প্রকাশ :: ... | ... | ...

নিজের বাড়িতে হামলার মামলা করে উল্টো সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় কারাগারে বৃদ্ধা


সংযুক্ত ছবি

কুষ্টিয়ায় আওয়ামী লীগ নেতার মা নূরজাহানকে কৃষকদল কার্যালয় ভাঙচুর মামলায় গ্রেপ্তার; পুলিশ বলছে, তদন্তে সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে নিজের বাড়ি ও পাটের গোডাউনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে মামলা করতে গিয়ে উল্টো অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেছেন কুষ্টিয়ার এক বৃদ্ধা। তাঁর ছেলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন। অভিযোগ, জমি ও সামাজিক বিরোধের জেরে তাঁদের বাড়িতে হামলার পর থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। পরে আদালতে মামলা করার কয়েক দিনের মধ্যে তাঁকে থানায় ডেকে নিয়ে কৃষকদল কার্যালয় ভাঙচুরের মামলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ঘটনাটি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের নলকুলা গ্রামের। গ্রেপ্তার নূরজাহান বেগম ওই গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর ছেলে রুহুল আমিন পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সহসভাপতি ছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত। তিনি বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। পুলিশের ভাষ্য, ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে নলকুলা গ্রামের কৃষকদল কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও সেখানে থাকা নেতা-কর্মীদের মারধরের ঘটনায় করা মামলার তদন্তে নূরজাহান বেগমের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। সেই মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। তবে নূরজাহানের পরিবারের অভিযোগ, কৃষকদল কার্যালয় ভাঙচুরের মামলায় তাঁর নামই ছিল না। বরং নিজেদের বাড়ি ও পাটের গোডাউনে হামলা-অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মামলা করার পর তাঁকে পুলিশ বাড়ি থেকে থানায় নিয়ে যায় এবং পরে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়। ### বাড়িতে হামলার পর থানায় মামলা হয়নি নূরজাহানের মেয়ে নাসিমা খাতুন ও সেলিনা খাতুনের অভিযোগ, গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে স্থানীয় বিরোধের জেরে শতাধিক লোক তাঁদের বাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা রুহুল আমিনের নাম ধরে ডাকাডাকি করে। রুহুল আমিন বের হলে তাঁকে মারধরের চেষ্টা করা হয়। পরে তিনি প্রাণ বাঁচাতে পাটের গোডাউনে আশ্রয় নেন। সেখানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে পরিবারের দাবি। হামলার ঘটনায় পরিবারের কয়েকজন আহত হন বলেও তাঁরা জানান। পরদিন নূরজাহান বেগম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় গিয়ে মামলা করার চেষ্টা করেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ তখন মামলা নেয়নি। পরে ২১ সেপ্টেম্বর আদালতে মামলা করেন তিনি। এরপর গত ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে পুলিশ নূরজাহানকে বাড়ি থেকে থানায় নিয়ে যায়। পরিবারের সদস্যদের বলা হয়েছিল, ওসি তাঁর সঙ্গে কথা বলবেন। দিনভর থানায় রাখার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পরিবারকে জানানো হয়। নূরজাহানের মেয়ে সেলিনা খাতুন বলেন, ‘সকালে পুলিশ এসে মাকে বলেছে, ওসি কথা বলবেন, থানায় যেতে হবে। দুপুরেও যখন মাকে ছেড়ে দেওয়া হয়নি, তখন আমরা কারণ জানতে চাই। পরে পুলিশ জানায়, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আদালতে পাঠানো হবে।’ পরিবারের অভিযোগ, ছেলে রুহুল আমিনের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাঁর বৃদ্ধ মাকে হয়রানি করা হচ্ছে। রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে করা মামলার কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি—বরং কৃষকদল কার্যালয় ভাঙচুরের মামলায় তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশের বক্তব্য। যে মামলায় গ্রেপ্তার পুলিশ ও মামলার নথি অনুযায়ী, ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পর নলকুলা গ্রামের ১ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত কৃষকদলের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং সেখানে থাকা নেতা-কর্মীদের মারধরের অভিযোগে ১৬ সেপ্টেম্বর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় মামলা হয়। মামলায় ৭৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আরও ১০০ থেকে ১২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি করেন হাবিবুর রহমান। স্থানীয়ভাবে তিনি কৃষকদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে পরিচিত হলেও তাঁর নির্দিষ্ট সাংগঠনিক পদ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশের দাবি, মামলাটির তদন্তে নূরজাহান বেগমের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাঁকে হামলাকারীদের কৃষকদল কার্যালয়ে ভাঙচুরের জন্য জিনিসপত্র সরবরাহ করে সহযোগিতা করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মামুনুর রশীদ বলেন, কৃষকদল কার্যালয় ভাঙচুর ও সেখানে থাকা নেতা-কর্মীদের মারধরের ঘটনায় করা মামলার তদন্তে নূরজাহান বেগমের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এ কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। একই দিনে দুই পক্ষের দুই অভিযোগ ঘটনাটির জটিলতা তৈরি হয়েছে ১৫ সেপ্টেম্বরের ঘটনাকে ঘিরেই। পরিবারের অভিযোগ, ওই রাতে তাঁদের বাড়ি ও গোডাউনে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে পুলিশ যে মামলায় নূরজাহানকে গ্রেপ্তার করেছে, সেই মামলাতেও ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে কৃষকদল কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, দুটি ঘটনার পেছনেই স্থানীয় সামাজিক ও জমি-জমা নিয়ে বিরোধ কাজ করছে। কৃষকদল কার্যালয়ের মামলার বাদী হাবিবুর রহমানের সঙ্গে রুহুল আমিনের পরিবারের জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে বলেও তাঁরা দাবি করেছেন। তবে এই বিরোধের সঙ্গে কৃষকদল কার্যালয়ে হামলার মামলার সম্পর্ক বা নূরজাহানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ছেলেকে না পেয়ে মাকে গ্রেপ্তারের অভিযোগ রুহুল আমিন বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। পরিবারের দাবি, তাঁকে খুঁজতে গিয়ে পুলিশ তাঁর মাকে গ্রেপ্তার করেছে। রুহুল আমিনের বক্তব্যও বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে। তিনি নিজেকে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন দাবি করে বলেছেন, তাঁকে ‘যুবলীগ ট্যাগ’ দিয়ে মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। তাঁর বাড়ি ও গোডাউনে আগুন দেওয়া হয়েছে এবং তিনি পালিয়ে আছেন বলেও দাবি করেছেন। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক পরিচয় ও সংগঠনের পদ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁকে পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সহসভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে তাঁর নিজের বক্তব্যের সঙ্গে স্থানীয় পরিচিতির পার্থক্যও রয়েছে। মামলা নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন নূরজাহানের পরিবার যে অভিযোগটি সবচেয়ে জোর দিয়ে করছে, তা হলো—নিজেদের বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তিনি থানায় মামলা করতে গেলেও তা নেওয়া হয়নি। পরে আদালতে মামলা করার পরই তাঁকে থানায় ডেকে এনে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নূরজাহানের মামলা থানায় কেন নেওয়া হয়নি, এ বিষয়ে পুলিশের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। সমকালকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ওসি নূরজাহানের বিরুদ্ধে কৃষকদল কার্যালয় ভাঙচুরে সম্পৃক্ততার কথা বলেছেন; তবে তাঁর করা মামলা থানায় না নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি এড়িয়ে যান। অন্যদিকে পুলিশের দাবি, নূরজাহানকে কেবল তাঁর ছেলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত—এই পরিচয়ের কারণে গ্রেপ্তার করা হয়নি; বরং তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে কৃষকদল কার্যালয়ে হামলায় সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কারণেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফলে এখন মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে কৃষকদল কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় কী ধরনের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং নিজের বাড়িতে হামলার ঘটনায় করা তাঁর মামলার সঙ্গে তাঁর গ্রেপ্তারের সময়গত সম্পর্ক কী। আদালতে মামলাটির পরবর্তী কার্যক্রম এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যই এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।