৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু একটি সামরিক অভ্যুত্থান বা ক্ষমতার পালাবদলের দিন ছিল না; এই ঘটনার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ অবস্থান প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেশের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন শক্তির আবির্ভাব ঘটে। জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ ও আবু তাহেরকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ পরবর্তী কয়েক দশকের রাজনীতির গতিপথেও গভীর প্রভাব ফেলে। লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, ৭ নভেম্বরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনী একটি স্বতন্ত্র ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়, যাকে পরবর্তী সময়ে আর উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী কলামে মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ বুঝতে হলে এর পেছনের রাজনৈতিক ও সামরিক দ্বন্দ্বের শিকড় খুঁজতে হবে মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে। তাঁর বিশ্লেষণে, ওই দিনের মূল তিন চরিত্র ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান, চিফ অব জেনারেল স্টাফ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আবু তাহের। তাঁদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব শুধু ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল না; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্ন। মুক্তিযুদ্ধ থেকেই সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব মহিউদ্দিন আহমদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি বাঙালি সামরিক কর্মকর্তারাও প্রতিরোধযুদ্ধ সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আক্রমণের পর পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনী ও সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যরা প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পরে তাঁরা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়ে সেখান থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। ৪ ও ৫ এপ্রিল সিলেটের তেলিয়াপাড়ায় বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জিয়াউর রহমান, কে এম সফিউল্লাহ, খালেদ মোশাররফ ও রফিকুল ইসলামসহ কয়েকজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। কর্নেল এম এ জি ওসমানীও ওই বৈঠকে অংশ নেন। লেখকের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সংগঠিত হওয়ার আগেই সামরিক নেতৃত্ব সংগঠিত হয়েছিল। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের সহায়তায় বাঙালি সেনা কর্মকর্তারা সীমান্ত এলাকায় প্রতিরোধযুদ্ধ চালিয়ে যান। অন্যদিকে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদের বৈঠকের পর প্রবাসী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার প্রকাশ্যে আত্মপ্রকাশ করে। পরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগের নেতারা বৈঠকে বসেন। জুলাইয়ের শেষ দিকে কলকাতায় বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। লেখকের মতে, মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকার ও ভারতের মধ্যে যৌথ সামরিক কমান্ড গঠনের ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনী সরাসরি যুদ্ধে যুক্ত হয়। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনী যৌথ কমান্ডের অধিনায়কের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এ সময় ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তারা বেশি দৃশ্যমান থাকায় পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য দ্বন্দ্ব চলতে থাকে বলে মনে করেন মহিউদ্দিন আহমদ। তাঁর বিশ্লেষণে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের একাংশের ধারণা ছিল, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃত্বের মানসিকতা রয়ে গেছে। অন্যদিকে সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন ভারতে অবস্থান করে দলীয় বিরোধে ব্যস্ত ছিল, তখন তাঁরা সীমিত সামর্থ্য নিয়ে সরাসরি প্রতিরোধযুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। ফলে স্বাধীন দেশ পরিচালনায় সামরিক বাহিনীরও ভূমিকা থাকা উচিত বলে তাঁদের অনেকে মনে করতেন। ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান মহিউদ্দিন আহমদের মতে, স্বাধীনতার পর প্রত্যাশিত বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন, ব্যক্তিপূজার রাজনীতি, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, কালোবাজারি ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলে। এ পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের পতন ঘটে। লেখক মনে করেন, শেখ মুজিবুর রহমান নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পথ খোলা রাখেননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই একটি আধা সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে সামরিক বাহিনীর ভেতরে গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা অব্যাহত ছিল। ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া একটি গোষ্ঠীর বিপরীতে ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটে। এ সময় সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে অন্তরীণ করা হয়। লেখকের পর্যবেক্ষণ, দুই অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা পরস্পরের সহকর্মী ও বন্ধু ছিলেন। ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকারীদের নিরাপদে দেশত্যাগের সুযোগ দেওয়ার ঘটনাও পরবর্তী পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে। জাসদের বিপ্লবের পরিকল্পনা ও ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, ১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর জরুরি অবস্থা জারির পর দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়ে। এ সময় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) প্রচলিত বাম রাজনীতির বাইরে গিয়ে বিপ্লবের তত্ত্ব সামনে আনে। দলটির লক্ষ্য ছিল একটি ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান জনসমর্থন না পাওয়ার পর জাসদ নতুন অভ্যুত্থানের সিদ্ধান্ত নেয়। দলটির পক্ষ থেকে এ অভ্যুত্থান পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় আবু তাহেরকে। লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে শুরু হওয়া অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে খালেদ মোশাররফের পতন ঘটে এবং বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। সেনাবাহিনীর ভেতরে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে জিয়ার জনপ্রিয়তা ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে অভ্যুত্থানের পর জাসদের বিপ্লবী পরিকল্পনা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি। মহিউদ্দিন আহমদের মতে, আবু তাহের জিয়াউর রহমানকে সম্ভাব্য কৌশলগত মিত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারতেন। কিন্তু জিয়ার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ায় সেই সম্ভাবনা নষ্ট হয়। তাহেরের লক্ষ্য ও জাসদের রাজনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে জিয়ার অবস্থানের সংঘাত তৈরি হয়। পরে আরেকটি অভ্যুত্থানের চেষ্টা করতে গিয়ে তাহের ও তাঁর সহযোগীরা গ্রেপ্তার হন। দেশদ্রোহের অভিযোগে তাঁদের বিচার ও দণ্ড দেওয়া হয়। লেখকের মতে, এই ব্যর্থতার জন্য জাসদকে বড় রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়েছিল। জিয়ার উত্থান, সামরিক বাহিনীর ক্ষমতায়ন ৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন। চারদিকে তাঁর পক্ষে সমর্থন ও প্রশংসা তৈরি হয়। অন্যদিকে জাসদের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা বাড়তে থাকে। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে সামরিক বাহিনীর অবস্থানও বদলে যায় বলে মনে করেন মহিউদ্দিন আহমদ। তাঁর বিশ্লেষণে, ১৫ আগস্ট সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছেছিল, কিন্তু ৭ নভেম্বরের পর সামরিক নেতৃত্ব রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনী নতুন একটি ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সমাজের অন্যান্য অংশের মতো তারাও রাষ্ট্রক্ষমতায় নিজেদের অংশীদারত্বের দাবি প্রতিষ্ঠা করে। মহিউদ্দিন আহমদের মতে, ৭ নভেম্বরের পর থেকে সামরিক বাহিনী দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করেনি। বিভিন্ন সময়ে তারা নিজেদের রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলার দায়িত্বপ্রাপ্ত শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছে এবং ‘বিপথগামী রাজনীতিকদের’ শায়েস্তা করার ভূমিকাও নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে। লেখকের মূল্যায়নে, ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য কেবল জিয়াউর রহমানের উত্থান কিংবা আবু তাহেরের বিপ্লবী পরিকল্পনার ব্যর্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ দিনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের ভিত্তি তৈরি হয়। রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশ্ন পরবর্তী সময়ের রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সূত্র: মহিউদ্দিন আহমদ, ‘পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বর: যেভাবে রাজনীতির সমীকরণ পাল্টে দিয়েছিল’, প্রথম আলো, ৮ নভেম্বর ২০২৫। লেখকের মতামত ও মূল্যায়ন তাঁর নিজস্ব।