‘বড় সাজ্জাদ’ এর নামে চাঁদার ফোনে পাত্তা না দেওয়ায় চট্টগ্রামে মাইক্রোবাসে করে এসে একদল সন্ত্রাসী বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন এক ব্যবসায়ী। স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান বলছেন, শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে নগরীর চন্দনপুরা এলাকায় তার বাড়ি লক্ষ্য করে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি করা হয়।
মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের সদস্যরা সে সময় বাড়িতেই ছিলেন। তবে কেউ আহত হননি বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের দক্ষিণ জোনের উপ-কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূইয়া।
টেক্সটাইল, পোশাক, জ্বালানি খাতে ব্যবসা রয়েছে মুজিবুর রহমানের। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত মুজিবুর ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চেয়ে না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বলেন, “দুবাই থেকে ফোন করে সাজ্জাদ নামে একজন আমাদের পরিবারের ব্যবসায়ী গ্রুপ থেকে চাঁদা দাবি করেছিল। বিষয়টি আমি গুরুত্ব দিইনি। পরে কয়েকজন এসে সকালে বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে।”
নগর পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মাইক্রোবাসে করে আটজনের একটি দল এসে মুজিবুর রহমানের বাড়ির সামনে ও পেছনে গুলি করে যায়।
পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং আলামত উদ্ধার করেছেন। তবে শুক্রবার গভীর রাত পর্যন্ত মামলা হয়নি।
কে এই বড় সাজ্জাদ?
চালিতাতলী এলাকারই আব্দুল গণি কন্ট্রাক্টরের ছেলে সাজ্জাদের নাম আলোচনায় আসে গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে। তখন ইসলামী ছাত্র শিবিরের ‘ক্যাডার’ হিসেবে পরিচিত এই যুবক খুনসহ অনেক মামলার আসামি হন।
১৯৯৯ সালে পাঁচলাইশের তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান বাড়ির সামনে খুন হয়। ওই সময় লিয়াকত হত্যায় সাজ্জাদের নাম উঠে আসে। কিন্তু সাক্ষীর অভাবে ওই মামলা থেকে খালাস পেয়ে যান তিনি। এরপর থেকে অপরাধ জগতে ছড়িয়ে যায় তার নাম।
২০০০ সালের ১২ জুলাই চট্টগ্রামে আট ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী হত্যায় নিম্ন আদালতে সাজ্জাদের ফাঁসির রায় হয়েছিল। পরে উচ্চ আদালত থেকে এ মামলায় খালাস পান তিনি।
২০০০ সালে একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হওয়ার পরে জামিনে ছাড়া পেয়ে সাজ্জাদ দুবাই পালিয়ে যান বলে গুঞ্জন আছে। তাকে ধরতে ইন্টারপোলে ‘রেড নোটিস’ এখনও ঝুলছে, যেখানে তার নাম লেখা- সাজ্জাদ হোসেন খান।
চট্টগ্রামে থাকাকালে নুরুন্নবী ম্যাক্সন ও সরোয়ার হোসেন বাবলাকে নিয়ে অপরাধ জগৎ দাপিয়ে বেড়াতেন সাজ্জাদ।
২০১১ সালের জুলাইয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিঙ্গারবিল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন ম্যাক্সন। তার দেওয়া তথ্যে চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকা থেকে সরোয়ারকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।
তখন সরোয়ার ও ম্যাক্সনের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় একটি একে-৪৭ রাইফেল, দুটি পিস্তল, একটি এলজি, একে-৪৭ রাইফেলের দুটি ম্যাগাজিন ও গুলি।
কারাগারে থাকাকালে সরোয়ার ও ম্যাক্সনের সঙ্গে সাজ্জাদের বিরোধ বাঁধে বলে প্রচার আছে। ২০১৭ সালে জামিনে ছাড়া পেয়ে কাতারে চলে যান সরোয়ার ও ম্যাক্সন।
প্রায় তিন বছর কাতারে ছিলেন সরোয়ার। আর ম্যাক্সন সেখান থেকে ভারতে পালিয়ে যান। কাতারে মারামারির এক ঘটনায় পুলিশ সরোয়ারকে আটক করে এক মাসের সাজা দেয়। সাজা শেষে সরোয়ারকে তারা দেশে পাঠিয়ে দিলে ২০২০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিমানবন্দরে পুলিশ তাকে আটক করে।
বিয়ে করে ভারতে স্থায়ী হওয়া ম্যাক্সন ২০২২ সালে সেখানে মারা যায়। তার পরিবার বাংলাদেশের পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছিল তার স্ত্রী তাকে খুন করে ‘আত্মহত্যা’ বলে প্রচার করেছে।
সরোয়ার ও ম্যাক্সন দল থেকে সরে যাওয়ার পরও সাজ্জাদ বিদেশে বসে চট্টগ্রামে বিভিন্ন সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে দল চালানো ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে বলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য আছে।
গত বছর নভেম্বরে বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিতাতলী খোন্দকীয়া পাড়ায় জনসংযোগ করছিলেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ। এসময় গুলিতে নিহত হন পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সরোয়ার; আহত হন এরশাদ উল্লাহসহ চারজন। ওই ঘটনায় সরোয়ারের বাবার করা মামলায় বড় সাজ্জাদকে এক নম্বর আসামি করা হয়।