ঢাকা থেকে বরিশালের নৌপথের দূরত্ব প্রায় ১৪১ কিলোমিটার। এ পথে লঞ্চে যাতায়াতে ভাড়া প্রায় ৪০০ টাকা। অন্যদিকে, কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনের দূরত্ব প্রায় ৯৫ কিলোমিটার হলেও জাহাজে যেতে পর্যটককে গুনতে হচ্ছে প্রায় ৪ হাজার ২০০ টাকা। দুই নৌপথের দূরত্ব ও ভাড়ার এই ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পর্যটকেরা। তাঁদের অভিযোগ, সীমিত পরিবহনব্যবস্থা, ভাড়া নির্ধারণে স্বচ্ছতার অভাব এবং প্রতিযোগিতার ঘাটতির কারণে সেন্টমার্টিন ভ্রমণ ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য সেন্টমার্টিনের নীল জলরাশি, প্রবালসমৃদ্ধ পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকেরা ছুটে আসেন। কিন্তু দ্বীপে পৌঁছানোর পরিবহন ব্যয় অনেকের জন্যই বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে ভ্রমণ করতে গেলে যাওয়া-আসার জাহাজভাড়া, আবাসন, খাবার ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মোট ব্যয় অনেকের সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পর্যটকদের। ঢাকা–বরিশাল ও কক্সবাজার–সেন্টমার্টিন নৌপথের ভাড়ার তুলনা করে পর্যটকদের প্রশ্ন, অপেক্ষাকৃত কম দূরত্বের পথে এত বেশি ভাড়া নেওয়ার যৌক্তিকতা কী? তবে দুই রুটে ব্যবহৃত নৌযানের ধরন, যাত্রী ধারণক্ষমতা, জ্বালানি ব্যয়, পরিচালনব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রক শর্ত এক নয়। ফলে শুধু দূরত্বের ভিত্তিতে ভাড়ার যৌক্তিকতা নির্ধারণ করা যায় না। তবু ভাড়া কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, পরিচালন ব্যয়ের হিসাব কত এবং যাত্রীরা কী ধরনের সেবা পাচ্ছেন—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে বিতর্কের অবসানে সহায়তা হতে পারে। ঢাকা থেকে সেন্টমার্টিন ভ্রমণে আসা আবুল কাশেম চৌধুরী বলেন, এ রুটে পরিবহনের বিকল্প সীমিত থাকায় পর্যটকদের অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত ভাড়া মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। প্রতিযোগিতার অভাব কাজে লাগিয়ে কেউ অতিরিক্ত মুনাফা করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করেন তিনি। সেন্টমার্টিন রুটে জাহাজ চলাচল, ভাড়া নির্ধারণ ও টিকিট বিক্রির ব্যবস্থাপনা নিয়ে পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। পর্যটকদের অভিযোগ, ভ্রমণের মৌসুমে চাহিদা বাড়লে ব্যয়ের চাপ আরও বেড়ে যায়। তাঁদের মতে, ভাড়া নির্ধারণে স্বচ্ছতা এবং কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের জন্য সেন্টমার্টিন ভ্রমণ সহজ হবে না। তবে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত করার আগে ভাড়ার তালিকা, টিকিট বিক্রির তথ্য, পরিচালন ব্যয়ের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বা বাজার নিয়ন্ত্রণের কোনো অনিয়ম থাকলে তা শনাক্ত করা সম্ভব। কক্সবাজারের নাগরিক সংগঠন আমরা কক্সবাজারবাসীর সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দীন বলেন, কক্সবাজার দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। এর সঙ্গে সেন্টমার্টিনের পর্যটন যুক্ত হওয়ায় স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু যাতায়াত ব্যয় অতিরিক্ত হলে পর্যটকদের ভ্রমণের আগ্রহ কমতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে স্থানীয় পর্যটননির্ভর ব্যবসা ও কর্মজীবী মানুষের ওপরও। নাজিম উদ্দীন আরও বলেন, পর্যটনকে শুধু ব্যবসায়িক মুনাফার ক্ষেত্র হিসেবে দেখলে চলবে না। সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছ ভ্রমণব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি। জাহাজভাড়া নিয়ে অসন্তোষ অব্যাহত থাকলে কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন—বাপা কক্সবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, পর্যটনশিল্পের স্বার্থে জাহাজমালিক, পর্যটন ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দ্বীপের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় রেখে এমন পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে পরিচালন ব্যয় ও যৌক্তিক মুনাফার পাশাপাশি পর্যটকদের সামর্থ্য ও স্বার্থও গুরুত্ব পাবে। পর্যটকদের দাবি, সেন্টমার্টিন রুটে জাহাজভাড়া নির্ধারণের ভিত্তি ও পরিচালন ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি টিকিট বিক্রিতে নজরদারি বাড়ানো, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ তদন্ত এবং ভোক্তাদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে পর্যটকদের যেন অস্বাভাবিক পরিবহন ব্যয়ের মুখে পড়তে না হয়, সে জন্য স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে দ্বীপের পরিবেশ ও ধারণক্ষমতা রক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। পর্যটকের স্বার্থ, ব্যবসায়িক বাস্তবতা ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা গেলে সেন্টমার্টিনের পর্যটন আরও টেকসই হতে পারে।