প্রকাশ :: ... | ... | ...

মহেশখালী-মাতারবাড়ি: প্রতিশ্রুত শিল্পায়নের আলো কতদূর পৌঁছাচ্ছে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়?


সংযুক্ত ছবি

​গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লা ও এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বিশাল অর্থনৈতিক অঞ্চলের সমাহারে বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী মহেশখালী ও মাতারবাড়ি আজ দেশের সবচেয়ে আলোচিত অর্থনৈতিক কেন্দ্র। ​একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং তার সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মহেশখালী মাতারবাড়ী সফর কেবল একটি সাধারণ রাষ্ট্রীয় সফর নয়, বরং এটি দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মেগা প্রকল্পের প্রতি সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বহিঃপ্রকাশ। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে। এই ধরনের বৃহৎ প্রকল্পগুলোর কাজ নির্ধারিত সময়ে এবং সঠিকভাবে এগিয়ে চলছে কি না, তা স্বয়ং রাষ্ট্রপ্রধানের সরেজমিনে পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে গতিশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং সংশ্লিষ্ট মহলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদদের কাছে এই অঞ্চলটি ভবিষ্যতের ‘অর্থনৈতিক লাইফলাইন’ হিসেবে বিবেচিত হলেও, মেগা প্রকল্পের এই চকচকে প্রতিশ্রুতির আড়ালে স্থানীয় সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা ও বাস্তব চিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ​কাগজ-কলমে এবং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় মাতারবাড়িকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রধান বাণিজ্যিক ট্রানজিট হাব হিসেবে গড়ে তোলার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। তবে প্রশ্ন হলো—উন্নয়নের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সুফল স্থানীয় অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলতে পেরেছে? ​দৃশ্যমান অবকাঠামো ও বাণিজ্য সম্ভাবনা ​মাতারবাড়িতে ইতোমধ্যে গভীর সমুদ্রবন্দরের চ্যানেল তৈরির সুফল মিলতে শুরু করেছে। বড় জাহাজ বা মাদার ভেসেল সরাসরি ভিড়বার ফলে দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে নতুন দিগন্তের উন্মোচন হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখছে। উন্নত চারলেন সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপনের কাজ শেষের পথে থাকায় এই অঞ্চলটি ভবিষ্যতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠার অপেক্ষায় রয়েছে। ​মেগা প্রকল্প ঘিরে স্থানীয় যুবকদের বড় ধরনের কর্মসংস্থানের আশা জাগলেও বাস্তবে তার চিত্র কিছুটা ভিন্ন। প্রকল্প নির্মাণাধীন পর্যায়ে কিছু মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হলেও, দীর্ঘমেয়াদী ও কারিগরি পদগুলোতে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। কারিগরি শিক্ষার অভাবের কারণে অনেক ক্ষেত্রে বাইরের জেলা বা দেশ থেকে দক্ষ কর্মী আনতে হচ্ছে। ফলে স্থানীয় যুবসমাজের বড় একটি অংশ এখনো দিনমজুর কিংবা নিম্ন আয়ের কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ​জীবন-জীবিকা ও পরিবেশের ওপর চাপ ​মাতারবাড়ি ও মহেশখালীর ঐতিহ্যবাহী অর্থনীতি মূলত লবণ উৎপাদন, মৎস্য ও পান চাষের ওপর নির্ভরশীল। মেগা প্রকল্পের জন্য বড় পরিসরে ভূমি অধিগ্রহণ করায় ঐতিহ্যবাহী এই পেশাগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক প্রান্তিক পরিবার তাদের পৈত্রিক আয়ের উৎস হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। ​পাশাপাশি, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও ভারী যানবাহনের চলাচলের কারণে উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, জমির দাম বাড়লেও তার সুফল সাধারণ মানুষের চেয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে বেশি গেছে। ​উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় জিডিপি প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন না ঘটলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই স্থানীয় যুবকদের জন্য বিশেষ কারিগরি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন, ক্ষতিগ্রস্তদের সঠিক পুনর্বাসন এবং পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করে ভারসাম্যপূর্ণ শিল্পায়ন গড়ে তোলার জোরালো দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। ​কথার বড় বড় প্রতিশ্রুতি যেন শুধু মেগা প্রকল্পের সাইনবোর্ডে আটকে না থাকে, বরং মহেশখালী-মাতারবাড়ির প্রতিটি মানুষের ঘরে এর প্রকৃত সুফল পৌঁছে—এটাই এখন উপকূলবাসীর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।