দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে আগামী ১ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে পর্যটন মৌসুম। ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকেরা দ্বীপটিতে ভ্রমণের সুযোগ পাবেন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দৈনিক সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক প্রবেশের সীমা নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে দ্বীপের নাজুক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আগের বছরের নির্দেশনা বহাল থাকছে। সে অনুযায়ী, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাতযাপন করা গেলেও নভেম্বর মাসে দিনে গিয়ে দিনেই ফিরতে হবে। ফেব্রুয়ারিতে পর্যটকদের জন্য দ্বীপটি বন্ধ থাকবে। দ্বীপে যেতে পর্যটকদের নিতে হবে ট্রাভেল পাসও। প্রত্যেক পর্যটকের কাছ থেকে নেওয়া হবে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি। রোববার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ-২ শাখা থেকে জারি করা এক চিঠিতে পর্যটকদের ভ্রমণের সময়সীমা ও দৈনিক সংখ্যা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান বলেন, আগের প্রজ্ঞাপনে যেসব নির্দেশনা ছিল, সেগুলোই অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ, পর্যটকদের যাতায়াতের সময়সীমা নির্ধারিত হলেও রাতযাপনের ক্ষেত্রে আগের নিয়ম বহাল থাকবে। সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের ভ্রমণের সুযোগ চালুর খবরে দ্বীপজুড়ে আনন্দের আবহ তৈরি হয়েছে। পর্যটননির্ভর এই দ্বীপের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হলে আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে। সচল হবে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁসহ পর্যটনকেন্দ্রিক বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। বাড়বে স্থানীয় মানুষের আয়-রোজগারের সুযোগ। দ্বীপের বাসিন্দা জাবেদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, আগামী মাস থেকে পর্যটকদের জন্য দ্বীপটি উন্মুক্ত করার ঘোষণা এলেও রাতযাপনের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি ছিল। এখন ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাতযাপনের সুযোগ থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ায় দ্বীপবাসী আনন্দিত। সেন্টমার্টিনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের আগমন সামনে রেখে দ্বীপের বিভিন্ন পেশার মানুষ কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ব্যবসায়ীরা নিজেদের প্রতিষ্ঠান সংস্কারে ব্যস্ত সময় পার করছেন। পুরো নির্ধারিত সময়ে রাতযাপনের সুযোগ থাকলে পর্যটন ব্যবসায়ী ও ভ্রমণপিপাসু—উভয় পক্ষই উপকৃত হবেন। তিনি বলেন, কক্সবাজার থেকে দীর্ঘ সময় নৌপথ পাড়ি দিয়ে সেন্টমার্টিনে আসা পর্যটকদের জন্য দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসা কষ্টকর। রাতযাপনের সুযোগ থাকায় ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে তাঁরা দ্বীপে কিছুটা বেশি সময় কাটাতে পারবেন। পর্যটন ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন পর্যটকদের যাতায়াত সীমিত থাকায় দ্বীপের ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল। পর্যটকেরা ভ্রমণের পাশাপাশি রাতযাপনের সুযোগ পেলে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও নৌপরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা বাড়বে। সেই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে। তবে পর্যটকদের যাতায়াত ও অবস্থানের ক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণসংক্রান্ত নির্দেশনা মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রবাল, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি। অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ পর্যটন মৌসুম শুরুর আগে দ্বীপের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থায়ী ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও প্রশিক্ষিত অগ্নিনির্বাপণকর্মী না থাকায় দ্বীপের প্রায় ১৫০টি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এই দ্বীপে পর্যটকদের আবাসনের জন্য গড়ে উঠেছে ছোট-বড় নানা স্থাপনা। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণ, উদ্ধারকাজ পরিচালনা এবং পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে আগুন লাগলে দ্রুত উদ্ধারকারী দল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছানোও কঠিন হতে পারে। গত বছরের একটি অগ্নিকাণ্ড এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি ভোরে দ্বীপের পশ্চিম সৈকতের গলাচিপা এলাকায় আগুনে তিনটি রিসোর্টের ২৬টি কক্ষ সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। স্থায়ী ফায়ার সার্ভিস স্টেশন না থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিকভাবে পেশাদার অগ্নিনির্বাপণ সহায়তা পাওয়া যায়নি। প্রবল বাতাসে এক রিসোর্ট থেকে অন্য রিসোর্টে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা পানি ঢেলে প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ ঘটনার পরও দ্বীপে স্থায়ী অগ্নিনির্বাপণ অবকাঠামো গড়ে না ওঠায় নতুন পর্যটন মৌসুমের আগে ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এসেছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে আবাসিক স্থাপনাগুলোতে মানুষের উপস্থিতিও বাড়বে। ফলে আগুন লাগলে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা এড়াতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম নিয়ে প্রশ্ন সেন্টমার্টিনে থাকা প্রায় ১৫০টি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের সব কটিতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ, জরুরি বহির্গমনপথ এবং প্রশিক্ষিত কর্মী রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশেষ করে পর্যটকদের থাকার কক্ষ, রান্নাঘর, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও গ্যাস ব্যবহারের জায়গায় নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনায় দ্রুত উদ্ধার ও আগুন নেভানোর কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হতে পারে। তাই আগুন লাগার পর জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি আবাসিক স্থাপনায় কার্যকর অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। টেকনাফ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন কমান্ডার কামরুজ্জামান সুমন জানান, আগামী ২৯ অক্টোবর তাঁরা সেন্টমার্টিন দ্বীপ পরিদর্শনে যাবেন। পরিদর্শনের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হবে। পর্যটন মৌসুম শুরুর আগে ফায়ার সার্ভিসের এ পরিদর্শনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে তাঁদের মতে, পরিদর্শনের পর সুপারিশ দেওয়ার মধ্যেই উদ্যোগ সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। দ্বীপের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় কার্যকর অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে। সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম বলেন, দ্বীপে আপাতত ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের সম্ভাবনা না থাকলেও প্রতিটি রিসোর্টে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শুধু অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। যন্ত্রগুলো সচল ও ব্যবহারোপযোগী রাখা, কর্মীদের সেগুলো ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া, জরুরি বহির্গমনপথ খোলা রাখা এবং নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ মহড়ার ব্যবস্থা করাও প্রয়োজন। পাশাপাশি আগুন লাগলে পর্যটকদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকা জরুরি। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, “পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই দ্বীপে অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা জোরদার করা না গেলে অতীতের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যাবে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ, নিয়মিত তদারকি এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানাচ্ছি।” পরিবেশের পাশাপাশি পর্যটকের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ সেন্টমার্টিনের প্রবাল, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও ভঙ্গুর প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় পর্যটকের সংখ্যা সীমিত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটকদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দৈনিক পর্যটকসীমা কার্যকর করা ও পরিবেশ সংরক্ষণ ফি আদায়ের পাশাপাশি হোটেল-রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত কর্মী প্রস্তুত রাখার প্রয়োজন রয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে সেন্টমার্টিন দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য। প্রতিবছর পর্যটন মৌসুমকে কেন্দ্র করে দ্বীপের ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি দূর করা না গেলে একটি দুর্ঘটনাই পর্যটক, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই কার্যকর প্রস্তুতি, নিয়মিত তদারকি ও জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।