নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। যুদ্ধের মধ্যেই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি নিউইয়র্কে গিয়ে একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় অংশ নিয়েছেন, অন্যদিকে জাতিসংঘের মঞ্চে আত্মসমর্পণ না করার বার্তা দিয়েছেন। একই সময়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় জাতিসংঘে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের ওয়াকআউট এবং নিউইয়র্কের রাস্তায় ব্যাপক বিক্ষোভ তাঁর আন্তর্জাতিক অবস্থানকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। তবে এসব ঘটনাকে ইরানের কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে চূড়ান্তভাবে দেখার সুযোগ নেই; কারণ ২৬ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। জাতিসংঘ অধিবেশনের আগে ও চলাকালে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কয়েক দফা কূটনৈতিক তৎপরতা চলে। ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির মধ্যে বৈঠক হয়। আলোচনাটি সরাসরি না পরোক্ষ—এ নিয়ে শুরুতে কিছুটা বিভ্রান্তি থাকলেও পরে দুই পক্ষই স্বীকার করে, কাতারসহ মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওই আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করলেও পরবর্তী সময়ে দুই দেশের অবস্থানের ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের জাতিসংঘ ভাষণ ছিল এই কূটনৈতিক কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে ইরান আত্মসমর্পণ করবে না বলে জানালেও যুদ্ধ অবসানে কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেননি। তাঁর বক্তব্যে একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শ্রোতা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে ভিন্ন ভিন্ন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা দেখা যায়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেজেশকিয়ান যুদ্ধের অবসানে কূটনীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি ইরানের আত্মসমর্পণের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। এই ভারসাম্য রক্ষা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উইটকফের সঙ্গে আরাগচির বৈঠক নিয়ে ইরানের রক্ষণশীল মহলে সমালোচনা হয়। কয়েকজন কট্টরপন্থী রাজনীতিক প্রশ্ন তোলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধির সঙ্গে এ ধরনের যোগাযোগের অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হলো। এমনকি সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও ওঠে। কিন্তু পেজেশকিয়ান ও আরাগচি একই সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখা এবং জাতিসংঘের মঞ্চে কঠোর অবস্থান প্রকাশের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ দুই পক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য থাকার চেষ্টা করেন। নিউইয়র্কে আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পরিবহনপথে চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ইরানের প্রস্তাব ছিল, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করলে সাত দিনের মধ্যে প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনা যেতে পারে এবং একই সঙ্গে আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি করা সম্ভব। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি শুক্রবার জাতিসংঘে সাংবাদিকদের এ প্রস্তাবের কথা জানান। তবে এই প্রস্তাবে ইরানের প্রত্যাশার তালিকাও ছিল দীর্ঘ। এর মধ্যে ছিল ইরানের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, আটকে থাকা ইরানি অর্থ ছাড় এবং আঞ্চলিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ কমানো। একই সঙ্গে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার পথ পুনরায় খোলার কথাও বলা হয়। ফলে হরমুজ খুলে দেওয়ার প্রস্তাবটি কেবল একটি নৌপথ চালুর বিষয় ছিল না; বরং যুদ্ধের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমাধানের সঙ্গে সেটিকে যুক্ত করেছিল তেহরান। কিন্তু ২৬ সেপ্টেম্বর সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউস থেকে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ইরানের প্রস্তাব তিনি গ্রহণ করেননি। এর ফলে নিউইয়র্কে কয়েক দিনের কূটনৈতিক তৎপরতার পরও যুদ্ধ অবসানের বিষয়ে কোনো তাৎক্ষণিক সমঝোতা হয়নি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান এর আগে কাতারের মাধ্যমে প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠিয়েছিল এবং ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় ছিল। অন্যদিকে জাতিসংঘে পেজেশকিয়ানের উপস্থিতির পর ইরানের কূটনৈতিক তৎপরতার একটি বড় দিক ছিল আন্তর্জাতিক জনমতের সামনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা। পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্ত ভাষায় বক্তব্য রাখলেও আলোচনার সম্ভাবনা খোলা রাখেন। তিনি ইরানকে চাপের কাছে নতি স্বীকার না করা রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। বিশ্লেষকদের কাছে এ অবস্থানকে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দুই ধারার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হয়েছে। এদিকে জাতিসংঘের একই অধিবেশনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাষণ ঘিরে ভিন্ন ধরনের দৃশ্য দেখা যায়। ২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর বক্তব্য শুরু হলে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের একটি বড় অংশ সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক ডজন প্রতিনিধি ওয়াকআউট করেন। নেতানিয়াহু তাঁদের ‘নৈতিকভাবে কাপুরুষ’ বলে সমালোচনা করেন। তাঁর ভাষণের মূল লক্ষ্য ছিল গাজা, ইরানসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন ফ্রন্টে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনার জবাব দেওয়া। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নিউইয়র্কের রাস্তায়ও বিক্ষোভ হয়। জাতিসংঘ সদর দপ্তরের আশপাশে কয়েক শ বিক্ষোভকারী জড়ো হন। তারা গাজা ও ইরানকে ঘিরে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করেন। পুলিশ বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করে। রয়টার্সের হিসাবে, ২৪ সেপ্টেম্বর অভিনেত্রী সুসান সারান্ডন, হানা আইনবিন্ডারসহ অন্তত ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরদিন আলজাজিরা জানায়, বিক্ষোভে আটক মানুষের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে শিল্পী, রাজনৈতিক কর্মী ও স্থানীয় রাজনীতিকও ছিলেন। এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও জড়িয়ে পড়েছে। নেতানিয়াহু এবার নিউইয়র্কে গেলেও ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কোনো নির্ধারিত বৈঠক ছিল না। একই সময়ে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনের রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও রয়েছেন। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের ভাষণে তিনি ইসরায়েলের সামরিক অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শ্রোতাদের কাছেও নিজের বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন। ইরানের ক্ষেত্রে চিত্রটি অবশ্য একেবারে সরল নয়। নিউইয়র্কে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়লেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্য রয়ে গেছে। আলোচনার মধ্যেই ইরান জানিয়েছে, তারা নিজেদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর চাপ ও নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার অবস্থানে রয়েছে। ফলে আলোচনার টেবিলে বসা হলেও যুদ্ধের মূল কারণগুলো এখনো সমাধানের কাছাকাছি যায়নি। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব ফেলছে। ফ্রান্সও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগের কথা বিবেচনা করছে। তবে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থানের পার্থক্য থাকায় কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়ন সহজ নয়। সব মিলিয়ে নিউইয়র্কে ইরানের কূটনৈতিক তৎপরতা তিনটি বিষয়কে সামনে এনেছে—যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি আলোচনার দরজা খোলা রাখা, আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরা এবং হরমুজ প্রণালিকে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। পেজেশকিয়ান ও আরাগচির এই কৌশল ইরানের অভ্যন্তরে একই সঙ্গে রক্ষণশীল ও আলোচনাপন্থী মহলে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি করলেও তাৎক্ষণিক কোনো সমঝোতা আনতে পারেনি। বরং ২৬ সেপ্টেম্বর ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান দেখিয়ে দিয়েছে, দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব এখনো যথেষ্ট। তাই নিউইয়র্কে ইরানের কূটনৈতিক তৎপরতাকে তাৎক্ষণিক ‘বাজিমাত’ বলা যতটা সরলীকরণ হবে, তেমনি এটিকে ব্যর্থতা বলাও এখনই যথার্থ নয়। কারণ যুদ্ধের ময়দানের পাশাপাশি কূটনীতির ময়দানেও তেহরান সক্রিয় রয়েছে। সামনে আলোচনার নতুন পর্ব শুরু হয় কি না, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরতে পারে কি না এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে কোনো নতুন সমঝোতার কাঠামো তৈরি হয় কি না—সেটিই নির্ধারণ করবে নিউইয়র্কের এই কূটনৈতিক তৎপরতার প্রকৃত ফল।