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস’ করার প্রস্তাব পেশের মাধ্যমে। তবে প্রস্তাব থেকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে লেগে গেছে এক যুগ। ২০০৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬২/১৩৬ রেজুলেশনের মধ্য দিয়ে এটি লাভ করে আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এরপর ২০০৮ সালের ১৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে প্রথমবারের মতো উদযাপিত হয় দিবসটি। প্রতি বছরই একটি নতুন প্রতিপাদ্য সামনে রেখে দিনটি পালিত হয়। কিন্তু সেই সব স্লোগানের আসল বার্তা একটাই—গ্রামীণ নারীদের শুধু অন্নদাত্রী হিসেবে নয়, তাদের ভূমির অধিকার, সম্পদের সমবণ্টন এবং আজকের জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় প্রধান যোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য কোনো কৃত্রিম উদযাপনে নয়; গ্রামীণ নারীর অধিকার আদায়ের নীতিগত লড়াইকে আরও বেগবান করার মধ্যেই এর মূল সার্থকতা। ‘প্রকৃতির যত্নে গ্রামের নারী-কৃষক’—এবারের এই প্রতিপাদ্যটি আসলে এক চরম সত্যকেই সামনে আনে: আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যৎ ও প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন গ্রামীণ নারীরা। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যেখানে গ্রামে বাস করেন, সেখানে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নারীও গ্রামীণ। অথচ নারীর অধিকার, সুরক্ষা ও নির্যাতনবিরোধী যত আলোচনা এবং সেমিনার হয়, তার কতটুকু পৌঁছায় এই নারীদের কাছে? শহুরে নারী যেখানে নিজের কাজের পাশাপাশি অধিকার সম্পর্কেও সচেতন, সেখানে গ্রামীণ নারী কেবল উদয়াস্ত কাজটাই চেনেন। নারী বিষয়ে অনেক কথা হয়। নারীর অধিকার, নারীর সুরক্ষা, নারী নির্যাতন ইত্যাদি আরও অনেক কথা। কিন্তু অধিকাংশ নারী, অর্থাৎ গ্রামীণ নারী এই আলোচনার বাইরে থেকে যান। এই আলোচনা সম্পর্কে তারা তেমন কিছু জানেনও না। তবে কি নারীকে দুই ভাগে ভাগ করা হচ্ছে? গ্রামীণ নারী এবং শহুরে নারী? ঠিক তা নয়; তবে এই দুই ধরনের নারীর মধ্যে বিরাট ব্যবধান আছে। শহুরে নারী নিজের কাজের সঙ্গে নিজের অধিকার সম্পর্কেও সচেতন, আর গ্রামীণ নারী শুধু কাজটাই জানেন। অধিকার, সুরক্ষা—এসব নিয়ে তার ভাববার সময় কোথায়? তারা উদয়াস্ত কাজ করেন। যেকোনো কাজ। প্রথমত সংসার সামলান। সংসারের সমস্ত কাজ সামলানো যেন তার একার দায়িত্ব। তারপর রইল সংসারের বাইরের কাজ। স্বামীর যে পেশা, সেই পেশায় সাহায্য করা তার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু সেখান থেকে যা আয় হয়, সেই আয়ে তার তেমন কোনো ভাগ থাকে না। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ যেমন কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত, গ্রামীণ নারীও তাই। তারা কৃষিকাজে বড় ভূমিকা রাখে। ধান বোনে, আগাছা পরিষ্কার করে, ধান কাটে, মাড়াই করার কাজে সাহায্য করে, পরিষ্কার করে এবং ঘরে তোলার কাজে নিযুক্ত থাকে। ঘরে তোলার পর তা বিক্রি করে পাওয়া টাকার ওপর তার তেমন কোনো অধিকার থাকে না। সে নিজের খুশিমতো কিছু কিনতে পারে না। পরিবারের কর্তা এই ব্যাপারে সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী। তার প্রয়োজন বা শখ যদি কর্তা আমলে নেন এবং দয়া করে কিছু পূরণ করেন, সেটাই যেন তার পুরস্কার। গ্রামীণ শ্রমজীবী নারী, অর্থাৎ নারী কৃষিশ্রমিক ব্যাপক মজুরি বৈষম্যের শিকার। একজন পুরুষ কৃষি শ্রমিকের দৈনিক মজুরি কমপক্ষে ৫০০ টাকা, অন্যদিকে একজন নারী কৃষিশ্রমিকের মজুরি বড়জোর সাড়ে তিনশো টাকা। এই বৈষম্য মেনে নিয়েই তারা যুগের পর যুগ কাজ করে চলছেন। দেখা গেছে, এই মজুরি বৈষম্যের কারণে আকারে এক হলেও পুরুষের তুলনায় নারীর পরিচালিত খামারে উৎপাদন কমে যায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এক গবেষণা জানায়, এই উৎপাদনশীলতার ব্যবধান ২৪ শতাংশ। অথচ নারীরা যদি পুরুষের সমান সম্পদের অধিকার পেতেন, তবে উৎপাদন আরও ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে যেত এবং এই বাড়তি উৎপাদন দিয়ে বিশ্বের আরও ১৫ কোটি মানুষের আহার জোগান দেওয়া যেত। কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থায় নারী-পুরুষের সমমজুরি, সমান অংশগ্রহণ, মালিকানার অধিকার নিশ্চিত হলে বৈশ্বিক জিডিপির ১ শতাংশ বাড়বে এবং প্রায় সাড়ে ৪ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। গ্রামীণ নারীর শ্রমকে অস্বীকার ও আড়াল করলে আমাদের খাদ্য ব্যবস্থা কি টিকে থাকবে? বিশ্বে কর্মরত নারীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ গ্রামীণ কৃষি ব্যবস্থায় জড়িত। দক্ষিণ এশিয়ায় এই হার অনেক বেশি, প্রায় ৭১ শতাংশ। গ্রামীণ নারীরা শুধু মাঠে কাজ করেন না; বীজ সংরক্ষণ, বীজ বিনিময়, চারা তৈরি, বাগান তৈরি, প্রাণিসম্পদ লালন-পালন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবেশন, বাজারজাতকরণ, পরিবারের খাদ্য ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা—গ্রামীণ নারীর কর্মক্ষেত্র এমনই বহুমুখী ও বহুস্তরীয়। কিন্তু নিদারুণভাবে গ্রামীণ নারীর এই বহুমুখী শ্রম ও মেধার অবদান সর্বপরিসরে স্বীকৃত নয়। কৃষিতে বিশ্বব্যাপী নারীর শ্রমশক্তি ৪০ শতাংশ হলেও মাত্র ১৫ শতাংশ নারীর হাতে কৃষিজমির মালিকানা আছে। উৎপাদন থেকে পরিবেশন—সামগ্রিক খাদ্য ব্যবস্থায় মালিকানা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্নে গ্রামীণ নারীর অধিকার রুদ্ধ ও সীমিত। এবার আসা যাক আদিবাসী নারীদের প্রসঙ্গে। বাংলাদেশ সরকারের ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট ১.১০ শতাংশ আদিবাসী। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে বাংলাদেশে ১.৮ থেকে ২.৫ শতাংশ আদিবাসী। যদি তাই হয়, তাহলে নারীদের মধ্যে ২.৫ শতাংশ আদিবাসী নারী। প্রাণ-প্রকৃতি, কৃষি শ্রম—এই সমস্ত বিষয়ে আদিবাসী নারীদের কি যে অংশগ্রহণ, কি যে অবদান, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পাহাড় থেকে সমতল পর্যন্ত বিস্তৃত তাদের কর্মযজ্ঞ। আমরা দেখি, শিশু সন্তানকে কাপড় দিয়ে বেঁধে পিঠে ঝুলিয়ে নিয়ে পাহাড়ি নারী উঠে যাচ্ছে পাহাড়ে, জুম চাষ করছে। আবার সমতলে দেখি এক হাঁটু কাদার মধ্যে নেমে আদিবাসী নারী ধান রোপণ করছে। সাদা চোখে এই শ্রমের সৌন্দর্যটুকু দেখা যায়, কষ্টটুকু দেখা যায় না; তাই তো মূল্যায়িত হয় না আদিবাসী নারীর শ্রম ও সংগ্রাম। বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীর এই বিপুল কৃষি-অর্থনৈতিক অবদান জিডিপিতে হিসাব করা হয় না। পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক হিসাব দেখায়, গৃহস্থালি শ্রমে নারীর আর্থিক অবদান ৬.৭ লাখ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালের জিডিপির ১৮.৯ শতাংশ। কৃষি জমি, কৃষি ঋণ, কৃষি উপকরণ, সেচ, প্রযুক্তি, বাজার, কৃষি সেবাসহ ডিজিটাল প্রযুক্তিতেও নারীর প্রবেশাধিকার ও কার্যকর অংশগ্রহণ এখনো পুরুষের তুলনায় অনেক কম। একই সঙ্গে কাঠামোগত বৈষম্যের কারণে পুরুষের চেয়ে নারীর ওপর পারিবারিক ও গৃহস্থালি কাজের বোঝা বেশি। গ্রামীণ নারীর সংকট ও চ্যালেঞ্জ কেবলমাত্র সম্পদ ও মালিকানার নয়; বরং স্বীকৃতি ও মর্যাদার অভাবই নারীকে আরও বেশি প্রান্তিক করে তোলে। নানা রকমের সামাজিক, পেশাগত ও ভৌগোলিক বঞ্চনার কারণে বহু নারী কৃষি উৎপাদন ক্ষেত্রেও বাধার সম্মুখীন হন। কৃষক হিসেবে অস্পষ্ট ও দুর্বল পরিচয়ের কারণে রাষ্ট্রীয় কৃষি সেবা, কৃষক কার্ড, ভর্তুকি, প্রশিক্ষণ কিংবা সৃজনশীল উদ্যোক্তা তৈরিতে গ্রামীণ নারীকে বহু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিদিন কৃষিজমি হারানো ‘কৃষিপ্রধান’ দেশের হরদম চাপ সামলানো একজন গ্রামীণ নারীর কাছে এই দিবসের বার্তা খুব জরুরি না হলেও, গ্রামীণ নারীর আয়নায় কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থা দেখার দাবি এই দিবসের অঙ্গীকার হতে পারে। অদৃশ্য শ্রমিক নয়, গ্রামীণ নারীকে কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থার নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত দানকারী কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। একই সঙ্গে নারীর কৃষি জ্ঞান, বীজ সংরক্ষণ ও জলবায়ু অভিযোজনের চর্চা বিকাশে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা জোরদার করতে হবে। তবেই গ্রামীণ নারীর ‘অদৃশ্য শ্রম’ থেকেই গড়ে উঠবে জলবায়ু-সহিষ্ণু ভবিষ্যৎ খাদ্য ব্যবস্থার ভিত। লেখক : মুস্তাফিজুর রহমান রূপম: বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ভাবনা’র নির্বাহী প্রধান। সূত্র : বিডিনিউজ