ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই এবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের নবীনবরণ উপলক্ষে আয়োজিতব্য কনসার্ট বন্ধের দাবি জানিয়েছে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ। শুক্রবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম সিরাজের কাছে পৃথক স্মারকলিপি দিয়ে এ দাবি জানায় সংগঠনটি। স্মারকলিপিতে বলা হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ঐতিহাসিকভাবে ইসলাম, ইলম, আলেম-ওলামা ও ধর্মীয় মূল্যবোধে সমৃদ্ধ একটি জনপদ। জেলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এমন প্রেক্ষাপটে জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর নবীনবরণ উপলক্ষে গানের কনসার্ট আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছে। কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ বলেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নবীনদের বরণ আনন্দঘন ও উৎসবমুখর হতে পারে। তবে সেই আয়োজন যেন শিক্ষার পরিবেশ, সামাজিক শৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা এবং স্থানীয় ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, সেটি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, অতীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিভিন্ন কনসার্ট ও গানের অনুষ্ঠানে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। ফলে এ ধরনের আয়োজনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করা উচিত নয়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ১৪ সেপ্টেম্বরের কনসার্ট বন্ধের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের সদস্য ফুজায়েল আহমেদ খান বলেন, তাদের মূল দাবিগুলো স্মারকলিপিতে তুলে ধরা হয়েছে। সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি কনসার্টকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে ৩০ জন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঘটনার এক মাস না যেতেই আবার কনসার্ট আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফুজায়েল আহমেদ খান বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা বন্ধের মতো কথা বলেছেন। যে ঘটনায় ৩০ জন ছাত্র আহত হয়েছিল, সেটিও কনসার্টকে কেন্দ্র করেই। এক মাসও যায়নি, এর মধ্যেই আবার কনসার্ট করতে চাচ্ছে। তাহলে বিষয়টি কাটা গায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার মতো হয়ে গেল।’ তিনি আরও বলেন, ‘৮ থেকে ৯ বছর আগেই এই নবীনবরণ কনসার্ট বন্ধ হয়েছিল। তখন নাচ-গানের মধ্যে এক মেয়ে ইভটিজিংয়ের শিকার হওয়ার অভিযোগ ওঠায় কনসার্ট বন্ধ করা হয়েছিল। যে কারণে এটি বন্ধ হয়েছিল, কলেজ কর্তৃপক্ষ কি আবার সেই পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়? তারা কি চায় ছাত্রীরা সেখানে ইভটিজিংয়ের শিকার হোক?’ তবে কনসার্ট আয়োজনের বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ কর্তৃপক্ষ। কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ওবায়াদুল হক বলেন, কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে সংসদ সদস্য ও জেলা পরিষদের প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার বিষয়টি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জানেন না। সংগঠনটির কেউ কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে আসেনি বলেও জানান তিনি। অধ্যক্ষ বলেন, ‘তাঁরা আমাদের কাছে আসেননি। যদি আমাদের জানান এবং পরামর্শ দেন, তাহলে আমরা বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেব। আর এটা ওভাবে কনসার্ট নয়, আমরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করব।’ তিনি বলেন, নবীনবরণ উপলক্ষে কলেজের তিনটি কর্মসূচি রয়েছে—নবীনবরণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বৃক্ষরোপণ। এদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গানবাজনাকে কেন্দ্র করে একাধিক ঘটনা আলোচনায় এসেছে। গত ৩০ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে জেলা শহরের অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়েছিল। কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের বাধার মুখে শেষ পর্যন্ত প্রদর্শনীটি বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এরপর গত ১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইনে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজির আগমন উপলক্ষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দেখা দেয়। উচ্চ শব্দে গানবাজনা নিয়ে পাশের জামিয়া দারুল আরকাম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এতে মাদ্রাসার ৩০ জন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকজন পুলিশ সদস্যও আহত হন। ঘটনার রাতেই জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম সিরাজের উদ্যোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসায় একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জেলা পুলিশ সুপার দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতির সমাধান হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। সাম্প্রতিক এসব ঘটনার পর নতুন করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি জানানোয় বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ এটিকে কনসার্ট না বলে নবীনবরণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেছে। এ বিষয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম সিরাজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘একটি অনুষ্ঠানে আছি, পরে কথা বলব।’