কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার তালতলা উচ্চবিদ্যালয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ১২ জন শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়টিতে শিক্ষকও রয়েছেন ১২ জন। তবে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ জনের কেউই পাস করতে পারেনি। শুধু তালতলা উচ্চবিদ্যালয় নয়, জেলার আরও তিনটি বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীই এবার এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। বিদ্যালয়গুলো হলো—রাজারহাটের ব্রাহ্মণপাড়া উচ্চবিদ্যালয়, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পূর্ব কুমরপুর আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় এবং ভূরুঙ্গামারীর পাথরডুবি আদর্শ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়। সোমবার সকালে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বোর্ডের ১৮টি বিদ্যালয়ের শতভাগ পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। এর মধ্যে কুড়িগ্রামের চারটি বিদ্যালয় রয়েছে। তালতলা উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, দশম শ্রেণির একটি কক্ষে একা বসে আছে শিক্ষার্থী বাধন কুমার রায়। সে বলে, ‘আমাদের বিদ্যালয়ে শিক্ষকেরা নিয়মিত আসেন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা নিয়মিত আসে না। একসময় ক্লাসে শিক্ষার্থী ভরা থাকত। এখন কারও বিয়ে হয়ে গেছে, কেউ ঢাকায় কাজে গেছে। অন্যরাও স্কুলে আসতে চায় না।’ বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, তালতলা উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালে। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠানটি জুনিয়র পর্যায়ে এমপিওভুক্ত হয়। ২০২৪ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমতি পায়। এরপর এবারই প্রথম বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়টিতে প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রধান শিক্ষকসহ শিক্ষক রয়েছেন ১২ জন। আগামী বছর প্রায় ২৫ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও জমিদাতা অজয় কুমার সরকার বলেন, মেয়েদের বাল্যবিবাহ এবং ছেলেদের শ্রমে যুক্ত হওয়ার কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে। উপজেলা শহর থেকে বিদ্যালয়টি প্রায় চার কিলোমিটার দূরে হওয়ায় ভালো শিক্ষার্থীদের অনেকে শহরের বিদ্যালয়ে চলে যায়। এসব কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মানও ধরে রাখা যাচ্ছে না। রাজারহাটের ব্রাহ্মণপাড়া উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৭ সালে। ২০২২ সালে নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে এমপিওভুক্ত হয় প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৪ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমতি পায়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ১২৫ জন শিক্ষার্থী ও ৯ জন শিক্ষক রয়েছেন। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সফিকুল ইসলাম বলেন, মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পর পঞ্চম শ্রেণি থেকে উত্তীর্ণ পাঁচজন শিক্ষার্থীকে ভর্তি করানো হয়েছিল। তাদের একজন বিয়ে হওয়ায় পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। বাকি চারজন এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউ পাস করতে পারেনি। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতিও ভালো হয়নি। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পূর্ব কুমরপুর আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় মাত্র একজন শিক্ষার্থী। সেই শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। ভূরুঙ্গামারীর পাথরডুবি আদর্শ বালিকা উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৯ সালে। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটি মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমতি পায়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ২৪৫ জন শিক্ষার্থী এবং ১২ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। এবার চারজন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল হাশেম বলেন, ‘বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিন হলেও এখনো এমপিওভুক্ত হয়নি। আমরা বিনা বেতনে পাঠদান করছি। এ ছাড়া এটি বালিকা বিদ্যালয় হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী বাল্যবিবাহের শিকার হয়। ফলে তাদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যায়। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছি। এবার প্রথমবারের মতো ফলাফল বিপর্যয় হয়েছে। কীভাবে এই সংকট কাটানো যায়, তা নিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’ কুড়িগ্রাম জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, এ বছর জেলায় এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১৮ হাজার ৮৯৭ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাসের হার ৫৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ১৭৯ জন। তিনি আরও বলেন, ‘যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ শু/আজা