প্রকাশ :: ... | ... | ...

‘দেশকে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতিতে ঠেলা হচ্ছে’! জ্ঞানেশের সঙ্গে সিজেপি-নিশানায় প্রধানমন্ত্রীও


সংযুক্ত ছবি

দিল্লিতে ধরপাকড়ের পরও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা, আবার আটক নেহা বোরা; গণহারে আটকের নিন্দা অ্যামনেস্টির ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে আন্দোলন আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দিল্লিতে পুলিশি হেফাজত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর দলটির নেতারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে নিশানা করে অভিযোগ করেছেন, কেন্দ্রীয় সরকার নাগরিকদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে দেশকে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ধরপাকড় করেও তাঁদের আন্দোলন থামানো যাবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা। রোববার (১১ অক্টোবর) দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে সিজেপির যুগ্ম আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাস এসব অভিযোগ করেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন দলটির আইনবিষয়ক দলের প্রধান রত্না সিংহ। এর আগে শনিবার দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, রাঙ্কা ও দাসকে আটক করা হয়েছিল। পরে এক বছরের জন্য শান্তি ও সদাচরণ বজায় রাখার শর্তে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে আশুতোষ রাঙ্কা অভিযোগ করেন, তাঁদের আটকের সময় পুলিশ অমানবিক আচরণ করেছে। অভিজিৎ দীপকের ঠাকুমার মৃত্যুসংবাদ তাঁকে জানানোর ক্ষেত্রেও অসংবেদনশীলতা দেখানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, পুলিশ তিন নেতাকে আলাদা আলাদা জায়গায় নিয়ে যায়, তাঁদের ফোন কেড়ে নেয় এবং আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ সীমিত করে। এসব অভিযোগের বিষয়ে দিল্লি পুলিশের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সৌরভ দাস আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আটক অবস্থায় তাঁদের ফোন পরীক্ষা করা হয়ে থাকতে পারে। এমনকি ফোনে তথ্য সংযোজন বা পরিবর্তন করে ভবিষ্যতে তাঁদের হয়রানি করা হতে পারে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তবে ফোনে এমন কোনো পরিবর্তন ঘটেছে—এমন প্রমাণ তিনি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করেছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগও তুলেছে সিজেপি। সৌরভ দাসের দাবি, আন্দোলনকারীদের ধরতে পুলিশ জুতা পরে একটি গুরুদ্বারে প্রবেশ করেছিল। এ ঘটনাকে শিখ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ভাবাবেগের প্রতি অসম্মান হিসেবে দেখছে দলটি। শনিবারের ধরপাকড়কে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেন আশুতোষ রাঙ্কা। তাঁর ভাষ্য, স্বাধীন ভারতে এমন পরিস্থিতি আগে দেখা যায়নি। জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। রাঙ্কা বলেন, তাঁদের আন্দোলন কেবল শুরু হয়েছে এবং পুলিশি পদক্ষেপে তাঁরা পিছু হটবেন না। শনিবারের পরিস্থিতির জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের লজ্জিত হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সৌরভ দাস নির্বাচন কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ‘দেশদ্রোহী’ বলে কটাক্ষ করেন। তাঁর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে এবং এর ফলে নাগরিকদের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার দাবি উঠে এসেছে। তবে বাদ পড়া সব নামই বৈধ ভোটারের—এমন দাবি স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। ভারতীয় নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন বিজেপি অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এদিকে দিল্লিতে বিক্ষোভে যোগ দিতে গিয়ে আবারও আটক হয়েছেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরা। রোববার দুপুরে আর কে আশ্রম এলাকায় কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সরাসরি সম্প্রচারে নেহা জানান, ব্যারিকেড অতিক্রম করে তাঁরা কনট প্লেস এলাকায় পৌঁছেছেন। এরপর তাঁকে আটক করা হয় বলে প্রতিবেদনগুলোতে জানানো হয়েছে। এর আগে ১০ অক্টোবর আটক হওয়ার পর মুক্তি পেয়েছিলেন নেহা। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি জানান, পুলিশ তাঁর ফোন নিয়ে গিয়েছিল, পরে সেটি ফেরত পান। ময়দান গড়ি থানায় আটক অন্য নারীদেরও মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছিলেন। দিল্লিতে গণহারে আটকের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির ভারতবিষয়ক প্রধান আকার প্যাটেল অভিযোগ করেন, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও আইনজীবীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষকে আটক করা হয়েছে। তাঁর মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আটক ব্যক্তিদের অবিলম্বে ও নিঃশর্ত মুক্তি এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। দিল্লিতে ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভ ঘিরে দুই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করার তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স। অন্য কয়েকটি প্রতিবেদনে আটকের সংখ্যা আরও বেশি বলা হয়েছে। সংখ্যার এই পার্থক্যের কারণে মোট কতজনকে আটক করা হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরও গণহারে আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে। ভারত সরকার অবশ্য শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারকে জনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধের অধীন বলে উল্লেখ করেছে। ভোটার তালিকার সংশোধন নিয়ে বিরোধ ও সিজেপির আন্দোলন এখন নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগের দাবির পাশাপাশি পুলিশি পদক্ষেপ, নাগরিক অধিকার এবং বিরোধী মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কে রূপ নিয়েছে। সিজেপি নেতারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলেও এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ এবং আটকের ঘটনায় উত্থাপিত অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।