প্রকাশ :: ... | ... | ...

শব্দতরঙ্গেই ক্যান্সারের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা


সংযুক্ত ছবি

শব্দতরঙ্গেই ক্যান্সারের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা

মানুষের শরীরের ভেতরের ছবি দেখতে আলট্রাসাউন্ডের ব্যবহার বহুদিনের। এবার উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গকে কাজে লাগিয়ে শরীর না কেটে ক্যান্সারের টিউমার ধ্বংসের নতুন পদ্ধতি নিয়ে এগোচ্ছেন গবেষকরা ক্যান্সারের টিউমার ধ্বংস করতে অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও বিকিরণ চিকিৎসার পাশাপাশি নতুন নতুন পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চলছে। এর মধ্যে উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে শরীর না কেটে টিউমার ধ্বংসের একটি প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ‘হিস্টোট্রিপসি’ নামের এই পদ্ধতিতে টিউমারের নির্দিষ্ট অংশে কেন্দ্রীভূত আলট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে টিস্যু যান্ত্রিকভাবে ভেঙে ফেলা হয়। এই প্রযুক্তির পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের বায়োমেডিক্যাল প্রকৌশলী জেন জুর কয়েক দশক আগের একটি ঘটনাচক্রে পাওয়া আবিষ্কার। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শূকরের হৃদ্‌পিণ্ডের টিস্যুতে পরীক্ষা চালানোর সময় তিনি এমন একটি পদ্ধতি খুঁজে পান, যা পরে হিস্টোট্রিপসি নামে পরিচিত হয়। এই শতকের প্রথম দশকে পিএইচডি শিক্ষার্থী হিসেবে জু অস্ত্রোপচার ছাড়াই রোগাক্রান্ত টিস্যু ধ্বংস ও সরিয়ে ফেলার উপায় খুঁজছিলেন। সে সময় উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে টিস্যু যান্ত্রিকভাবে ভেঙে ফেলার পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন তিনি। পরীক্ষার সময় এত শক্তিশালী অ্যামপ্লিফায়ার ব্যবহার করা হচ্ছিল যে গবেষণাগারের অন্যরা শব্দ নিয়ে অভিযোগ করতে শুরু করেন। সহকর্মীদের বিরক্তি কমাতে জু আলট্রাসাউন্ডের পালসের সংখ্যা বাড়িয়ে দেন। এতে প্রতিটি পালসের দৈর্ঘ্য মাইক্রোসেকেন্ডে নেমে আসে এবং শব্দ মানুষের শ্রবণসীমার বাইরে চলে যায়। কিন্তু পরিবর্তনটি অপ্রত্যাশিত ফল দেয়। শুধু শব্দের সমস্যা কমেনি, জীবন্ত টিস্যুর ওপর পদ্ধতিটিও আগের চেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। আলট্রাসাউন্ড প্রয়োগের এক মিনিটের মধ্যেই শূকরের হৃদ্‌পিণ্ডের টিস্যুতে একটি গর্ত তৈরি হতে দেখেন জু। তাঁর ভাষায়, তখন মনে হয়েছিল তিনি বুঝি স্বপ্ন দেখছেন। আজ জু ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের বায়োমেডিক্যাল প্রকৌশলের অধ্যাপক। সেই পরীক্ষাগারের ঘটনাই হিস্টোট্রিপসির ভিত্তি তৈরি করে। বর্তমানে শরীর না কেটে ক্যান্সারের টিউমার ধ্বংসের সম্ভাবনাময় কয়েকটি পদ্ধতির একটি হিসেবে এটি নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) যকৃতের টিউমারের চিকিৎসায় হিস্টোট্রিপসি ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। পরের বছর প্রযুক্তিটির বাণিজ্যিক ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসোসনিকসের অর্থায়নে পরিচালিত একটি ছোট গবেষণায় দেখা যায়, যকৃতের টিউমারের ক্ষেত্রে ৯৫ শতাংশ চিকিৎসা প্রযুক্তিগতভাবে সফল হয়েছে। তবে পেটে ব্যথা থেকে শুরু করে শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি রয়েছে। গবেষণায় অবশ্য এসব জটিলতা তুলনামূলকভাবে বিরল এবং পদ্ধতিটি সাধারণভাবে নিরাপদ বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। চলতি বছরের জুনে যুক্তরাজ্যও হিস্টোট্রিপসির অনুমোদন দিয়েছে। অপ্রতুল চিকিৎসা চাহিদা পূরণে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচির আওতায় দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় এই চিকিৎসা চালু হয়েছে। স্পেনের রামন ই কাখাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ রিসার্চের ক্যান্সার গবেষক জুলি আর্ল মনে করেন, আলট্রাসাউন্ডকে এত দিন মূলত শরীরের ভেতরের ছবি তৈরির প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হলেও এর ব্যবহার আরও বিস্তৃত হতে পারে। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে আলট্রাসাউন্ড দিয়ে টিউমার ধ্বংসের পাশাপাশি শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়া ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য ক্যান্সার চিকিৎসার কার্যকারিতা বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। কীভাবে কাজ করে হিস্টোট্রিপসি গর্ভের শিশুর ছবি দেখতে যে আলট্রাসাউন্ড ব্যবহার করা হয়, সেখানে একটি যন্ত্র শরীরে উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ পাঠায়। শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসা তরঙ্গ সেন্সর গ্রহণ করে। সেই সংকেত বিশ্লেষণ করে শরীরের ভেতরের ছবি তৈরি করা হয়। হিস্টোট্রিপসিতে একই ধরনের শব্দতরঙ্গের শক্তি টিউমারের খুব ছোট একটি নির্দিষ্ট অংশে কেন্দ্রীভূত করা হয়। যকৃতের টিউমারের ক্ষেত্রে যন্ত্রটি প্রায় দুই মিলিমিটার বাই চার মিলিমিটার এলাকার ওপর আলট্রাসাউন্ডের শক্তি কেন্দ্রীভূত করতে পারে। জু বিষয়টিকে রং করার কলমের মাথার সঙ্গে তুলনা করেছেন। এরপর একটি রোবোটিক বাহুর সাহায্যে যন্ত্রটি টিউমারের ওপর পরিচালনা করে নির্দিষ্ট জায়গায় শব্দতরঙ্গ পাঠানো হয়। খুব দ্রুত ছোট ছোট পালস আকারে আলট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করা হলে টিউমারের ভেতরে অতি ক্ষুদ্র বুদ্‌বুদ বা মাইক্রোবাবল তৈরি হয়। মাইক্রোসেকেন্ডের মধ্যে সেগুলো ফুলে ওঠে এবং আবার চুপসে যায়। বারবার এ প্রক্রিয়া চলতে থাকলে টিউমারের টিস্যু ভেঙে যায়। পরে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ওই অবশিষ্ট অংশ পরিষ্কার করতে পারে। পদ্ধতিটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এতে টিউমার পোড়ানো বা কেটে ফেলার প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসার সময়ও তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। হিসোসনিকসের তথ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা এক থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয় এবং রোগী একই দিন বাড়ি ফিরতে পারেন। টিউমারের সংখ্যা, আকার ও অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে একবারের বেশি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। তবে হিস্টোট্রিপসিকে এখনো সব ধরনের ক্যান্সারের সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে না। চিকিৎসার পর দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার ফিরে আসার ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য এখনো নেই। টিউমার ভেঙে দেওয়ার ফলে ক্যান্সারের কোষ শরীরের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়তে পারে কি না, তা নিয়েও গবেষকদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় এখন পর্যন্ত সেই আশঙ্কার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া শরীরের সব জায়গায় এই পদ্ধতি ব্যবহার করা সম্ভব নয়। হাড় আলট্রাসাউন্ডের পথ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ফুসফুসের মতো গ্যাসপূর্ণ অঙ্গে আলট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করলে আশপাশের সুস্থ টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। তবে কিডনি ও অগ্ন্যাশয়ের টিউমারের চিকিৎসায় হিস্টোট্রিপসির সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে। শুধু টিউমার ভাঙা নয়, পোড়ানোর প্রযুক্তিও আছে ক্যান্সারের চিকিৎসায় আলট্রাসাউন্ডের ব্যবহার হিস্টোট্রিপসিতে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চমাত্রার কেন্দ্রীভূত আলট্রাসাউন্ড বা এইচআইএফইউ প্রযুক্তিও ইতিমধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার ফোকাসড আলট্রাসাউন্ড ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপি সেন্টারের সহপরিচালক রিচার্ড প্রাইস বলেন, এই পদ্ধতিতে টিউমারের ওপর কেন্দ্রীভূত আলট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে তাপ তৈরি করা হয়। সেই তাপে টিউমারের টিস্যু অনেকটা রান্না হয়ে যায়। বিষয়টি বোঝাতে তিনি আতশকাচের উদাহরণ দিয়েছেন। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে শুকনো পাতার ওপর আতশকাচ ধরলে যেমন সূর্যের আলো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় কেন্দ্রীভূত হয়ে তাপ তৈরি করে, এইচআইএফইউও অনেকটা একইভাবে শব্দের শক্তিকে নির্দিষ্ট জায়গায় কেন্দ্রীভূত করে টিউমারে তাপ তৈরি করে। এখানেই হিস্টোট্রিপসির সঙ্গে এইচআইএফইউয়ের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। এইচআইএফইউ টিউমার ধ্বংসে তাপ ব্যবহার করে, কিন্তু হিস্টোট্রিপসি মূলত যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় টিস্যু ভেঙে দেয় এবং উল্লেখযোগ্য তাপ তৈরির ওপর নির্ভর করে না। ফলে হিস্টোট্রিপসিতে আশপাশের সুস্থ টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কম হতে পারে। তবে এইচআইএফইউয়েরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। হাড় ও গ্যাস আলট্রাসাউন্ডের পথ আটকে দিতে পারে। শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়া প্রোস্টেট ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও এটি সাধারণত উপযোগী নয়। স্তন ক্যান্সারসহ আরও কিছু ক্যান্সারে এর ব্যবহার নিয়ে গবেষণা চলছে। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা আলট্রাসাউন্ডের সঙ্গে ইমিউনোথেরাপির সমন্বয় নিয়েও গবেষণা চলছে। কেন্দ্রীভূত আলট্রাসাউন্ডে টিউমার ক্ষতিগ্রস্ত হলে টিউমারের কিছু উপাদান রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কাছে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা। এর ফলে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্যান্সার কোষ শনাক্ত করে আক্রমণ করার সুযোগ পেতে পারে। গবেষকদের একটি বড় লক্ষ্য হলো, একটি টিউমারে আলট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে সেটিকে এমনভাবে পরিবর্তন করা, যাতে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শরীরের অন্য জায়গায় থাকা একই ধরনের ক্যান্সার কোষও শনাক্ত করতে পারে। অর্থাৎ একটি টিউমারের চিকিৎসার মাধ্যমে শরীরের অন্য টিউমারের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করার সম্ভাবনা খোঁজা হচ্ছে। তবে এই ধারণা এখনো গবেষণার পর্যায়ে। মানুষের ওপর ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় এটি কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। আলট্রাসাউন্ড ও ইমিউনোথেরাপির সমন্বয় চিকিৎসায় কতটা পরিবর্তন আনতে পারে, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তারপরও ক্যান্সার চিকিৎসায় আলট্রাসাউন্ড নতুন একটি সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। ভবিষ্যতে এর লক্ষ্য শুধু অস্ত্রোপচারের বিকল্প তৈরি করা নয়; কেমোথেরাপি, বিকিরণ চিকিৎসা কিংবা ইমিউনোথেরাপির মতো প্রচলিত চিকিৎসার কার্যকারিতা বাড়ানো এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমানোর পথও খুঁজে বের করা। জেন জুর ভাষায়, ক্যান্সার ভয়াবহ। আর যে বিষয়টি এটিকে আরও কঠিন করে তোলে, সেটি হলো ক্যান্সারের চিকিৎসা। তাই হিস্টোট্রিপসিকে তিনি কোনো ‘জাদুর চিকিৎসা’ হিসেবে দেখেন না। বরং দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে এমন একটি প্রযুক্তি হিসেবে দেখছেন, যা উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসার কষ্ট ও ঝুঁকি কমাতে পারে। গবেষণাগারে সহকর্মীদের বিরক্তিকর শব্দ কমানোর একটি প্রচেষ্টা থেকে যে আবিষ্কারের সূচনা হয়েছিল, সেটিই এখন ক্যান্সার চিকিৎসায় শরীর না কেটে টিউমার ধ্বংসের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর, কোন কোন ক্যান্সারে ব্যবহারযোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদে রোগীর জন্য কতটা নিরাপদ—এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে আরও বড় ও দীর্ঘমেয়াদি ক্লিনিক্যাল গবেষণার প্রয়োজন।