প্রকাশ :: ... | ... | ...

ইলিশ ধরতে গিয়ে ‘নৌ-পুলিশের’ গুলিতে ঝাঁঝরা জেলের বুক, ঘটনাস্থলেই মৃত্যু


সংযুক্ত ছবি

বরিশালের হিজলায় মেঘনা নদীতে গুলিতে আকতার হোসেন হাওলাদার (৪০) নামে এক জেলে নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও চার জেলে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে দাবি করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। বৃহস্পতিবার ভোরে উপজেলার গৌরবদী ইউনিয়নের শাওড়া অরাকুল মাছঘাট-সংলগ্ন নদীতে এ ঘটনা ঘটে। মা ইলিশ রক্ষার অভিযানের সময় নৌ-পুলিশের সদস্যরা গুলি ছুড়েছেন বলে অভিযোগ উঠলেও সংশ্লিষ্ট নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের কর্মকর্তারা ওই এলাকায় অভিযান চালানোর কথা অস্বীকার করেছেন। নিহত আকতার হোসেন হাওলাদার হিজলা উপজেলার মেমানিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চর মেমানিয়া গ্রামের সুলতান হাওলাদারের ছেলে। বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তাঁর মরদেহ হিজলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শী জেলে আব্দুল ব্যাপারীর ভাষ্য, বুধবার রাতে মেঘনা নদীতে ইলিশ শিকারে যান কয়েকজন জেলে। মাছ ধরে ফেরার পথে বৃহস্পতিবার ভোরে শাওড়া অরাকুল মাছঘাট-সংলগ্ন এলাকায় তাঁদের আটক করা নিয়ে নৌ-পুলিশের সদস্যদের সঙ্গে বিরোধ হয়। একপর্যায়ে অভিযানকারী দলের সদস্যরা গুলি ছুড়লে আকতারসহ পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হন। পরে আকতারকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। আহত অন্য জেলেরা বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, মা ইলিশ রক্ষার অভিযানের সময় জেলেদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সংঘর্ষ হয় বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আত্মরক্ষার্থে ছোড়া গুলিতে আকতারের বুকে আঘাত লাগে এবং আরও চার জেলে গুলিবিদ্ধ হন। আকতারকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানান ওই কর্মকর্তা। পরে মরদেহ হিজলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাখা হয়। নিহত আকতারের বোন সাথী আক্তার আহত জেলেদের বরাত দিয়ে জানান, বুধবার রাতে তাঁর ভাই অন্য জেলেদের সঙ্গে মাছ ধরতে নদীতে গিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার ভোরে অরাকুল মাছঘাট-সংলগ্ন এলাকায় কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশের গুলিতে তিনি আহত হন বলে তাঁকে জানানো হয়েছে। প্রথমে হিজলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয় আকতারকে। পরে বরিশালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। সাথী আক্তার বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় অভিযোগ করার বিষয়ে তাঁরা আগ্রহী নন। তাঁর ভাষ্য, অভিযোগ করলে হয়রানি বাড়তে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা। তাঁরা ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফন করতে চান বলেও জানান তিনি। তবে ঘটনার সময় কোস্টগার্ডের কোনো অভিযান চলছিল না বলে জানিয়েছেন বাহিনীটির দক্ষিণ জোনের গণমাধ্যম শাখার দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা। বরিশাল অঞ্চলের নৌ-পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তাও তাঁদের কোনো অভিযান ছিল না বলে জানিয়েছেন। হিজলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কে এম মাহফুজুর রহমান বলেন, গুলিতে জেলে নিহত হওয়ার খবর তিনি বৃহস্পতিবার সকালে জানতে পেরেছেন। বুধবার রাতে তাঁদের কোনো দল মেঘনা নদীতে অভিযান চালায়নি। তাঁদের স্পিডবোট দুই দিন ধরে বিকল থাকায় ছোট ট্রলার দিয়ে সীমিত পরিসরে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছিল বলে জানান তিনি। তাঁর ধারণা, অন্য কোনো জেলার অভিযানকারী দল সেখানে থাকতে পারে। মেমানিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আফসার উদ্দিন বলেন, বৃহস্পতিবার ভোরে কয়েকজন জেলে তাঁকে নদীতে একজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকার খবর দেন। পরে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই জেলেকে উদ্ধার করেন এবং পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ এসে তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। তবে কে বা কারা গুলি করেছে, তা নিশ্চিত নন বলে জানান তিনি। হিজলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোলায়মান হোসেন বলেন, ঘটনাটি তদন্তাধীন। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। হিজলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইলিয়াস সিকদার জানান, বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি জেনেছেন, চাঁদপুর নৌ-পুলিশের গুলিতে এক জেলে নিহত হয়েছেন। তবে ঘটনার বিস্তারিত তাঁর জানা নেই। অন্যদিকে চাঁদপুর নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার মোশফিকুর রহমান দাবি করেছেন, বুধবার রাতে কিংবা বৃহস্পতিবার সকালে তাঁদের কোনো অভিযান ওই এলাকায় পরিচালিত হয়নি। এলাকাটি তাঁদের অধিক্ষেত্রের মধ্যেও পড়ে না বলে জানান তিনি। একদিকে প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের স্বজনদের বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলির অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো অভিযান চালানোর কথা অস্বীকার করেছে। ফলে গুলি ছোড়ার ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন, কী পরিস্থিতিতে গুলি চালানো হয়েছিল এবং জেলেদের আহত হওয়ার প্রকৃত কারণ কী—তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।