নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’, যাকে ‘নাটের গুরু’ বলছে পুলিশ
রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক কয়েকটি বিস্ফোরণ, বোমা উদ্ধার এবং বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’কে মূল হোতা হিসেবে সন্দেহ করছে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। নয় বছর আগে জঙ্গিবাদ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া এই ব্যক্তি গত জানুয়ারিতে একটি মামলায় খালাস পান। পরে ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে বেরিয়ে আবারও বোমা তৈরির কাজে জড়িয়ে পড়েছেন বলে পুলিশের দাবি। সিটিটিসি কর্মকর্তারা বলছেন, মঙ্গলবার রাতে সাভার থেকে বোমা ও বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানের ‘গুরু’ হলেন বোমারু মামুন। আরিফের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু পাইপ বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির রাসায়নিক উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। মামুনকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সিটিটিসির এডিসি (ইনভেস্টিগেশন) মাঈন উদ্দীন চৌধুরী বলেন, আরিফের বয়স আনুমানিক ২৬ বছর। তাকে গ্রেপ্তারের পর সাভারের শ্যামপুরে তার ভাড়া বাসায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। তাঁর ভাষায়, আরিফের গুরু নাজমুল হাসান মামুনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া কয়েকটি বোমা বিস্ফোরণ ও বোমা উদ্ধারের ঘটনায় মামুন ও আরিফের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণ, যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের তল্লাশির সময় বোমা ভর্তি ব্যাগ ফেলে পালানো, কুমিল্লার একটি শিবমন্দিরে বিস্ফোরণ এবং সায়েদাবাদে পুলিশের তল্লাশির সময় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা রয়েছে। এ ছাড়া গত জুলাইয়ে মতিঝিল মেট্রো স্টেশনের নিচে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উল্টো রথযাত্রার পথে ছাতার ভেতর পাইপ বোমা রেখে যাওয়ার ঘটনা এবং আশুলিয়ার চারাবাগে একটি চায়ের দোকানে প্রেশার কুকার বোমা ফেলে রাখার ঘটনায়ও মামুন-আরিফদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে তদন্তকারীদের দাবি। সর্বশেষ বুধবার সকালে সাভারের গোপেরবাড়ি লালটেক ঘোড়া মসজিদের সামনে একটি মাঠে পড়ে থাকা নীল রঙের ড্রামের ভেতর থেকে আরেকটি প্রেশার কুকার বোমা উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। আগের রাত থেকেই ড্রামটি সেখানে পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আরিফকে গ্রেপ্তারের পর সাভারের শ্যামপুরে তাঁর ভাড়া বাসায় অভিযান চালায় সিটিটিসি। সন্ধ্যা থেকে রাত পৌনে ২টা পর্যন্ত বাড়িটি ঘিরে অভিযান চলে। পুলিশ জানায়, সেখান থেকে বেশ কিছু পাইপ বোমা এবং বোমা তৈরির রাসায়নিক উদ্ধার করা হয়েছে। সিটিটিসির পক্ষ থেকে বুধবার দুপুরে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হলেও পরে তা স্থগিত করা হয়। সাভারের শ্যামপুরে অভিযান চালিয়ে এই পাইপ বোমা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। যে বাসায় বোমা তৈরির সরঞ্জাম শ্যামপুরের ওই বাড়ির মালিক আব্দুল জলিল পক্ষাঘাতগ্রস্ত ও শয্যাশায়ী। তাঁর মেয়েরা বাড়িটির দেখাশোনা করেন। তাঁদের একজন ইলমার ভাষ্য, গত ৫ আগস্ট ‘আব্বাস আলী’ নামে পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি মাসে চার হাজার টাকা ভাড়ায় একটি কক্ষ নেন। অগ্রিম দেন এক হাজার টাকা। নিজেকে গাড়িচালক পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তি বলেন, পাশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের পড়ানোর জন্য বাসাটি পছন্দ হয়েছে। তবে বাসায় ওঠার পর দিনের বেলায় তাকে খুব একটা দেখা যায়নি। পুলিশের দাবি, রাতের কোনো এক সময়ে তিনি বড় জেরিক্যান ভর্তি করে অ্যাসিটোন, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডসহ বিভিন্ন রাসায়নিক সেখানে নিয়ে আসেন। এগুলো দিয়ে টিএটিপি নামের বিস্ফোরক তৈরির চেষ্টা চলছিল বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। সিটিটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, গত ডিসেম্বরের কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরণের পরও একই ধরনের টিএটিপি পাওয়া গিয়েছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিস্ফোরক, যা চাপ, তাপ বা শব্দের কারণেও বিস্ফোরিত হতে পারে। নয় বছর আগে গ্রেপ্তার, পরে খালাস ‘বোমারু মামুন’ ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাজধানীর উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার হন। সে সময় পুলিশ তাঁকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির ‘শুরা সদস্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। এর আগে ওই বছরের ১৫ আগস্ট রাজধানীর পান্থপথের হোটেল ওলিওতে জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালানোর কথা জানায় সিটিটিসি। পুলিশের দাবি ছিল, শোক দিবসের কর্মসূচিতে নাশকতার উদ্দেশ্যে এক জঙ্গি সেখানে অবস্থান করছিলেন। তাঁকে আটক করতে অভিযান চালানোর সময় বোমার বিস্ফোরণে ওই তরুণ নিহত হন। পরে পুলিশ তাঁর পরিচয় সাইফুল ইসলাম বলে জানায়। এ ঘটনায় কলাবাগান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ১৩ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। পরে ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলার ১১ আসামিকেই খালাস দেন। খালাস পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে নাজমুল হাসান মামুনও ছিলেন। আদালতের রায়ে মামলাটির সত্যতা নিয়ে সন্দেহের কথা উল্লেখ করা হয়। আসামিপক্ষের আইনজীবী মামলাটিকে তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা হিসেবে দাবি করেছিলেন। আদালত নথি ও সংশ্লিষ্ট বক্তব্য পর্যালোচনা করে আসামিদের খালাস দেন। মামলা তদন্তের সময় পুলিশ অবশ্য আসামিদের আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটপন্থি উগ্রবাদী এবং নব্য জেএমবির সদস্য হিসেবে উল্লেখ করেছিল। সাভারের অভিযানে গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরান। আরিফের বিরুদ্ধেও আগের জঙ্গি মামলার তথ্য পুলিশ জানিয়েছে, সাভার থেকে গ্রেপ্তার আরিফও আগের সরকারের আমলে জঙ্গি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে ছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেপ্টেম্বর মাসে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। সিটিটিসির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আশুলিয়ার চারাবাগ এলাকায় মামুন ও আরিফদের একটি আস্তানা ছিল। গত ৩০ জুলাই রাতে ওই এলাকায় একটি চায়ের দোকানে প্রেশার কুকার বোমা ফেলে যাওয়ার পর তারা সেখান থেকে সাভারের শ্যামপুরে নতুন আস্তানা গড়ে তোলে। চারাবাগ ও শ্যামপুর পোশাকশিল্প অধ্যুষিত এলাকা। এসব এলাকায় শ্রমিকদের আবাসিক পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে জঙ্গিদের আস্তানা গড়ে তোলার প্রবণতা আগেও দেখা গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরণ থেকে যে সূত্র গত ২৬ ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জের উম্মুল কুরা মাদ্রাসায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণ ঘটে। এতে মাদ্রাসার পরিচালক শেখ আল আমিন, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানরা আহত হন। ঘটনার পর আল আমিন স্ত্রী-সন্তানদের রেখে পালিয়ে যান। সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, আল আমিনের পালিয়ে যাওয়ার সূত্র ধরেই আরিফ ও মামুনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়। তদন্তকারীদের দাবি, মাদ্রাসাটিকে ব্যবহার করে সেখানে বোমা তৈরির একটি কারখানা গড়ে তোলা হয়েছিল। পরে আল আমিন সাভারে মামুনের আস্তানায় আশ্রয় নেন এবং সেখান থেকে দক্ষিণ ঢাকার দোলাইরপাড়ে আরিফের বাসায় যান। ওই বাসা থেকে আল আমিনকে গ্রেপ্তার করা হলেও আরিফ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন বলে পুলিশ জানায়। সিটিটিসির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আল আমিন, অলি উল্লাহ জনি, শাহীন ওরফে আবু বকর এবং দর্জি আমিন একই চক্রের সদস্য। তাঁদের নেতৃত্বে রয়েছেন মামুন। তবে অতীতে তাঁদের বিরুদ্ধে করা জঙ্গিবাদসংক্রান্ত মামলাগুলো এবং পরবর্তী সময়ে তাদের নতুন করে জঙ্গিবাদে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ—দুই বিষয়ই এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে। সিটিটিসির অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, এসব বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তে যাঁর নাম আসবে, তাঁকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হবে। মামুন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণের ঘটনাগুলোর যোগসূত্র খুঁজতে গিয়ে পুলিশ এখন বোমারু মামুনের দিকে নজর দিচ্ছে। তবে মামুনকে গ্রেপ্তার করা এবং তদন্তে পাওয়া তথ্য আদালতে প্রমাণিত হওয়ার পরই এসব ঘটনায় তাঁর প্রকৃত ভূমিকা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।