ভারতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়ছে। এবার কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আদলে সহিংসতার মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা চালানোর অভিযোগ তুলেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। তাঁর দাবি, নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম কিংবা ভোটার তালিকা সংশোধনের বিরোধিতা নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে ক্ষমতা দখল করাই বিরোধীদের আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) উত্তর প্রদেশের লক্ষ্ণৌতে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জ্যেষ্ঠ নেতা রাজনাথ সিং। তিনি বলেন, কংগ্রেস ও তাদের রাজনৈতিক মিত্ররা তরুণদের শক্তিকে গঠনমূলক কাজে ব্যবহার না করে রাজনৈতিক সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রাজনাথ সিংয়ের ভাষ্য, ‘কংগ্রেস বাংলাদেশ মডেলে সহিংসতার মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করতে চায়।’ তাঁর অভিযোগ, আন্দোলনের লক্ষ্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার কিংবা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নয়; বরং সরকারের পতন ঘটানো এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করা। তবে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের এ অভিযোগের পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ নেই। ফলে এটি রাজনাথ সিংয়ের রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য। ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত ভারতের নির্বাচন কমিশনের এসআইআর কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজনৈতিক বিরোধ তীব্র হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। এ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন বিজেপি রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে বলেও অভিযোগ বিরোধীদের। রয়টার্সের ১০ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে দিল্লিতে বিক্ষোভ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন জোরালো হয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ এবং যোগ্য ভোটারদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কংগ্রেস ও বিরোধী জোটের নেতারা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন। তাঁদের বক্তব্য, ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগের জবাব দেওয়ার জন্য কমিশনকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। অন্যদিকে বিজেপি এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছে, বিরোধীরা রাজনৈতিক পরাজয়ের দায় নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপাচ্ছে। রাজনাথ সিংয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যও সেই অবস্থানের প্রতিফলন। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে পুরোনো অভিযোগও তুললেন রাজনাথ সংবাদ সম্মেলনে রাজনাথ সিং কংগ্রেসের অতীত ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, ক্ষমতায় থাকার সময় দলটি নির্বাচন কমিশনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছিল। তিনি ১৯৯৩ সালের ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাষ্ট্রপতির কাছে নির্বাচন কমিশনার নবীন চাওলাকে অপসারণের সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কংগ্রেস সরকার চাওলাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদে উন্নীত করেছিল বলে দাবি করেন তিনি। রাজনাথ আরও বলেন, ভারতে ভোটার পরিচয়পত্র চালুর পর থেকে কংগ্রেস আর এককভাবে সরকার গঠন করতে পারেনি। তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ভোটার পরিচয়পত্র ও নির্বাচনী ব্যবস্থার পরিবর্তনকে কংগ্রেসের রাজনৈতিক দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। তবে ভোটার পরিচয়পত্র চালুর পর কংগ্রেসের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ার বিষয়টিকে ভোটার পরিচয়পত্রের প্রভাবের ফল হিসেবে দেখানোর পক্ষে কোনো প্রমাণ তিনি উপস্থাপন করেছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। রাহুল গান্ধীকে নিশানা লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীকেও আক্রমণ করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, রাহুল গান্ধী বিশৃঙ্খলার রাজনীতি করছেন এবং তরুণদের রাজনৈতিক সংঘাতের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। রাজনাথ সিং বলেন, গণতন্ত্র কাউকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কিংবা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করার অধিকার দেয় না। তাঁর মতে, রাজনৈতিক বিরোধের সমাধান হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, সহিংসতা বা অস্থিরতা সৃষ্টির মাধ্যমে নয়। অন্যদিকে কংগ্রেস ও বিরোধী দলগুলোর অবস্থান হলো, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করা গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অংশ। ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই তাদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য বলে বিরোধী নেতারা দাবি করে আসছেন। দিল্লিতে আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনা জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিরোধী নেতা-কর্মী ও তরুণ আন্দোলনকারীরা একাধিক কর্মসূচি পালন করেছেন। বিভিন্ন কর্মসূচিতে পুলিশি বাধা, বিক্ষোভকারীদের আটক এবং নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল ব্যবহারের বিধিনিষেধ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ১৫ অক্টোবর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিরোধী নেতাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জ্ঞানেশ কুমার, দুই নির্বাচন কমিশনার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব চেয়ে নোটিশ দেন বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দিল্লিতে প্রতিবাদের নির্ধারিত স্থান পরিবর্তন এবং বিক্ষোভকারীদের সমাবেশের অধিকার নিয়ে দায়ের করা আবেদনও আদালতের বিবেচনায় এসেছে। এই পরিস্থিতিতে রাজনাথ সিংয়ের ‘বাংলাদেশ মডেল’ মন্তব্য ভারতের ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধীদের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তবে বিরোধীদের আন্দোলনকে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখার বিষয়ে ক্ষমতাসীন বিজেপি ও বিরোধী কংগ্রেসের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং প্রতিবাদের অধিকার—এই তিনটি বিষয় এখন ভারতের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। এ বিরোধের নিষ্পত্তি রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আদালতের পর্যালোচনার ওপরও নির্ভর করছে।