আরেকটি অনুশীলন শেষ। মাঠে ছড়িয়ে থাকা পরিচিত মুখগুলোও একসময় উঠে যাবে। থেমে যাবে বলের শব্দ, শেষ হবে সতীর্থদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা। থেকে যাবে শুধু স্মৃতি—দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে যে স্মৃতির সঙ্গে মিশে আছে আর্জেন্টিনার জার্সি, অসংখ্য রাতের উল্লাস আর কিছু অসম্ভব কষ্টের গল্প। বিদায়ের আগে সেই স্মৃতির দিকেই যেন ফিরে তাকালেন লিওনেল মেসি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি ছবি পোস্ট করে লিখলেন, ‘বিশেষ মুহূর্তগুলো মিস করব, জানি।’ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে নিজের শেষ ম্যাচে মাঠে নামার ২৪ ঘণ্টারও কম সময় আগে শেষবারের মতো সতীর্থদের সঙ্গে অনুশীলন করেছেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। ইজেইজা ট্রেনিং কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত সেই অনুশীলনে তাঁকে দেখা গেছে বেশ হাসিখুশি ও স্বচ্ছন্দ। যে মাঠে জাতীয় দলের হয়ে অসংখ্য প্রস্তুতির স্মৃতি, সেই ট্রেনিং কমপ্লেক্সটির নামও এখন তাঁর নামে। বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৫টায় বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের শেষ হওয়ার কথা। তাই শেষ অনুশীলনটিও যেন হয়ে উঠেছিল বিদায়ের আগে একটি নীরব স্মৃতিচারণ। অনুশীলন শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কয়েকটি ছবি পোস্ট করেন মেসি। একটি ছবিতে ছিলেন পুরো আর্জেন্টিনা দল, কোচিং স্টাফ ও আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) কর্মকর্তারা। ছিলেন এএফএর সভাপতি ক্লদিও তাপিয়াও। ছবিগুলোতে ধরা পড়ে এমন এক দলের বন্ধন, যে দলটির সঙ্গে মেসি তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলো কাটিয়েছেন। রোববার জাতীয় দলের ক্যাম্পে যোগ দেন মেসি। এর আগে বলিভিয়া ও বুরকিনা ফাসোর বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ের ম্যাচগুলোতে ছিলেন না তিনি। তবে সোমবার লিওনেল স্কালোনির অধীনে অনুশীলনে তাঁকে দেখা যায় বেশ প্রাণবন্ত। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সতীর্থ রদ্রিগো দে পলের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টায়ও মেতে ওঠেন তিনি। হয়তো এটাই ছিল মেসির কাছে শেষ অনুশীলনের সবচেয়ে স্বাভাবিক দৃশ্য—একজন কিংবদন্তি হিসেবে নয়, সতীর্থদের সঙ্গে থাকা দলেরই একজন হয়ে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির পথচলা ছিল দীর্ঘ, কঠিন এবং শেষ পর্যন্ত অবিশ্বাস্য সাফল্যে ভরা। শুরুতে ছিল অপেক্ষা, ছিল ব্যর্থতার ভার। ২০০৭ কোপা আমেরিকা, ২০১৪ বিশ্বকাপ, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর জাতীয় দলের হয়ে তাঁর ক্যারিয়ার নিয়ে তৈরি হয়েছিল অপূর্ণতার প্রশ্ন। কিন্তু সেই গল্প শেষ পর্যন্ত অন্যভাবে লেখা হয়েছে। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক শিরোপা-খরা কাটে। পরের বছর কাতারে বিশ্বকাপ জিতে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতাটিও পূর্ণতা পায়। এরপর ২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকা জয়। আর্জেন্টিনার হয়ে দুটি কোপা আমেরিকা ও একটি বিশ্বকাপজয়ী মেসি এখন বিদায়ের দোরগোড়ায়। তাই বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি আর্জেন্টাইন সমর্থকদের কাছে নিছক আরেকটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ নয়। মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে জমবে বিদায়ের আবেগ। কাতার বিশ্বকাপজয়ী দলের বেশ কয়েকজন সদস্যও থাকবেন বলে জানা গেছে। মেসির দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে স্মরণীয় করে তুলতে থাকবেন বিশেষ অতিথি ও শিল্পীরাও। জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেওয়া নিকোলাস ওতামেন্দিও থাকবেন এই আয়োজনে। রিভার প্লেটের এই ডিফেন্ডারও আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলতে প্রস্তুত। মেসির সঙ্গে দীর্ঘদিনের পথচলার আরেক দুই সঙ্গী রদ্রিগো দে পল ও জিওভানি লো সেলসোকেও বেনিন ম্যাচের দলে রাখা হয়েছে। বিদায়ের আবহকে আরও বিশেষ করে তুলেছেন আর্জেন্টিনার সাবেক দুই তারকা এজেকিয়েল ‘পোচো’ লাভেজ্জি ও ক্রিস্তিয়ান ‘কিলি’ গনসালেস। বিশেষ অতিথি হিসেবে তাঁরা দলের অনুশীলনে উপস্থিত ছিলেন। যেন মেসির বিদায়ের মুহূর্তে ফিরে এসেছে আর্জেন্টিনা ফুটবলের আরও কিছু পুরোনো মুখ, পুরোনো গল্প। মেসির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবিগুলো তাই শুধু অনুশীলনের ছবি নয়। সেখানে যেন আটকে আছে একটি যুগের কয়েকটি ফ্রেম—সতীর্থদের হাসি, কোচের সঙ্গে মুহূর্ত, দলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা এবং এমন একটি জার্সি, যা তাঁকে শুধু আর্জেন্টিনার অধিনায়ক নয়, একটি প্রজন্মের আবেগের অংশ করে তুলেছে। একসময় এই জার্সিই তাঁকে দিয়েছে হতাশা। ফাইনাল শেষে চোখের পানি, ট্রফি ছোঁয়ার ব্যর্থতা আর অবসরের ঘোষণা—সবই ছিল এই পথের অংশ। আবার এই জার্সিই তাঁকে দিয়েছে কোপা আমেরিকার ট্রফি, বিশ্বকাপ এবং দেশের মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের আনন্দ। এখন সেই পথের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে মেসি। বেনিনের বিপক্ষে শেষবারের মতো মাঠে নামবেন। শেষবারের মতো জাতীয় দলের সতীর্থদের সঙ্গে একই ড্রেসিংরুমে থাকবেন। শেষবারের মতো গ্যালারি থেকে উঠবে তাঁর নাম। তারপর হয়তো আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর কোনো ম্যাচে দেখা যাবে না তাঁকে। থেকে যাবে তাঁর রেখে যাওয়া গল্প। আর সেই গল্পের মধ্যেই থাকবে মেসির নিজের উপলব্ধি—বিশেষ মুহূর্তগুলো তিনি মিস করবেন। আসলে মেসিকে বিদায় জানাতে যাওয়া আর্জেন্টিনার মানুষও জানেন, তাঁরা শুধু একজন ফুটবলারকে নয়, নিজেদের জীবনের একটি সময়কেই বিদায় জানাতে যাচ্ছেন।