যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে ২০০৯ সালে ১৩ জনকে গুলি করে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা নিদাল মালিক হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা করেছে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ। আগামী ৩ ডিসেম্বর ফায়ারিং স্কোয়াডে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ঘোষণার পর এ পরিকল্পনা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) হেগসেথ বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য জনসাধারণের দেখার সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। রক্ষণশীল টেলিভিশন চ্যানেল রিয়েল আমেরিকাস ভয়েসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হাসানকে সেনাদের ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। এ ধরনের অপরাধের পরিণতি কতটা কঠোর হতে পারে, তা মানুষকে দেখানো উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এর আগে পেন্টাগন জানায়, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সুপারিশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদন দিয়েছেন। গত ২ অক্টোবর অনুমোদনের পর ৬ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত সেনাসচিব অ্যাডাম টেলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তারিখ নির্ধারণ করেন। ৩ ডিসেম্বর টেক্সাসের ফোর্ট হুডেই এ দণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে নির্ধারিত তারিখে তা কার্যকর হবে কি না, সে বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া ও সম্ভাব্য আবেদনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। হাসানের শেষ ইচ্ছা কিংবা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হেগসেথ বলেন, এসব বিষয় তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। ৩ ডিসেম্বর তাঁকে দেখা যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রে নজিরবিহীন বিতর্ক তৈরি করেছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের পক্ষে কাজ করা আইনজীবী জন মিলস এ সিদ্ধান্তকে আধুনিক সময়ে নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেছেন এবং এর আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া থাকলেও তা জনসমক্ষে সরাসরি সম্প্রচার করার পরিকল্পনা নতুন আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ১৯৬১ সালে। আর ফায়ারিং স্কোয়াডে সর্বশেষ সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘটে ১৯৪৫ সালে। ফলে হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে তা ছয় দশকেরও বেশি সময় পর দেশটির সামরিক বাহিনীতে প্রথম মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা হবে। প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ইতিহাসও যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিনের পুরোনো; আধুনিক সময়ে সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনাটি বিশেষভাবে বিতর্কিত। কে এই নিদাল হাসান নিদাল মালিক হাসান যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। সেনাবাহিনীতে প্রায় দুই দশকের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তাঁর কাজের মধ্যে সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়াও ছিল। ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে গুলির ঘটনায় তাঁর নাম সামনে আসে। ওই দিন ঘাঁটির একটি ভবনে গুলি চালিয়ে ১৩ জনকে হত্যা করেন হাসান। আহত হন আরও ৩২ জন। ঘটনার সময় সেখানে সেনারা বিদেশে মোতায়েনের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছিলেন। পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পর হাসান পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। বিচার চলাকালে তিনি নিজেই নিজের পক্ষে আদালতে বক্তব্য দেন। ২০১৩ সালের আগস্টে সামরিক আদালত তাঁকে ১৩ জনকে হত্যা এবং আরও কয়েকজনকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করে। পরে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আদালতে হাসান দাবি করেছিলেন, আফগানিস্তান ও ইরাকসহ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের প্রতিবাদ জানাতেই তিনি ওই হামলা চালিয়েছিলেন। হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আইনি প্রক্রিয়া চলেছে। ২০২৫ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট তাঁর সামরিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে করা আবেদন পর্যালোচনায় নিতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর চলতি বছরের অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদন দেন। এদিকে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা দেশগুলোর মধ্যে ইরান ও আফগানিস্তানের নাম উল্লেখ করা হয়। এমন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা দেশটির বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় শাস্তি কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।