নদী মানেই পানি আর পানি। যেদিকে তাকাবেন, সেদিকেই শুধু পানি—যেন এক অজানা পথ। নদীর সেই পানি ছিল জীবিকার উৎস। একসময় যে নদী ছিল মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন, সেই নদীর বুকেই এখন গড়ে উঠেছে দোকানপাট, স্থাপনা কিংবা চাষের জমি। কোথাও নদী পরিণত হয়েছে সরু খালে, কোথাও ড্রেনে। আবার কোথাও হারিয়ে গেছে নদীর চিহ্নই। দখল, ভরাট, অবৈধ স্থাপনা, পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় রংপুর বিভাগের বহু নদ-নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় নদী ও জলাভূমির স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সুস্থ নদী অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন, বন্যার চাপ মোকাবিলা এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। রংপুর বিভাগের নদ-নদীগুলো এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অবহেলা আরও দীর্ঘ হলে অনেক নদীর স্বাভাবিক অস্তিত্ব ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। সরকারি নথি, নদীর পুরোনো মানচিত্র, স্যাটেলাইট তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা মিলিয়ে প্রতিটি নদীর সীমানা নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে নদীর জমি দখল, ভরাট ও অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় স্থানে খনন এবং পানিপ্রবাহের প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। নদী রক্ষায় শুধু প্রকল্প গ্রহণ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নিয়মিত তদারকি। বাংলাদেশের নদী ও জলাভূমির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও নদীর প্রবাহের পরিবর্তন ভবিষ্যতে বিভিন্ন অঞ্চলের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে ২০৫০ সালের মধ্যে পুরো বাংলাদেশ তলিয়ে যাবে—এ ধরনের নির্দিষ্ট দাবি আন্তর্জাতিক জলবায়ু মূল্যায়নে প্রতিষ্ঠিত পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচিত নয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আমিনুল ইসলাম বলেন, নদী রক্ষায় সরকারকে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে আসতে হবে। নদীর সীমানা নির্ধারণ, দখলমুক্তকরণ এবং পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। নদী বাঁচলে কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের পরিচয় শুধু বইয়ের পাতায় নয়, বাস্তবেও ধরে রাখতে হবে। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, রংপুর বিভাগের আট জেলায় তিন শতাধিক নদ-নদীর তথ্য বিভিন্ন সরকারি ও স্থানীয় তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে রংপুর জেলায় ৪৩টি, লালমনিরহাটে ২৫টি এবং কুড়িগ্রামে অর্ধশতাধিক নদ-নদীর উল্লেখ রয়েছে। তিস্তা, ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, করতোয়া, আত্রাই ও ইছামতীর পাশাপাশি মানস, টেপা, ধাইজান, বুলাই, আঁখিরা ও ফুলকুমারসহ অসংখ্য ছোট নদী ও শাখানদী ছড়িয়ে আছে এ অঞ্চলে। তবে তালিকায় নদী থাকলেও বাস্তবে অনেক নদীর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোথাও নদীর গতিপথ সংকুচিত হয়েছে, কোথাও নাব্যতা হারিয়েছে। আবার কোথাও নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ কিংবা চাষাবাদ করা হচ্ছে। ফলে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জলাবদ্ধতা, কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড দেশের নদ-নদীর সংখ্যা নির্ধারণ ও তালিকা হালনাগাদের অংশ হিসেবে বিভাগীয় পর্যায় থেকে পাওয়া তথ্য পুনঃযাচাই করে খসড়া তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে কোন নদী কোথায়, তার সঠিক সীমানা কতটুকু এবং মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব অবস্থা কী—এসব বিষয় নতুন করে সামনে আসছে। রংপুর অঞ্চলের প্রধান নদী তিস্তা। এ নদীকে ঘিরে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ঘাঘট নদী রংপুর শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পানি নিষ্কাশন ও কৃষিতে ভূমিকা রাখছে। যমুনেশ্বরী বদরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত। করতোয়া উত্তরবঙ্গের প্রাচীন নদীগুলোর একটি। তবে এসব নদীর বিভিন্ন অংশে পানিপ্রবাহ ও নাব্যতা কমে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে অনেক স্থানে নদীর বুক জেগে ওঠে। কোথাও কোথাও সেই জেগে ওঠা ভূমি ধীরে ধীরে স্থায়ী দখলের দিকে চলে যায়। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও সীমানা আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। লালমনিরহাটের সতী নদীর অবস্থাও উদ্বেগজনক। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় প্রশস্ত থাকা নদীটির কোনো কোনো অংশ এখন কয়েক ফুটে সংকুচিত হয়েছে। নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, পুকুর খনন এবং কচুরিপানার আধিক্যের কারণে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু সতী নদী নয়, সীমান্তবর্তী খর্প, কচুয়া, শালমারা ও সংলগ্ন নদীগুলোর অস্তিত্বও সংকটে রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। নদ-নদী রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের মতে, নদীর সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, দখলকৃত জায়গা পুনরুদ্ধার, প্রয়োজনীয় স্থানে খনন এবং পানিপ্রবাহের প্রতিবন্ধকতা দূর করার পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি জরুরি। নদীকে স্বাভাবিক প্রবাহে ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও প্রয়োজন।