উদ্ধার হওয়া প্রত্নসম্পদ। বউঘাট খননে জড়িতরা।
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন ২০০ বছরের পুরোনো বাইশরশি জমিদার বাড়ি এখন অস্তিত্ব সংকটে। অভিযোগ উঠেছে, একটি অসাধু চক্র গুপ্তধনের আশায় বাড়ির অন্দরমহলের ঐতিহ্যবাহী ‘বউঘাট’ খুঁড়ে মূল্যবান প্রত্নসম্পদ লুট করেছে। যা স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, কিছুদিন ধরে দিনের আলোয় একদল ব্যক্তি বউঘাটের নিচের অংশ খনন করছে। তারা খননকৃত মাটি পাশের পুকুরে ধুয়ে সেখান থেকে মূল্যবান সামগ্রী সংগ্রহ করছে। ইতোমধ্যে ওই চক্রটির হাতে অলংকার, পাথরের দাবার গুটি, তামা ও রুপার মুদ্রাসহ বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখা গেছে। খননস্থলে পাথরের মূর্তির ভাঙা অংশ, জমিদারদের ব্যবহৃত কালো পাথরের বাটি, ধুপকাটির পাত্র ও পূজার তৈজসপত্রের অবশিষ্টাংশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যাওয়ার কথা জানান তারা। এলাকাবাসী জানায়, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বাসিন্দা বলে দাবি করেছেন। ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, ১৮০০ শতকের গোড়ার দিকে লবণ ব্যবসার মাধ্যমে সাহা পরিবার বিপুল সম্পদের মালিক হয়। পরবর্তীতে তারা ২২টি পরগনার জমিদারি পরিচালনা করে। ৫০ একর জমির ওপর নির্মিত এই জমিদার বাড়টি বর্তমানে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর জমিদাররা চলে গেলে বাড়িটি সরকারি তত্ত্বাবধানে আসে। জমিদার বাড়ির ভেতরে উপজেলা ভূমি অফিস, ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ অফিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর থাকা সত্ত্বেও স্থাপনাটি চরম অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, রাতে তো বটেই, দিনের বেলাতেও এলাকাটি অপরাধীদের বিচরণস্থলে পরিণত হয়েছে। কারুকাজ খচিত দরজা-জানালা ও প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রী ধারাবাহিকভাবে চুরি হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে যেখানে জমিদার বাড়ির নারীরা স্নান করতেন এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতেন, সেই পবিত্র ও স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি এখন খনন করে ধ্বংস করা হচ্ছে। বাইশরশি গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল আহমেদ বলেন, “এই জমিদার বাড়িটি আমাদের এলাকার ২০০ বছরের পুরনো ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক। গত কয়েকদিন ধরে যেভাবে ঐতিহ্যবাহী ‘বউঘাট’ এলাকাটি খুঁড়ে নষ্ট করা হচ্ছে, তাতে আমরা আমাদের প্রত্নসম্পদ হারানোর শঙ্কায় আছি। প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি, দ্রুত এই খনন কাজ বন্ধ করে স্থাপনাটি রক্ষা করা হোক।” বাইশরশি বাজারের ব্যবসায়ী শেখ মহিবুল্লাহ বলেন, “জমিদার বাড়ির ভেতরে এভাবে অসাধু চক্রের বিচরণ আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। শুক্রবার সন্ধ্যায় আমাদের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করায় আমরা কিছুটা নিশ্চিত হচ্ছি। তার আশ্বাসের পর আমরা আশা করছি, দ্রুতই বাড়িটি সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” সদরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিফাত আনজুম পিয়া গণমাধ্যমকে জানান, খননের বিষয়টি তারা অবগত হয়েছেন এবং দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এদিকে, শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল। পরিদর্শন শেষে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই জমিদার বাড়িটি আমাদের এলাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন। এটিকে রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা ইতোমধ্যে এটিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় এনে পূর্ণ সংরক্ষণের প্রক্রিয়া শুরু করেছি।”