প্রকাশ :: ... | ... | ...

কুড়িগ্রামের রাজমাল্লীর হাটে ৮২ লাখ টাকার হাট উন্নয়ন, সুফল মিলছে না ক্রেতা-বিক্রেতার


সংযুক্ত ছবি

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার উমর মজিদ ইউনিয়নের রাজমাল্লীর হাটে ৮২ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে বহুমুখী শেডসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর গত বছরের ২২ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় এসব স্থাপনা। তবে উদ্বোধনের কয়েক মাস পরও নতুন শেডে জমেনি ব্যবসা। দোকানদার নেই, ক্রেতারও তেমন আনাগোনা নেই। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোর বড় একটি অংশ কার্যত অব্যবহৃত পড়ে আছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের অভিযোগ, হাটের মূল সড়ক থেকে আড়ালে এবং পুরোনো দোকানগুলোর পেছনে বহুমুখী শেড নির্মাণ করায় সেটি মানুষের সহজে চোখে পড়ে না। ফলে ক্রেতারা সেখানে যাচ্ছেন না। ক্রেতা না থাকায় নতুন শেডে দোকান বসাতেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। সবজি ব্যবসায়ী ইউনুছ আলী বলেন, “দোকান করাইয়া লাভ কী? ব্যবসা করার লোক নাই। এখানে দোকান দিলে ক্রেতা পাওয়া যায় না।” পান-সুপারি ব্যবসায়ী আমিনুরের ভাষ্য, “সারি সারি অন্য দোকানের পেছনে মার্কেট করে দিয়েছে। মূল বাজার থেকে মার্কেট দেখা যায় না। এ কারণে দোকানদাররা এখানে দোকান দিতে চায় না।” সরেজমিনে দেখা যায়, হাটের ভেতরে নির্মিত বহুমুখী শেডের বড় অংশ ফাঁকা পড়ে আছে। দোকানপাট চালু না হওয়ায় সেখানে নিয়মিত বেচাকেনার পরিবেশও তৈরি হয়নি। শেডের আশপাশে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক কম। ফলে যে উদ্দেশ্যে অবকাঠামোগুলো নির্মাণ করা হয়েছে, তার বাস্তব সুফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ক্রেতা লালমিয়া বলেন, “এখানে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, অন্ধকার থাকে। আমরা রাস্তার পাশেই প্রয়োজনীয় জিনিস খুঁজি। শেডগুলো ভেতরে হওয়ায় সেভাবে ক্রেতা সেখানে যায় না।” হাটের ইজারাদার ও বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মঞ্জু আলম বলেন, বাজারের পেছনে শেড হওয়ায় মানুষের নজরে পড়ে না। ফলে সেখানে ক্রেতারা যেমন যান না, তেমনি দোকানদাররাও দোকান দিতে আগ্রহী নন। তাঁর মতে, বাজারের সামনের অংশ থেকে শেড এলাকায় যাওয়ার জন্য একটি সরাসরি রাস্তা তৈরি করা হলে মানুষের চলাচল বাড়তে পারে। বাজার কমিটির সভাপতি ও উমর মজিদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আহসানুল কবির আদিল বলেন, বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য খুঁটি ও মিটারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু দোকানদাররা সেখানে সংযোগ নিতে আগ্রহী না হওয়ায় তা আর করা হয়নি। বিদ্যুৎ না থাকায় মোটর ও পানির ট্যাংকিও পড়ে আছে, ব্যবহার করা যাচ্ছে না। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ‘অবকাঠামোগত দক্ষতা উন্নয়ন ও তথ্যের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সহনশীলতা বৃদ্ধি (প্রভাতী)’ প্রকল্পের আওতায় রাজমাল্লীর হাটের উন্নয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (আইএফএডি) অর্থায়িত প্রকল্পটির আওতায় হাটের উন্নয়নকাজে ব্যয় হয়েছে ৮২ লাখ ১৫ হাজার ৯৮৮ টাকা ৩৯ পয়সা। প্রকল্পের আওতায় দুটি বহুমুখী শেড, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক টয়লেট, উন্মুক্ত বিক্রয় প্ল্যাটফর্ম, টিউবওয়েল, মাছ বিক্রির জন্য আলাদা শেড, সড়কবাতি, আবর্জনা ফেলার পিট এবং গাছ লাগানোর কাজ করা হয়েছে। এসব নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর রাজমাল্লীর হাটের উন্নয়নকাজ উদ্বোধন করা হয়। অর্থাৎ অবকাঠামো নির্মাণ ও উদ্বোধনের পরও নতুন শেডে নিয়মিত ব্যবসা শুরু না হওয়ায় প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত ব্যবহার ও সুফল নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এলজিইডির রাজারহাট উপজেলা প্রকৌশলী মো. এজাহারুল হক বলেন, “নির্ধারিত নকশা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে বহুমুখী শেড হাট কমিটি ও ইজারাদারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং উদ্বোধন করা হয়েছে।” তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ ও হস্তান্তর করলেই একটি হাটের উন্নয়ন কার্যকর হয় কি না। তাঁদের মতে, নির্মিত শেডে ব্যবসায়ীদের বসানোর উদ্যোগ, ক্রেতাদের চলাচলের সুবিধা, বাজারের মূল অংশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে অবকাঠামো নির্মাণের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। স্থানীয়দের ভাষ্য, হাটের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে নতুন স্থাপনাগুলোকে কার্যকরভাবে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া না হলে সরকারি অর্থে নির্মিত এসব স্থাপনা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকতে পারে। এতে একদিকে যেমন ক্রেতা-বিক্রেতারা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন, অন্যদিকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে বাস্তবায়িত উন্নয়নকাজের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাবে।