দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারে গড়ে ওঠা শত শত হোটেল-মোটেল ও আবাসিক প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চরম উদাসীনতার চিত্র সামনে এসেছে। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (এসটিপি) ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে এখানকার সিংহভাগ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ফলে এসব হোটেল ও বসতবাড়ির মানববর্জ্য ও তরল বর্জ্য সরাসরি মিশে যাচ্ছে সমুদ্রে, যা হুমকিতে ফেলছে সামুদ্রিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। কক্সবাজার চেম্বার অফ কমার্সের তথ্যমতে, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কাছাকাছি কলাতলী ও হোটেল-মোটেল জোন এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক আবাসিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, গেস্টহাউস ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বর্জ্য পরিশোধনের জন্য নিজস্ব স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (এসটিপি) বা কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে এর চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। অবাক করার বিষয় হলো, এর মধ্যে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি তারকা মানের হোটেলে আধুনিক এসটিপি প্লান্ট রয়েছে। বাকি ৯৯ শতাংশ হোটেলেই বর্জ্য শোধনের কোনো ব্যবস্থা নেই। নিয়মবহির্ভূতভাবে হোটেলগুলোতে এসটিপির পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে সাধারণ বা ভূগর্ভস্থ সেপটিক ট্যাংক। কক্সবাজার সিটি কলেজের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মইনুল হাসান পলাশ বলেন, অপরিকল্পিত এসব সেপটিক ট্যাংকের বর্জ্য এবং হোটেলগুলোর তরল বর্জ্য বিভিন্ন নালা-নর্দমা হয়ে সরাসরি চলে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরে। বিশেষ করে পর্যটক গিজগিজ করা মৌসুমে বা বর্ষাকালে এই দূষণের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। এর ফলে সাগরের পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং হুমকির মুখে পড়ছে প্রবাল, মাছসহ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য। অন্যদিকে, দূষিত পানির কারণে সাগরে গোসল করতে নামা পর্যটকদের অনেকেই চর্মরোগসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। সুপেয় পানির উৎসগুলোও মারাত্মকভাবে দূষিত হওয়ায় স্থানীয় সাধারণ জনগণ ও পর্যটকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি দিন দিন বেড়েই চলেছে। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) ও পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, অতীতে ভবন নির্মাণের সময় এসটিপি বাধ্যতামূলক না করায় যত্রতত্র বহুতল হোটেল ও বাণিজ্যিক ভবন গড়ে উঠেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হলেও মালিকপক্ষের উদাসীনতায় পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। ধরিত্রি রক্ষায় আমরা -ধরা পরিবেশ সংগঠন কক্সবাজার জেলা কমিটির সভাপতি সাংবাদিক, ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই দেশের পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র কক্সবাজার তার আকর্ষণ হারাবে এবং পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবেন। পরিবেশ রক্ষায় দ্রুত প্রতিটি হোটেলে পৃথক এসটিপি স্থাপন অথবা সরকারের পক্ষ থেকে একটি ‘সেন্ট্রাল এসটিপি’ বা কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জোর দাবি করছি। কক্সবাজারকে টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল পর্যটক টানার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে পরিবেশ রক্ষার টেকসই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। শু/আজা