প্রকাশ :: ... | ... | ...

কক্সবাজারে ডুবে যাওয়া নৌযান নিউ জিল্যান্ডের পরিবারটির, সেখানে থাকতেন তারা


সংযুক্ত ছবি

‘আইল্যান্ড গার্ল’ নামের ওই নৌযানটি মহেশখালী চ্যানেলের মোহনায় সাগরে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বলে স্থানীয় জেলেরা জানিয়েছেন কক্সবাজারের নাজিরারটেক পয়েন্টের কাছে সাগরে বড় ঢেউ ও তীব্র স্রোতের মধ্যে পড়ে দুই টুকরো হয়ে ডুবে গেছে নিউজিল্যান্ডের একটি পরিবারের হাউসবোট। ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নামের নৌযানটিতে থাকা পরিবারের তিন সদস্যকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও ১৬ বছর বয়সী আলবার্ট নামের এক কিশোর এখনো নিখোঁজ। তাঁকে উদ্ধারে কোস্ট গার্ড ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা সাগরে তল্লাশি চালাচ্ছেন। মঙ্গলবার সকালে মহেশখালী চ্যানেলের মোহনা পেরিয়ে সাগরে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর নৌযানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বলে স্থানীয় জেলেরা জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, সাগরে ঢোকার পরপরই হঠাৎ বড় ঢেউ ও তীব্র স্রোতের মধ্যে পড়ে নৌযানটি। মুহূর্তের মধ্যে সেটি দুই ভাগ হয়ে যায় এবং নৌযানে থাকা চারজনই পানিতে পড়ে যান। স্থানীয় জেলে ও বাসিন্দারা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। কক্সবাজার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, জন এডওয়ার্ড নামের ৭৪ বছর বয়সী এক ব্যক্তি, তাঁর স্ত্রী বেলা (৩৬) এবং তাঁদের ১৩ বছর বয়সী ছেলে রালফকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তাঁদের আরেক ছেলে আলবার্টকে তখন থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পরে ফায়ার সার্ভিস ও কোস্ট গার্ডের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। উদ্ধার হওয়া তিনজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বর্তমানে কোস্ট গার্ডের হেফাজতে রাখা হয়েছে। কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করে। তবে সাগরে তল্লাশির জন্য ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব ডুবুরি দল না থাকায় উদ্ধার অভিযান কঠিন হয়ে পড়েছে। নিখোঁজ কিশোরকে উদ্ধারে কোস্ট গার্ড সদস্যরা সাগরের বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি চালাচ্ছেন। দুর্ঘটনার পর স্থানীয় আরও দুটি নৌযানের সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত ‘আইল্যান্ড গার্ল’কে উপকূলে ফিরিয়ে আনা হয়। পরে নৌযানটির ভাঙা অংশ ও বিভিন্ন সরঞ্জাম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। উদ্ধার হওয়া পরিবারের সদস্য রালফ সংবাদকর্মীদের জানিয়েছেন, ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য তাঁরা তাঁদের হাউসবোট ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নিয়ে সমুদ্রপথে চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিলেন। দুর্ঘটনার সময় তিনি ও তাঁর বাবা নৌযানের ডেকে ছিলেন। তাঁর মা ত্রিপলের ছাউনির নিচে ছিলেন এবং তাঁর ভাই আলবার্টকে লাইফ জ্যাকেট পরাচ্ছিলেন। রালফের বর্ণনা অনুযায়ী, হঠাৎ করেই নৌযানটি ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায়। তাঁর ধারণা, আলবার্টের লাইফ জ্যাকেটটি হয়তো ঠিকভাবে আটকানো ছিল না। এর ওপর আলবার্ট সাঁতারও জানত না। নৌযানটি ভেঙে যাওয়ার পর সে সাগরে পড়ে যায় এবং এরপর আর তাকে দেখা যায়নি। পরিবারটির কক্সবাজারে অবস্থানের বিষয়টিও দুর্ঘটনাটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। রালফ জানিয়েছেন, তাঁরা প্রায় আড়াই বছর ধরে কক্সবাজার ও এর আশপাশের এলাকায় অবস্থান করছেন। এই সময়ে তাঁদের হাউসবোটে করে সমুদ্র ও নদীপথে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। অর্থাৎ ‘আইল্যান্ড গার্ল’ শুধু তাঁদের যাতায়াতের নৌযান ছিল না; সেটিই ছিল পরিবারের বসবাস ও দীর্ঘ সময়ের ভ্রমণের অন্যতম মাধ্যম। পরিবারটির সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা নিজেরাই নৌযানটি তৈরি করেছিলেন। স্থানীয় নৌযান নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকেও এর নির্মাণ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় দিদারুল ইসলাম রুবেলের ভাষ্য, কক্সবাজার শহরের এস এম পাড়া ডকে নৌযানটি নির্মাণ করা হয়েছিল। আধুনিক নকশার এই হাউসবোট তৈরিতে এক কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছিল বলে নির্মাণশ্রমিকেরা জানিয়েছেন। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার কথা মাথায় রেখেই নৌযানটি তৈরি করা হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। এতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ফ্রিজ, রান্নাঘরসহ বসবাসের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সুবিধা ছিল। নৌযানটি নির্মাণে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল। ব্যক্তিগত সমুদ্রভ্রমণ ও অ্যাডভেঞ্চারের জন্য তৈরি হলেও পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘ সময় ধরে এটিতেই অবস্থান করছিলেন। স্থানীয় জেলেদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘আইল্যান্ড গার্ল’ দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীতে, নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটির বিপরীত পাশে নোঙর করে রাখা ছিল। সেখান থেকেই মঙ্গলবার পরিবারটি চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল। তবে নৌযানটি দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার উপযোগী করে তৈরি হওয়ার পরও কেন মহেশখালী চ্যানেলের মোহনা পেরোনোর পর এমন দুর্ঘটনায় পড়ল, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাগরের ঢেউ ও স্রোতের তীব্রতা, নৌযানের কাঠামোগত সক্ষমতা, আবহাওয়া ও সমুদ্রের পরিস্থিতি—সবকিছুই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কক্সবাজার মডেল থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার কারণ এবং নিউজিল্যান্ডের পরিবারটি ঠিক কতদিন ধরে কক্সবাজারে অবস্থান করছিল, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। নিখোঁজ আলবার্টকে উদ্ধারে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সাগরে তীব্র স্রোত থাকায় দুর্ঘটনাস্থলের পাশাপাশি আশপাশের বিস্তৃত এলাকায়ও তল্লাশি চালানো হচ্ছে। স্থানীয় জেলেদেরও এ কাজে সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের ভাসমান জীবনের অংশ হয়ে ওঠা ‘আইল্যান্ড গার্ল’ এখন কক্সবাজার উপকূলে ভেঙে পড়ে আছে। আর তার ধ্বংসাবশেষের মধ্যেই চলছে ১৬ বছর বয়সী আলবার্টকে খুঁজে পাওয়ার মরিয়া চেষ্টা। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ যেমন এখনো স্পষ্ট নয়, তেমনি নিখোঁজ কিশোরটির ভাগ্য নিয়েও অপেক্ষা করছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা ও উদ্ধারকারীরা।