ছবি: সংগৃহীত
লাগাতার তিন বছর আলু চাষ করে লোকসানের মুখে পড়েছেন জয়পুরহাটের কৃষকেরা। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিকল্প ফসল হিসেবে কলা চাষে ঝুঁকেছিলেন অনেকে। অনুকূল আবহাওয়ায় এবার ফলনও হয়েছে ভালো। কিন্তু উৎপাদন বাড়ায় বাজারে কমেছে কলার দাম। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, বাগান থেকে কলা কেটে বাজারে নেওয়ার খরচও তুলতে পারছেন না অনেক চাষি। আলুর পর কলা চাষেও লোকসানের আশঙ্কায় ফসল উৎপাদন নিয়ে আগ্রহ হারাচ্ছেন তাঁরা। কৃষকদের অভিযোগ, আলুর মৌসুমে কখনো উৎপাদন খরচের তুলনায় দাম কম পাওয়া যায়, আবার কলার বাম্পার ফলনের পরও একই পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের। এক ফসলের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অন্য ফসল চাষ করেও স্বস্তি মিলছে না। ফলে কৃষিতে বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তাঁরা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জয়পুরহাটে প্রতিবছর কমবেশি কলার চাষ হয়। তবে চলতি বছর জেলায় ৭০০ হেক্টর জমিতে কলা চাষ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও চাষের পরিমাণ বাড়ায় উৎপাদনও বেড়েছে। জেলার জয়পুরহাট সদর উপজেলার দুর্গাদহে গড়ে উঠেছে কলার পাইকারি হাট। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, এ হাটে প্রতিদিন কোটি টাকার কলা কেনাবেচা হয়। সকাল থেকে শুরু হওয়া এ হাটে বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা আসেন। গত মঙ্গলবার দুর্গাদহ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, হাটজুড়ে সারি সারি কলার স্তূপ। ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি থাকলেও বেচাকেনা চলছিল ধীরগতিতে। পাইকারের সংখ্যাও ছিল তুলনামূলক কম। চাহিদার তুলনায় কলার সরবরাহ বেশি থাকায় দর পড়ে যায়। আগের সপ্তাহের তুলনায় মঙ্গলবার প্রতি কাঁদি কলা ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কম দামে বিক্রি হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। জয়পুরহাট সদর উপজেলার ভাদসা এলাকার চাষি মিরাজুল ইসলাম বলেন, দুই সপ্তাহ আগেও এক কাঁদি দেশি জাতের সাগর কলা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি করেছেন। কিন্তু মঙ্গলবার একই পরিমাণ কলা বিক্রি করতে হয়েছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। তিনি বলেন, “তাহলে আলু ছেড়ে কলার চাষ করে লাভ কী হলো? আমাদের দশা তো সেই ‘যেই লাউ, সেই কদু’।” চাষিদের ভাষ্য, কলা উৎপাদনের পর বাগান থেকে কেটে আনা, পরিবহন ও হাটে তোলার পেছনে খরচ রয়েছে। বাজারে দাম কমে গেলে এসব ব্যয় বাদ দিয়ে হাতে তেমন অর্থ থাকে না। আবার কলা দ্রুত পচনশীল হওয়ায় বিক্রি করতে না পারলে তা নিয়ে বাড়ি ফেরাও কঠিন। ফলে কম দামেও কলা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। হাটে কলা বিক্রি করতে আসা নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার নানইস গ্রামের জলিল শেখ বলেন, দুর্গাদহ কলার হাটের জায়গা ছোট হওয়ায় দূরদূরান্ত থেকে আসা কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ট্রাক, ভটভটি ও পিকআপ সহজে হাটে ঢুকতে পারে না। এতে কলা ওঠানো-নামানোর সময় নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। কালাই উপজেলার চাষি ভুট্টু মিয়া জানান, ভোররাতে কলা নিয়ে হাটে এলেও সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত একটি কাঁদিও বিক্রি করতে পারেননি। তিনি বলেন, “কলা ফেরত নিয়ে গেলেও বিপদ। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কী হয়। তা ছাড়া কোনো উপায় দেখছি না।” কৃষকদের মতে, উৎপাদন বাড়লেও সেই অনুপাতে বাজার সম্প্রসারণ, সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থার উন্নতি না হলে এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের লোকসানের ঝুঁকি থেকেই যাবে। বিশেষ করে কলার মতো দ্রুত পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে সময়মতো বিক্রি নিশ্চিত করা জরুরি। হাটে জায়গার সংকট ও যানবাহন প্রবেশের অসুবিধাও বেচাকেনায় প্রভাব ফেলছে বলে অভিযোগ তাঁদের। জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক সাদিয়া সুলতানা বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার কলার ফলন ভালো হয়েছে। আগের তুলনায় কলার চাষও বেড়েছে। কৃষি বিভাগ কলার উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে আসছে। তবে উৎপাদন ভালো হলেও বাজারে দাম কমে যাওয়ার বিষয়ে কৃষি বিভাগের করণীয় সীমিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। আলু চাষে টানা লোকসানের পর কলা চাষে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করেছিলেন জয়পুরহাটের অনেক কৃষক। কিন্তু ফলন ভালো হওয়ার পরও দাম কমে যাওয়ায় তাঁদের সেই প্রত্যাশায় ধাক্কা লেগেছে। কৃষকদের আশঙ্কা, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যায্য দাম না পেলে আগামী মৌসুমে কলা চাষেও আগ্রহ হারাতে পারেন অনেকে।