অবশেষে রংপুরের খালাশপীর কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলনের অপেক্ষার প্রহর গুনছে হোসাফ ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম। খনিটির ওপর সমীক্ষা করে ২০০৬ সালের আগস্টে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয় কনসোর্টিয়ামটি। ২০০৮ সালে পীরগঞ্জে এক নির্বাচনী জনসভায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়লা উত্তোলনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কয়লা উত্তোলনে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বর্তমানে বিএনপি সরকারের সময়ে সেই অপেক্ষার পালা শেষ হতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। কয়লা উত্তোলন হলে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, প্রায় একশ বছর আগে ভূ-বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে বড় আকারের কয়লার মজুত থাকার সম্ভাবনা নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সালে রংপুরের পীরগঞ্জের খালাশপীর বেসিনে কয়লার সন্ধান পাওয়া যায়। কয়লাক্ষেত্রটি রংপুর জেলা সদর থেকে ৩২ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পীরগঞ্জ সদর থেকে ১৩ কিলোমিটার পশ্চিমে মদনখালী ইউনিয়নের মাগুরা গ্রামে অবস্থিত। প্রায় সাড়ে ১২ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই খনিতে কয়লার আটটি স্তর ২২২ মিটার থেকে ৬০৭ মিটার গভীরতায় অবস্থিত। গড়ে ২৬৫ থেকে ৩৮৭ মিটার গভীরতায় কয়লা পাওয়া যায়। এখানে মোট ৪৫২ মিলিয়ন টন কয়লা মজুত রয়েছে। এর মধ্যে প্রমাণিত মজুত ২৭৭ মিলিয়ন টন এবং অতিরিক্ত আরও ১৭৫ মিলিয়ন টন মজুত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কয়লাখনি প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের দাবি, উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ পদ্ধতিতে বছরে ৩ থেকে ৫ মিলিয়ন টন করে ৫০ বছর পর্যন্ত কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব। খনি এলাকায় স্বল্প গভীরতায় ভেদ করে দুটি খাড়া শ্যাফট নির্মাণের মাধ্যমে ৬০ শতাংশের বেশি কয়লা উত্তোলন করা যাবে। এতে স্থানীয় বসতবাড়ির কোনো ক্ষতি হবে না বলেও দাবি করা হয়েছে। উত্তোলিত কয়লা দিয়ে ৬০০ থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। অতিরিক্ত কয়লা দেশের বড় কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও সরবরাহ করা যাবে। পাশাপাশি সৃষ্টি হবে বিপুল কর্মসংস্থান। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) ১৯৮৯-৯০ সালে খালাশপীর এলাকায় চারটি কূপ—জিডিএইচ-৪৫, জিডিএইচ-৪৬, জিডিএইচ-৪৭ ও জিডিএইচ-৪৮—খনন করে। এর মধ্যে প্রথম তিনটি কূপে কয়লা পাওয়া যায়। এর ওপর ভিত্তি করে জিএসবির প্রতিবেদনে খালাশপীর বেসিনের কয়লাকে উচ্চ শ্রেণির বিটুমিনাস গোত্রের এবং উত্তোলনযোগ্য হিসেবে সুপারিশ করা হয়। ২০০৪ সালে বাংলাদেশের খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ব্যুরো অব মিনারেল ডেভেলপমেন্ট থেকে হোসাফ কনসোর্টিয়ামকে খালাশপীরে ২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় কয়লাখনি সমীক্ষার লাইসেন্স দেওয়া হয়। হোসাফ কনসোর্টিয়াম বিভিন্ন জরিপের মাধ্যমে ১২ দশমিক ২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রথমে টপোগ্রাফিক্যাল সার্ভে করে। এর মাধ্যমে কয়লা বেসিনের উপরিভাগের অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা, উঁচু-নিচু ভূমি, গ্রাম ও শহরের অবস্থান এবং বিভিন্ন স্থাপনার অবস্থান নির্ণয় করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে দ্বি-মাত্রিক ও ত্রি-মাত্রিক হাই-রেজ্যুলেশন সিসমিক জরিপ করা হয়। এর মাধ্যমে কয়লা বেসিনের কয়লার স্তরগুলোর পুরুত্ব, গভীরতা, চ্যুতি এবং বেসিন ও কয়লার বিস্তৃতি সম্পর্কে ধারণা ও তথ্য পাওয়া যায়। তৃতীয় পর্যায়ে হোসাফ কনসোর্টিয়াম খনি এলাকায় ১৫টি জিটিবি সিরিজের অনুসন্ধান কূপ খনন করে। এ পদ্ধতিতে উত্তোলিত কয়লা ও শিলার নমুনা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পরীক্ষাগারে পাঠিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। খালাশপীরের কয়লাখনিতে ‘বিটুমিনাস’ নামে উচ্চ জ্বালানি ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লা রয়েছে। প্রতি পাউন্ড কয়লার জ্বালানি ক্ষমতা ১০ হাজার ৫০০ ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (বিটিইউ)। এতে ক্ষতিকর সালফারের উপস্থিতি মাত্র ১ শতাংশেরও কম। খনির একটি স্তরে ধাতু গলানোর কাজে ব্যবহৃত কোকিং কোল ও চুনাপাথর এবং কাঁচ বালিও রয়েছে, যেগুলো অনেক কয়লাখনিতে পাওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক বাজারে এসবের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সমীক্ষার প্রতিবেদন মূল্যায়নের জন্য ২০০৬ সালের আগস্টে হোসাফ কনসোর্টিয়াম সরকারের ব্যুরো অব মিনারেল ডেভেলপমেন্টে প্রতিবেদন জমা দেয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে খনিজ উন্নয়ন অধিদপ্তরকে সমীক্ষা প্রতিবেদনটি মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে পেট্রোবাংলার হাইড্রোকার্বন ইউনিটের মাধ্যমে আইএমসিএল নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে হোসাফের জমা দেওয়া স্টাডি রিপোর্ট মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আইএমসিএল মূল্যায়ন কাজ শেষ করে ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে হোসাফের জমা দেওয়া ফিজিবিলিটি রিপোর্ট যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে আরও কিছু কাজ করার সুপারিশ করা হয়। জানা যায়, ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে জাতীয় কয়লানীতি প্রণয়ন কমিটির ১৫ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল খালাশপীর কয়লাখনি পরিদর্শন করে। খনির সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শেষে তারা সন্তোষ প্রকাশ করে এবং উত্তোলন প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেয়। এরপর ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে হোসাফ কনসোর্টিয়ামের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন খনি এলাকা পরিদর্শন করেন। ওই সময় কয়লাখনির পরিদর্শন এলাকায় হাজারো মানুষ জড়ো হয়ে কয়লা উত্তোলনের দাবি জানান। সেদিন পরিদর্শনে আসা হোসাফ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন বলেছিলেন, পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করলে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না। তিনি বলেন, ২০০৬ সালে তাঁরা খনি সমীক্ষার প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দিয়েছেন। সরকার কয়লানীতি চূড়ান্ত করলে এ খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়াও আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। সম্ভাবনাময় এই কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলনে এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও আওয়ামী লীগ সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। তবে বর্তমানে বিএনপি সরকারের কাছে কয়লা উত্তোলনের জন্য কনসোর্টিয়াম আবেদন করে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে বলে জানা গেছে। এ সরকারের আমলে কয়লা উত্তোলনের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশা প্রকাশ করেছে। বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে বিদ্যুতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে গ্যাস প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় কয়লাকে অন্যতম প্রধান জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করা ছাড়া বিকল্প কম রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। খালাশপীর কয়লাখনির গুরুত্ব তুলে ধরে হোসাফ ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়ামের ভূ-তত্ত্ববিদ ও জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) অনুপ কুমার রায় বলেন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত দেশীয় প্রাকৃতিক কয়লা ছাড়া আপাতত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অন্য কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ বা জ্বালানির সহজলভ্যতা দেখা যাচ্ছে না। তাই প্রাপ্ত কয়লাক্ষেত্রগুলো থেকে দ্রুত কয়লা উত্তোলন করা প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে রংপুর অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে খালাশপীর কয়লাখনি বড় ধরনের সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। খনি থেকে কয়লা উত্তোলন শুরু হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে বলেও তাঁদের ধারণা। সব মিলিয়ে খনির কয়লা উত্তোলন শুরু হলে এ অঞ্চলের হাজারো বেকার মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে তাঁরা আশা করছেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, খালাশপীর কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলন করা হলে দেশের অর্থনীতির চেহারা পাল্টে যেতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি ও মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্প ছাড়া উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য খনিজ সম্পদ উত্তোলনে কোনো উদ্যোগ ও কার্যক্রম দৃশ্যমান হয়নি। তিনি বলেন, এখন খালাশপীরের কয়লা উত্তোলন করা হলে বিদ্যুতের ঘাটতি মোকাবিলার পাশাপাশি নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। এটি হলে এ অঞ্চলের শিল্পায়নে সহায়ক হবে। তবে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি না করে কয়লা উত্তোলনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজনে কয়লা উত্তোলনে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।