প্রকাশ :: ... | ... | ...

কক্সবাজারে পানিবন্দি ৩ লাখের বেশি মানুষ, চলছে জেলা প্রশাসনের ত্রাণ বিতরণ


সংযুক্ত ছবি

টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, বন্যা ও পাহাড়ধসে কক্সবাজারে ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত সাত দিন ধরে জেলার প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন। জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনো বিস্তীর্ণ জনপদ পানির নিচে রয়েছে। সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, কৃষি ও স্বাভাবিক জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় পানিতে ডুবে ও পাহাড়ধসে অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে শিশু ও রোহিঙ্গাও রয়েছেন। শনিবার (১১ জুলাই) জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান চকরিয়া উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলার বেতুয়া বাজার স্টেশন, কোনাখালী ইউনিয়নের মরংগুনা এবং বন্যাদুর্গত পেকুয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে ত্রাণসামগ্রী, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও মোমবাতি বিতরণ করা হয়। পরিদর্শনকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) উপস্থিত ছিলেন। জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে ধীরে ধীরে পানি কমতে শুরু করলেও চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো জলাবদ্ধ রয়েছে। সর্বশেষ শুক্রবার চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে বসতঘর প্লাবিত হওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে ১২ বছর বয়সী হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা মারা যায়। এ ঘটনায় তার দুই বোনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এর আগে বন্যার পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু এবং পাহাড়ধসে একই পরিবারের আরও দুই শিশুর প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এছাড়া কক্সবাজার সদর, পেকুয়া ও উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে আরও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলা। এছাড়া কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাও এখনো পানির নিচে রয়েছে। কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম বলেন, বান্দরবান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। নদীর পানি কমতে শুরু করলেও নিম্নাঞ্চল থেকে পানি নামতে আরও সময় লাগবে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজাদ রহমান জানান, সরকারি হিসাবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন। তাদের মধ্যে ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ১৪ হাজার ৬১ জন। তবে স্থানীয় প্রশাসনের হিসাবে পানিবন্দি মানুষের প্রকৃত সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। তিনি জানান, দুর্গত মানুষের সহায়তায় সরকারিভাবে ২০০ টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু রয়েছে। এদিকে কক্সবাজারের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও সুশীল সমাজ জেলার চলমান পরিস্থিতিকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করে কক্সবাজারকে বন্যাদুর্গত এলাকা ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, এক সপ্তাহ ধরে লাখো মানুষ পানিবন্দি থাকলেও পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা এখনো পৌঁছায়নি। বন্যায় লবণচাষ ও কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং বহু মানুষ অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুল হান্নান জানান, গত ছয় দিনে জেলায় ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুই দিনও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং নতুন করে পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় এলাকার জন্য স্থানীয় সতর্ক সংকেত নম্বর-৩ বহাল রাখা হয়েছে। শু/আজা