প্রকাশ :: ... | ... | ...

কুরিয়ারকর্মীর ভুলে হংকংয়ে এফ-৩৫-এর যন্ত্রাংশ, চীনের হাতে যাওয়ার দাবি


সংযুক্ত ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমানের গুরুত্বপূর্ণ দুটি যন্ত্রাংশ অস্ট্রেলিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর পথে হংকংয়ে চলে যায়। পরে যন্ত্রাংশগুলো চীনা কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছেছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান ইউপিএসের এক কর্মী নিষিদ্ধ গন্তব্য সম্পর্কে পাঠানো সতর্কবার্তা খেয়াল না করায় এমন ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রযুক্তির নিরাপত্তা এবং এফ-৩৫ কর্মসূচির আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। তবে চীন পরিকল্পিতভাবে চালানটির গতিপথ পরিবর্তন করেছিল, এমন কোনো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। যন্ত্রাংশগুলোর প্রযুক্তিগত গুরুত্ব নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ব্লুমবার্গের ৭ অক্টোবরের প্রতিবেদনের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, চালানটি অস্ট্রেলিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে পাঠানোর কথা ছিল। পথে দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান হয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত হংকংয়ের পথে পাঠানো হয় সেটি। চালানটিতে ছিল এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের ককপিট ক্যানোপি বা ককপিটের স্বচ্ছ আবরণ এবং অস্ত্র রাখার কক্ষের দরজা। এসব যন্ত্রাংশে রাডার শোষণকারী বিশেষ উপাদানের আবরণ রয়েছে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, এফ-৩৫ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিনের পক্ষে কাজ করা ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার ডিএসভি চালানটি কোন কোন দেশে নেওয়া যাবে না, সে বিষয়ে ইউপিএসকে সতর্ক করেছিল। কিন্তু ইউপিএসের সংশ্লিষ্ট কর্মী সেই ই-মেইল অনুসারে ব্যবস্থা নেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। সতর্কবার্তাটি কর্মীর ব্যবহৃত ব্যবস্থার বাইরে অন্য একটি তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় পৌঁছে থাকতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চালানটি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে পিছিয়ে পড়ার পর দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার জন্য এর রুট পরিবর্তন করা হয়েছিল বলে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। কিন্তু মার্কিন অস্ত্র রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বিধির আওতায় থাকা যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে হংকংয়ের মতো গন্তব্য এড়িয়ে চলার সতর্কতা কেন কার্যকর হয়নি, তা এখন তদন্তের বিষয়। পেন্টাগনের এফ-৩৫ জয়েন্ট প্রোগ্রাম অফিস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ পরিবহনে একটি সমস্যা তাদের নজরে এসেছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে যন্ত্রাংশগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে ঘটনার তদন্ত এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি ঠেকাতে সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মারলেসও ঘটনাটি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, চালানের অস্ট্রেলিয়া অংশে কী ঘটেছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন ও এফ-৩৫ কর্মসূচির প্রধান ঠিকাদার লকহিড মার্টিনের তদন্তে সহযোগিতা করছে ক্যানবেরা। তবে চূড়ান্তভাবে কী ঘটেছে এবং কীভাবে বিষয়টির সমাধান হবে, তা যুক্তরাষ্ট্র ও লকহিড মার্টিন নির্ধারণ করবে বলে জানান তিনি। মারলেসের ভাষ্য, চালানে থাকা যন্ত্রাংশগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিল না। তবে সেগুলো নিয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়নের দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এর আগে জানিয়েছিল, তারা এ ঘটনা সম্পর্কে অবগত নয়। **কেন উদ্বেগ এফ-৩৫ নিয়ে** এফ-৩৫ যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান। রাডারে শনাক্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানোর নকশা, উন্নত সেন্সর, রাডার এবং তথ্য আদান-প্রদানের সমন্বিত ব্যবস্থার কারণে এটি আধুনিক সামরিক বিমান প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। চালানে থাকা ককপিট ক্যানোপি ও অস্ত্রকক্ষের দরজা বিমানের অংশ হলেও সেগুলোর উপাদান, নির্মাণপ্রক্রিয়া কিংবা বিশেষ আবরণ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেলে তা প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে এ দুটি যন্ত্রাংশ থেকে এফ-৩৫-এর সম্পূর্ণ প্রযুক্তি বা সক্ষমতা জানা সম্ভব—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য প্রকাশ্যে নেই। অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৭২টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে দেশটি এ বিমানের খুচরা যন্ত্রাংশের যৌথ সরবরাহব্যবস্থার অংশ। অস্ট্রেলিয়ার উইলিয়ামটাউন ঘাঁটির গুদাম এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এফ-৩৫-এর যন্ত্রাংশ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে একটি চালানের ভুল গন্তব্যে চলে যাওয়ার ঘটনা শুধু পরিবহনব্যবস্থার ত্রুটি নয়, আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সরবরাহব্যবস্থার তদারকি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এফ-৩৫ কর্মসূচি আগেও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় এসেছে। ২০১৩ সালে প্রকাশিত মার্কিন প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে পেন্টাগনের বিভিন্ন সামরিক কর্মসূচির তথ্য চুরির অভিযোগ উঠে আসে; এর মধ্যে জয়েন্ট স্ট্রাইক ফাইটার কর্মসূচিও ছিল। তবে অতীতের সাইবার হামলার অভিযোগের সঙ্গে হংকংয়ে যন্ত্রাংশ পৌঁছানোর বর্তমান ঘটনার সরাসরি যোগসূত্রের প্রমাণ নেই। চালানটি উদ্ধারের চেষ্টা, যন্ত্রাংশের প্রকৃত অবস্থান এবং সেগুলোর প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন—এসব বিষয়ে তদন্তের ফল এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠান, সরবরাহব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা ঠিকাদার এবং সামরিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে সতর্কবার্তা আদান-প্রদান ও রপ্তানি বিধি মানার প্রক্রিয়ায় কোথায় ত্রুটি ছিল, তা নির্ধারণের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।