সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা সিজেপির; মুক্তির শর্ত নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন ঘিরে আটক হওয়ার পর মুক্তি পেয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত দিপকে ও দলের আরও দুই নেতা। তবে এক বছর শান্তি ভঙ্গ না করার শর্তে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে—এমন খবরের প্রতিবাদ জানিয়েছেন দিপকে। তাঁর দাবি, আন্দোলন না করার শর্তে তিনি কোনো মুচলেকায় সই করেননি। মুক্তির পর আবারও রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেছেন, তাঁদের প্রতিবাদ কর্মসূচি চলবে। রোববার (১১ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দিপকে লেখেন, ‘আমরা প্রতিবাদ জানাতে পারব না, এমন কোনো মুচলেকায় সই করিনি। আমরা আবারও রাজপথে নামব।’ এর আগে দিল্লির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে এক বছর শান্তি বজায় রাখা ও ভালো আচরণের শর্তে দিপকে, সিজেপির সহআহ্বায়ক সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়। দিল্লি পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, তিন নেতার প্রত্যেকের জন্য ৫০ হাজার রুপির জামিনদার বা নিশ্চয়তামূলক বন্ড জমা দেওয়া হয়েছে। তবে দিপকের বক্তব্যে মুক্তির শর্ত ও আন্দোলনের অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) মুম্বাই থেকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের ভেতর থেকেই তাঁদের আটক করে দিল্লি পুলিশ। সিইসির পদত্যাগের দাবিতে সিজেপির পূর্বঘোষিত বিক্ষোভে যোগ দিতে তাঁরা রাজধানীতে গিয়েছিলেন। পরে তাঁদের প্রতিরোধমূলক হেফাজতে নেওয়া হয় এবং রোববার সকালে দিল্লি ক্যান্টনমেন্টের বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করা হয়। দিল্লি পুলিশের ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সম্ভাব্য শান্তিভঙ্গ ঠেকাতে আইন অনুযায়ী তাঁদের আটক করা হয়েছিল। পুলিশ ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১২৬ ও ১৭০ ধারার কথা উল্লেখ করেছে। তবে সিজেপির নেতারা আটক ও মুক্তির শর্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। দিল্লিতে বিক্ষোভ, ব্যাপক আটক সিজেপির বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে শনিবার দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। যন্তর মন্তরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যারিকেড বসানো হয়, যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় এবং বিক্ষোভে অংশ নিতে আসা বহু মানুষকে আটক করে পুলিশ। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভের দ্বিতীয় দিনেও দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের আটক করা হয়। সিজেপির নেতাদের পাশাপাশি শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক কর্মী ও অন্যান্য বিক্ষোভকারীরাও পুলিশের পদক্ষেপের মুখে পড়েন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আটক ব্যক্তির সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন হিসাব প্রকাশিত হয়েছে; কিছু প্রতিবেদনে সাত হাজারের বেশি মানুষকে আটক করার কথা বলা হয়েছে। সিজেপির দাবি, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ঠেকাতে পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে এবং রাজধানীতে চলাচল ও সমাবেশের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়েছে। দলের নেতারা বলেন, নির্ধারিত স্থানে বিক্ষোভ করতে চাওয়া মানুষদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যেত। তাঁদের মতে, প্রতিবাদকারীদের আটক করে আন্দোলন বন্ধ করা সম্ভব হবে না। দলটির সহআহ্বায়ক সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সৌরভ দাসের বক্তব্য, এই প্রতিবাদ শুধু দিল্লিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; দেশের অন্য এলাকাতেও কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়া হবে। তাঁদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যুক্ত করা প্রয়োজন। এদিকে, আন্দোলনে অংশ নিতে আসা ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীকেও আটক করেছিল পুলিশ। পরে শনিবার গভীর রাতে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধ সিজেপির আন্দোলনের মূল দাবি সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে দলটি এই কর্মসূচি চালাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে এবং এর ফলে ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের কার্যপ্রণালি ও ভোটার তালিকা সংশোধনের সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর যাচাইকৃত তথ্য ছাড়া বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বা অনিয়মের অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ভারতের নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদে নির্ধারিত। নির্বাচন পরিচালনা, তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিতর্ককে সামনে নিয়ে আসে। কীভাবে অপসারণ করা যায় সিইসিকে সিইসির পদত্যাগের দাবির পাশাপাশি তাঁর অপসারণের সাংবিধানিক পদ্ধতিও আলোচনায় এসেছে। ভারতের সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদের পঞ্চম দফা অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির মতো একই পদ্ধতিতে এবং একই কারণে পদ থেকে অপসারণ করা যায়। এর জন্য প্রমাণিত অসদাচরণ বা অক্ষমতার ভিত্তিতে সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। লোকসভা ও রাজ্যসভা—সংসদের দুই কক্ষেই নির্ধারিত বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অপসারণ প্রস্তাব পাস হতে হবে। এরপর রাষ্ট্রপতি অপসারণের আদেশ দিতে পারেন। অর্থাৎ, শুধু রাজনৈতিক দল বা আন্দোলনকারীদের দাবি কিংবা সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিইসিকে সরিয়ে দেওয়া যায় না। অন্য নির্বাচন কমিশনারদের ক্ষেত্রে সংবিধানে পৃথক সুরক্ষা রয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সুপারিশ ছাড়া তাঁদের পদ থেকে অপসারণ করা যায় না। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো, নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের যেন নির্বাহী বিভাগের চাপ বা রাজনৈতিক অসন্তোষের কারণে সহজে সরিয়ে দেওয়া না যায়। ২০২৩ সালে প্রণীত প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগসংক্রান্ত আইন নিয়েও ভারতে বিতর্ক রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের ২০২৩ সালের রায়ে আইন প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত নিয়োগ কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও প্রধান বিচারপতিকে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরে সংসদে পাস হওয়া আইনে প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একজন সদস্যকে রাখা হয়। এই পরিবর্তনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সিজেপির আন্দোলন তাই শুধু একজন নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কও যুক্ত হয়েছে। পুরোনো মামলায় নতুন নোটিসের খবর সিজেপির নেতাদের মুক্তির পর তাঁদের বিরুদ্ধে পুরোনো একটি মামলায় নতুন করে নোটিস পাঠানো হয়েছে বলে ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ওই মামলায় এক নারী অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর ছবি বিকৃত করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগটির প্রেক্ষিতে আদালত আগে সিজেপির নেতাদের নোটিস পাঠানোর পাশাপাশি পুলিশকেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে মামলাটির বর্তমান অবস্থা, নতুন নোটিসের সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু এবং সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। দিপকের মুক্তির পর তাঁর দেওয়া বক্তব্যে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে আদালতের মুক্তির শর্ত ও পুলিশের আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত যুক্তি, অন্যদিকে সিজেপির প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে আপত্তি—দুইয়ের মধ্যে বিরোধ এখনো অমীমাংসিত। সিইসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হয় এবং আদালতের নির্দেশনা ও পুলিশের বিধিনিষেধের মধ্যে বিক্ষোভকারীরা কীভাবে কর্মসূচি চালান, তা এখন দেখার বিষয়।