প্রকাশ :: ... | ... | ...

মির্জা ফখরুল: দুর্দিনে বিএনপির কান্ডারি তৃণমূলের রাজনীতি থেকে বঙ্গভবনের পথে


সংযুক্ত ছবি

ছাত্ররাজনীতি দিয়ে শুরু। এরপর শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব—দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দলীয় মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন মির্জা ফখরুল। পরে তাঁর পক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্রও নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। বিএনপির এই মনোনয়ন কার্যত মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ২০ আগস্টের নির্বাচনে তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়াটাই এখন প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে। ছাত্ররাজনীতি থেকে পথচলা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায়। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী, সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। মা মির্জা ফাতেমা আমিন। ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন মির্জা ফখরুল। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়াশোনা করেন এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এবং এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হন তিনি। শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষে মির্জা ফখরুল শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। ঢাকা কলেজ ও ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতি পড়িয়েছেন তিনি। পরে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেন তিনি। পৌর চেয়ারম্যান থেকে সংসদ সদস্য ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। ১৯৯২ সালে তাঁকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। দলের সাংগঠনিক বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে তিনি জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসেন। বিএনপির কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপি সরকারের সময়ে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন তিনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে জয়ী হলেও নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ তুলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। বিএনপির মহাসচিব বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্বে মির্জা ফখরুলের উত্থান আরও দৃশ্যমান হয় ২০০৯ সালের জাতীয় কাউন্সিলের পর। তাঁকে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব করা হয়। ২০১১ সালের মার্চে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। এরপর ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নির্বাচিত হন। দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সামনে থেকে দলের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতার সময় এবং তারেক রহমানের দেশের বাইরে অবস্থানের সময়ে দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মির্জা ফখরুল। রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তাঁকে একাধিকবার কারাগারেও যেতে হয়েছে। দলের নেতাদের কাছে তাঁর অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য ছিল বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে সংগঠনকে ধরে রাখা। দীর্ঘদিন বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি দলের রাজনৈতিক বক্তব্যের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। এবার রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপি সরকার গঠনের পর মির্জা ফখরুল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করছিলেন। এবার রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হওয়ার পর তাঁকে মহাসচিবের দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছে। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম প্রস্তাব করেন। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা সেই প্রস্তাব অনুমোদন করেন। এরপর বিএনপির পক্ষ থেকে তাঁর মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়। মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নরসিংদী-২ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মঈন খান। একই দিনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মনোনয়নপত্রও জমা পড়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে। তফসিল অনুযায়ী, ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে। ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। ভোট হবে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায় মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একসময় ছাত্র ইউনিয়নের নেতা হিসেবে রাজনীতিতে যাত্রা শুরু করা এই রাজনীতিক শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির পথ পেরিয়ে তৃণমূলের জনপ্রতিনিধি হয়েছেন। এরপর সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। এবার সেই পথ তাঁকে নিয়ে যাচ্ছে বঙ্গভবনের দিকে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তাঁর মনোনয়ন বৈধ হলে এবং ভোটের ফল প্রত্যাশিত থাকলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইসলাম আলমগীর হবেন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। তাঁর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আরোহণ হবে পাঁচ দশকের বেশি সময়ের রাজনৈতিক পথচলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পারিবারিক ও ব্যক্তি জীবন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম, যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন, বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊধর্বতন কর্মকর্তা হিসেবে অবসরে গেছেন। দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ মির্জা ও মির্জা সাফারুহকে নিয়ে তাদের সংসার। বড়মেয়ে শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন এবং এ প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি। তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যানও ছিলেন। তাদের চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার। তিনি জিয়াউর রহমানের সরকারে ভূমিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন প্রথম সরকারে তিনি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন। মির্জা হাফিজ ১৯৭৯ সালে ঢাকার একটি নির্বাচনি এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মির্জা আলমগীরের আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ১৯৭১ সালের এপ্রিলে গঠিত মুজিবনগর সরকারে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ সুবিধা তদারকির জন্য নবগঠিত যুব শিবির অধিদপ্তরের প্রধান হিসেবে তাকে মনোনীত করা হয়েছিল।