ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামোয় নতুন করে হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। সম্ভাব্য সেই অভিযানে দেশটির অস্ত্রভান্ডারের সবচেয়ে শক্তিশালী অ-পারমাণবিক বোমা ‘মাদার অব অল বোমস’ ব্যবহারের বিকল্পও বিবেচনায় রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর নির্দেশ দিলে বোমাটি ব্যবহার করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। তবে এখন পর্যন্ত এ বোমা ব্যবহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের খবর পাওয়া যায়নি। বোমাটির আনুষ্ঠানিক নাম জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট (এমওএবি)। বিশাল আকার, প্রচণ্ড বিস্ফোরণক্ষমতা এবং বিস্তৃত এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর সামর্থ্যের কারণে এটি ‘মাদার অব অল বোমস’ বা ‘সব বোমার মা’ নামে পরিচিত। এটি পারমাণবিক বোমা নয়; প্রচলিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক ব্যবহার করেই এর ধ্বংসক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার সম্ভাব্য পরিকল্পনার কারণে অস্ত্রটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, মাটির ওপর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম এই বোমা পাহাড়ের গভীরে সুরক্ষিত স্থাপনা ধ্বংসে কতটা কার্যকর হবে। কেন ‘মাদার অব অল বোমস ‘মাদার অব অল বোমস’ নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের ইতিহাস। সে সময় ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে লড়াইকে ‘মাদার অব অল ব্যাটলস’ বা ‘সব যুদ্ধের মা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিশালাকার বোমাটির অনানুষ্ঠানিক নাম হয় ‘মাদার অব অল বোমস’। তবে এমওএবি নামটির আনুষ্ঠানিক পূর্ণরূপ ‘ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট’। এটি মূলত আকাশ থেকে নিক্ষেপ করা বড় আকারের বিস্ফোরক অস্ত্র। নামের সঙ্গে ‘মাদার’ শব্দটি থাকলেও এটি কোনো স্বতন্ত্র সামরিক শ্রেণির নাম নয়; বরং বোমাটির পরিচিত ডাকনাম। কতটা শক্তিশালী এই বোমা এমওএবির ওজন প্রায় ২১ হাজার পাউন্ড বা ৯ হাজার ৫২৫ কেজি—অর্থাৎ সাড়ে নয় টনের কিছু বেশি। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০ ফুট বা ৯ মিটারের কাছাকাছি। অস্ত্রটিতে প্রায় ১৮ হাজার ৭০০ পাউন্ড, অর্থাৎ সাড়ে আট টনের বেশি বিস্ফোরক ওয়ারহেড রয়েছে। বোমাটি আকাশ থেকে নিক্ষেপের পর নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর দিকে পরিচালিত হয়। এর বিস্ফোরণে প্রচণ্ড চাপ ও অভিঘাত তরঙ্গ তৈরি হয়, যা খোলা এলাকায় থাকা জনবল, সামরিক সরঞ্জাম, স্থাপনা এবং গুহা বা সুড়ঙ্গের প্রবেশপথে ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। তবে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে বিস্ফোরণের স্থান, ভূপ্রকৃতি, স্থাপনার গঠন ও লক্ষ্যবস্তুর দূরত্বের ওপর। ফলে নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা সব স্থাপনা নিশ্চিতভাবে ধ্বংস হবে—এমন দাবি করা ঠিক নয়। বিশাল আকারের কারণে বোমাটি সাধারণ যুদ্ধবিমানের মতো করে বহন করা যায় না। এটি বিশেষভাবে উপযোগী সি-১৩০ পরিবারের সামরিক পরিবহন বিমান থেকে নিক্ষেপের জন্য তৈরি করা হয়েছে। বোমাটির উন্নয়ন ২০০০-এর দশকের শুরুতে সম্পন্ন হয় এবং ২০০৩ সালে এর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রথম ব্যবহার আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো এমওএবি ব্যবহার করে ২০১৭ সালের ১৩ এপ্রিল আফগানিস্তানে। দেশটির নানগারহার প্রদেশের আচিন জেলায় ইসলামিক স্টেট খোরাসান (আইএসকেপি) গোষ্ঠীর ব্যবহৃত একটি সুড়ঙ্গ ও গুহা নেটওয়ার্ক লক্ষ্য করে বোমাটি নিক্ষেপ করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছিল, ওই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল গোষ্ঠীটির অবস্থান ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করা এবং সেখানে অভিযানরত বাহিনীর জন্য ঝুঁকি কমানো। আফগানিস্তানের তৎকালীন কর্তৃপক্ষ ওই হামলায় ৯৪ জন জঙ্গি নিহত হওয়ার দাবি করেছিল। তবে হতাহতের সংখ্যা ও বেসামরিক নাগরিকের ওপর প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তাই সব হতাহতের হিসাবকে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। আফগানিস্তানে বোমাটির ব্যবহার প্রমাণ করে, গুহা ও সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের মতো লক্ষ্যবস্তুতে এটি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে, পাহাড়ের বহু গভীরে নির্মিত যেকোনো সুরক্ষিত স্থাপনাও এটি ধ্বংস করতে পারবে। ইরানের ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় কতটা কার্যকর ইরানের ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনা এবং নাতাঞ্জের কাছে ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে পরিচিত সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ স্থাপনাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ রয়েছে। এসব স্থাপনা পাহাড়ের নিচে বা শক্তিশালী সুরক্ষাব্যবস্থার ভেতরে অবস্থিত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেই এমওএবির প্রধান সীমাবদ্ধতা। বোমাটি বিস্তৃত এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভূপৃষ্ঠে ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে, কিন্তু এটি মূলত গভীর ভূগর্ভস্থ লক্ষ্যবস্তু ভেদ করে ধ্বংস করার জন্য তৈরি নয়। ফলে পাহাড়ের ওপর বা স্থাপনার প্রবেশপথে আঘাত হানলেও ভেতরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা কঠিন। গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ভেদ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে রয়েছে জিবিইউ-৫৭/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর (এমওপি)। এটি শক্ত মাটি ও সুরক্ষিত কাঠামো ভেদ করে গভীরে প্রবেশের জন্য বিশেষভাবে তৈরি। মার্কিন বিমানবাহিনীর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বোমাটির ওজন প্রায় ৩০ হাজার পাউন্ড বা ১৩ হাজার ৬০০ কেজি এবং এতে পাঁচ হাজার ৩০০ পাউন্ডের বেশি বিস্ফোরক থাকে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এটি মাটির প্রায় ২০০ ফুট পর্যন্ত গভীরে পৌঁছাতে পারে বলে মার্কিন বিমানবাহিনীর প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এমওপি থাকলেই ইরানের সব ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংস করা সম্ভব—এমন নিশ্চয়তা নেই। স্থাপনার গভীরতা, পাহাড়ের গঠন, কংক্রিট ও অন্যান্য সুরক্ষাব্যবস্থা, আঘাতের নির্ভুলতা এবং একাধিক আঘাতের প্রয়োজনীয়তা—সবই ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। সামরিক অভিযানের ঝুঁকি এমওএবি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো এটি বহনকারী বিমানকে লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছাতে হবে। বোমাটি সাধারণ যুদ্ধবিমানের অস্ত্র নয়; বিশেষ পরিবহন বিমান থেকে এটি নিক্ষেপ করতে হয়। ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্রিয় থাকলে এমন বিমানকে নিরাপদে নির্দিষ্ট এলাকায় নিয়ে যাওয়া কঠিন হতে পারে। তবে বাস্তব ঝুঁকি নির্ভর করবে অভিযানের ধরন, বিমান চলাচলের পথ, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সামরিক পদক্ষেপের ওপর। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক পরিকল্পনায় ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার বিকল্প রাখা হয়েছে। তবে সামরিক পরিকল্পনায় কোনো অস্ত্রের নাম থাকা মানেই সেটি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে—এমন নয়। এ ধরনের হামলা হলে ইরানের পাল্টা পদক্ষেপের আশঙ্কাও রয়েছে। জ্বালানি অবকাঠামো বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাতের জবাবে তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কিংবা সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোকে লক্ষ্য করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা। এর ফলে সংঘাত শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। ধ্বংসযজ্ঞই কি কৌশলগত সাফল্য বিশাল বিস্ফোরণ, ব্যাপক ধ্বংসক্ষমতা এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব—এমওএবিকে ঘিরে সামরিক ও রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু কোনো অস্ত্রের বিস্ফোরণ যত বড়ই হোক, তা দিয়ে প্রতিপক্ষের সামরিক সক্ষমতা বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বদলানো যাবে কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন। ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হয়, তাহলে এমওএবির ভূপৃষ্ঠকেন্দ্রিক ধ্বংসক্ষমতা সেই লক্ষ্য অর্জনে যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অন্যদিকে, জ্বালানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের ক্ষতি হলে বেসামরিক মানুষের জীবন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। অতএব, ‘মাদার অব অল বোমস’ শুধু একটি বিশাল বিস্ফোরক অস্ত্রের নাম নয়; সম্ভাব্য ব্যবহার ঘিরে প্রশ্ন উঠছে সামরিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক বার্তা, বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এবং সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়েও। ইরানে নতুন হামলার নির্দেশ দেওয়া হলে বোমাটি ব্যবহার করা হবে কি না, আর ব্যবহার করা হলে তা ওয়াশিংটনের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে কতটা কার্যকর হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।