কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ধ্বংস করে কোটি টাকা ব্যয়ে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় পরিবেশবাদী মহল থেকে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। তারা অবিলম্বে এই ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম বন্ধ করে প্রকৃতি রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সৈকতের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সুরক্ষা বেষ্টনী হিসেবে পরিচিত বালিয়াড়ি কেটে ভারী যন্ত্রপাতির মাধ্যমে রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে। এতে সৈকতের স্বাভাবিক রূপরেখা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সামুদ্রিক পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। পরিবেশবাদীরা অভিযোগ করেছেন, যথাযথ পরিবেশগত ছাড়পত্র বা সমীক্ষা ছাড়াই এমন ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তারা দ্রুত এই নির্মাণ কাজ বন্ধ করে বালিয়াড়ি রক্ষার দাবি জানিয়েছেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ধ্বংস করে কোটি টাকা ব্যয়ে রাস্তা নির্মাণ আমাদের হতাশ করেছে। এমন ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। অবিলম্বে এই ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম বন্ধ করে প্রকৃতি রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। দরিদ্র রক্ষায় আমরা - ধরা পরিবেশ সংগঠন কক্সবাজার জেলা কমিটির সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, "কক্সবাজারের সৈকত কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এই সৈকত আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ, দেশের পর্যটন সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আমানত। উন্নয়নের নামে কিংবা প্রভাবশালীদের স্বার্থে এই প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করার অধিকার কারও নেই।" তিনি আরও বলেন, যথাযথ পরিবেশগত নিয়ম ও আইন অমান্য করে বালিয়াড়ির ওপর এই ধরনের অপরিকল্পিত স্থাপনা বা রাস্তা নির্মাণ উপকূলীয় পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে। অবিলম্বে এই অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ না হলে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। পরিবেশবাদীরা দ্রুত এই নির্মাণ কাজ বন্ধ করে বালিয়াড়ি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে জোর দাবি জানিয়েছেন। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, 'সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে সড়ক নির্মাণের বিষয়টি শুনেছি। বিষয়টি সরেজমিন পরিদর্শন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।' কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ)। ইসিএ এলাকা হিসেবে এ জায়গায় যে কোনো ধরনের কাজ করতে গেলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কেউ ছাড়পত্র নেননি। কক্সবাজারভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) চেয়ারম্যান মুজিবুল হক বলেন, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ডসহ বিশ্বের বেশ কিছু উন্নত দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপকুলীয় ক্ষয়রোধ করতে প্রাকৃতিক উপায়ে সৈকতে বালুর ডেইল সৃষ্টি করতে কোটি কোটি টাকা খরচ করছে। এমনকি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের ভাঙন রোধ এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এ ডেইল সৃষ্টি করা হয়েছে। অথচ পাশেই বিকল্প জায়গা থাকার পরও সৈকতে সড়ক নির্মাণের নামে এ ডেইলগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে। দাতা দেশগুলো বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নেবে না। নির্মাণকাজ শিগগির বন্ধ করা প্রয়োজন। আমরা কক্সবাজারবাসি নাগরিক সংগঠনের কক্সবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দীন বলেন, কক্সবাজার সৈকতে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ না করা এবং স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে নির্মিত সব স্থাপনা ভেঙে ফেলার বিষয়ে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এ ছাড়া ২০১৩ সালে কক্সবাজারে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে সরকার। এ মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী কক্সবাজার পৌরসভা এলাকার জোয়ার-ভাটার মধ্যবর্তী লাইন থেকে সৈকতসংলগ্ন প্রথম ৩০০ মিটার 'নো ডেভেলপমেন্ট জোন' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই জোনে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। এর পরও সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে সড়ক নির্মাণ দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। এ কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহবান জানান তিনি। শু/আজা